পুজোর ছুটিতে হয়ে যাক ভানগড়ের ভূতুড়ে অভিজ্ঞতা

ঢাকে কাঠি পড়তে আর বেশি দেরি নেই৷ দুগ্গা পুজোর সময় ভ্রমণ বিলাসী বাঙালি বাড়িতে বসে থাকবে, তাও কি হয়? জামা কাপড়, খাওয়া দাওয়ার পাশাপাশি ট্যুর প্ল্যানিংটাও সেরে ফেলতে হবে তাড়াতাড়ি৷ না আর ‘দীপুদা’ নয়৷ অনেক হয়েছে, চেনা ডেস্টিনেশন থেকে একটু বেড়িয়ে আসুন মশাই৷

বাঙালি জাতি চিরকালই অ্যাডভেঞ্চারে বিশ্বাসী৷ তাই, এবার পুজোর ছুটিতে একটু ভূতুড়ে স্বাদ নেওয়া যেতেই পারে৷ তেমনই এক ঠিকানা বাতলে দিচ্ছি আপনাকে৷ ভানগড়ের কেল্লা আর ভানগড় শহর৷ উইকিপিডিয়া বলছে, ১৫৭৩ সালে রাজস্থানে এই ভানগড় কেল্লা তৈরি হয়েছিল৷ মাধো সিং নামের এক রাজা তার বসবাসের জন্য তৈরি করিয়েছিলেন এই কেল্লা৷ মাধো সিংয়ের ছেলে ছাতর সিং ১৬৩০ সালেই মারা যায়৷ এরপর মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের সঙ্গে ভানগড়েও অমাবস্যা নামে৷ ভানগড়ে যাওয়ার আগে একটা কথা জেনে নিন৷ ruins-bhangarhএখানে সূর্যাস্তের পর আর সূর্যোদয়ের আগে প্রবেশ একেবারেই নিষেধ৷ একথা বানানো একেবারেই নয়৷ ‘আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’র পক্ষ থেকেই দেওয়া হয়েছে এই কড়া নির্দেশ৷ কেউ এই আদেশ অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে ভারত সরকার কড়া ব্যবস্থা নিতে পারে৷ আপনার কি গাঁয়ে কাটা দিচ্ছে? তবে, জেনে রাখুন এই কেল্লা হল এশিয়ার সবচেয়ে ভূতুড়ে জায়গাগুলির মধ্যে একটি৷ শুধু তাই নয়, বিশ্বের সেরা দশটি হন্টেড জায়গার মধ্যে একটা হল এই ভানগড়ের কেল্লা৷ রাজার কেল্লায় ভূত এল কী করে, এমন কথাই ভাবছেন তো? এ নিয়ে অবশ্য স্থানীয় এলাকার বিভিন্ন ধরণের গল্প প্রচলিত আছে৷ তবে, এর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত গল্প হল গুরু বালুনাথ ও রানি রত্নাবতীর গল্প৷ স্থানীয়রা কেউ কেউ বলেন, মাধো সিং যখন প্রথম ভানগড়ের কেল্লা তৈরি করাচ্ছিলেন তখন এই কেল্লা তৈরিতে বাধা দেন এক সাধু৷ তার নাম গুরু বালুনাথ৷ কেল্লার চত্বরের এককোণে বালুনাথের আশ্রম ছিল৷ মাধো সিংকে গুরুবালু নাথ আদেশ দিয়েছিলেন, তিনি কেল্লা বানাচ্ছেন তাতে তার কোন আপত্তি নেই৷ তবে কেল্লার ছায়া যেন তার আশ্রমের উপর না পড়ে৷ ছায়া পড়লে তিনি মাধো সিংয়ের এই সাধের কেল্লা ধ্বসং করে দেবেন৷ এমনকি রাজবংশের কেউকে তিনি বেঁচেও থাকতে দেবেন না৷ মাধো সিং কথা দিয়েছিলেন, বালুনাথের আদেশ তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করবেন৷ কেল্লা বানানো শেষ হলেও, বালুনাথের কথা রাখতে পারলেন না মাধো সিং৷ দিনের একটা সময়ে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য কেল্লার ছায়া বালুনাথের আশ্রমের উপর পড়ত৷ সেই কারণেই ক্ষুব্ধ হয়ে বালুনাথ ভানগড়ের কেল্লার সঙ্গে গোটা ভানগর রাজ্য ধ্বংস করে দিলেন৷ এই রাজ্যে যে বাড়িগুলো রয়েছে সেখানে একটি বাড়িরও ছাদ নেই৷ স্থানীয়রা বলেন গুরুনাথ চেয়েছিলেন যাতে এই এলাকার অন্য কেউ এসেও যাতে বসবাস শুরু করতে না পারে, সেই কারণেই তিনি বাড়ির ছাদ উড়িয়ে দিয়েছেন৷ এ না হয় গেল গুরু বালুনাথের গল্প৷ এছাড়াও আরও এক ভূতুড়ে কাহিনী রয়েছে এই কেল্লা রহস্যে৷ এই গল্প গল রানি রত্নাবতীর৷ ভানগরের রানি ছিলেন অসামান্য সুন্দরী৷ দেশ বিদেশ থেকে রাজারা নাকি আসতেন রত্নাবতীকে নিজের রানি করার প্রত্যাশা নিয়ে৷ রূপের দেমাগে মাটিতে নাকি পা পড়ত না এই রানির৷ স্বাভাবিক সুন্দরী মহিলাদের এমনিতেই গর্ব থাকে৷ রত্নাবতীও তাদের থেকে আলাদা ছিলেন না৷ এই এলাকাতেই বাস করত সিঙ্ঘিয়া নামের এক তান্ত্রিক৷ সে ছিল রানির প্রেমে পাগল৷ একদিন রানি তার দাসীদের নিয়ে বাজারে সুগন্ধী কিনতে গিয়েছিলেন৷ তান্ত্রিক সিঙ্ঘিয়া সেই সুযোগে সুগন্ধীতে কালা জাদু করে দিয়েছিলেন৷ যাতে সিঙ্গিয়ার মতলব ছিল, রানি এই গন্ধ শুঁকলেই বশীভূত হয়ে পড়বেন ও সিঙ্ঘিয়ার পিছনে পিছন চলে আসবেন৷ কিন্তু, রূপের সঙ্গে রত্নাবতীর বুদ্ধিও ছিল মারাত্মক৷ তিনি সিঙ্ঘিয়ার এই ছল বুঝতে পেরে সুগন্ধীর বোতল একটি পাথরে ছুঁড়ে মারেন৷ জাদুবলে ওই পাথরটি বশীভূত হয়ে সিঙ্ঘিয়ার পিছনে ছুটতে আরম্ভ করে৷ আর ওই পাথরের তলায় চাপা পড়েই সিঙ্ঘিয়া মারা যায়৷ আর মরার সময় সে রানিকে অভিশাপ দিয়ে যায়, রাজপরিবারের কাউকে সে বাঁচতে দেবে না৷ আর রানিকে সে মরার পরেও ছাড়বে না৷ এর ঠিক কিছুদিনের মধ্যেই ভানগড়ের সঙ্গে আজবগড়ের যুদ্ধ লাগে আর এই যুদ্ধে রাজপরিবার-সহ গোটা ভানগর ধ্বংস হয়ে যায়৷স্থানীয়দের বিশ্বাস ওই কেল্লায় নাকি তান্ত্রিক ও রত্নাবতীর অতৃপ্ত আত্মা এখনও ঘুরে বেরায়৷ আর তাদের সঙ্গে ভানগরের অসংখ্য মানুষের আত্মাও কেল্লায় বিরাজমান৷ কেল্লাকে ঘিরে একেরপর এক গল্প তৈরি হলেও, এলাকার কেউ স্বচক্ষে ভূতের দেখা পাননি৷ তাদের মধ্যে অনেকেই নাকি রাতের বেলায় কেল্লা থেকে ঘুঙুরের আওয়াজ শুনতে পেয়েছেন৷ কিন্তু তার সত্যটা জানা নেই কারই৷ কেল্লা এখন যদিও ধ্বংসস্তুপ৷ তবে স্থাপত্য নিদর্শনের চিহ্ন পাওয়া যায়৷  কেল্লায় ঢোকার দরজার উচ্চতা প্রায় ৩০ ফুট৷ দরজা দিয়ে ঢুকেই বাগানের চিহ্ন পাওয়া যায় যা আপনাকে সেকালের বিলাসিতার পরিচয় দেবে৷ বাগান পেরিয়ে সামনে গেলে একটা জলাধার দেখতে পাবেন স্থানীয় ভাষা তাকে বলে ‘বউলি’৷ এই এলাকা থেকে কোন শব্দ বাইরে যেতে পারে না৷ যেকোন শব্দের ধ্বনি এই এলাকার মধ্যেই ঘুরে বেড়ায়৷ বাউলির এই অংশ থেকেই অনেকে নূপুরের আওয়াজ শুনতে পেয়েছেন৷ কেল্লার ঠিক পিছন দিকে রয়েছে একটি গণেশের মন্দির৷ এছাড়া একটি শিব মন্দিরও রয়েছে এই এলাকায়৷ যেখানে ভগবানের মন্দির রয়েছে সেখানে ভূতের বাসা কীভাবে হয় তা জানা নেই৷ এই মন্দির অনেকটা দক্ষিণ ভারতীয় স্থাপত্যের আদলে তৈরি৷ বলতে পারেন রাজস্থানে কেরলের ছোঁয়া৷ দিল্লি হয়ে জয়পুরের দিকে প্রায় তিন ঘন্টার দূরত্বে অবস্থিত এই কেল্লা৷ যদি গাড়ি নিয়ে যান তবে গুঁরগাও থেকে গেলে রাস্তার ট্রাফিক খানিকটা কম পেতে পারেন৷ ভানগরে ঘুরতে গেলেও সেখানে থাকার মতো কোন জায়গা কিন্তু নেই৷ তাই ভানগড় ঘুরে আপনাকে ৫০ কিলোমিটার দুরে সিরিস্কায় যেতে হবে৷ হাতে টাকা থাকলে সিরিস্কায় দ্য সিরিস্কা প্যালেসে উঠতে পারেন৷ সেলিশহর লেক প্যালেস-দ্য ওয়াটার ফোর্ট কিন্তু সে তুলনায় অনেকটা সস্তা পড়তে পারে৷ তবে এখানে ঘর পাওয়া একটু কঠিন৷ রাজস্থান পর্যটনের টাইগার ডেনও হতে পারে আপনার রাত কাটানোর আস্তানা৷ তবে কী ভাবছেন? বাঙালির পায়ের তলায় তো সর্ষে, আর দেরি  না করে প্ল্যানিংটা শুরু করে দিন৷ দিল্লি পৌঁছলে মাত্র একটা দিনের ব্যাপার৷ একবার ঘুরেই আসুন না৷ আশা করি বেশ অন্য রকমের অভিজ্ঞতা হবে আপনার৷

প্রতিবেদন : অন্যতমা দাস ৷৷ কলকাতা 24×7

- Advertisement -

Advertisement ---
---
-----