সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: এলাকার অন্যতম খ্যাতি দুর্গাপুজোর জন্য। কিন্তু ঘটা করে দুর্গাপুজো হলেই যে তার পাশে একটা নিষিদ্ধপল্লী থাকতে হবে এবং সেখান থেকে মাটি নিয়ে মায়ের গায়ে প্রথম মাটি পড়বে তার কোনও মানে নেই। খুব সুন্দর জায়গা শ্রীভুমি। সাজানো গোছানো। সামনে রথে চড়ে বিবেকানন্দ, জাতীয় পতাকা ওড়ে সর্বদা। কিন্তু ওনার কাছে জায়গাটা মোটেই ভালো ছিল না। উনি সব্যসাচী দত্ত, বিধাননগরের মেয়র। তাই শ্রীভূমিতে গিয়ে তাঁর সাংবাদিক সম্মেলনের প্রশ্ন উঠতেই তিনি তুলে আনলেন ‘নিষিদ্ধপল্লী’ প্রসঙ্গ।

সব্যসাচী দত্ত এবং সদ্য মন্ত্রীপদ প্রাপ্ত সুজিত বসুর সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কথা উঠলেই আদা আর কাঁচকলার ‘বন্ধুত্বের’ গল্প উঠে আসে। দুজনে পাশাপাশি এলাকায় থাকলেও কেউ কারও জায়গায় বিশেষ নাক গলান না। কিন্তু মুকুল রায় কাণ্ড মেয়র সাহেবকে টেনে নিয়ে এসেছে মন্ত্রী মশাইয়ের এলাকায়।

মেয়র হওয়া সত্বেও বিধাননগরের মেয়রকে হাকিম সাহেব ‘কাঁচকলা’-র ঘরে ডেকে নিয়ে গেলেন কেন? প্রশ্নোত্তর পর্ব বিধাননগরেই কিংবা নিউটাউনে হতে পারত। প্রশ্ন উঠতেই সব্যসাচী দত্ত যা বললেন তা না বললেই নয়। পুরনো একটি মামলায় বারাসত আদালত থেকে ফেরার পথে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল বিধাননগর থাকতে শ্রীভূমি গিয়ে সওয়াল জবাব করতে হল কেন? মেয়র সব্যসাচী দত্ত বলেন , “শ্রীভূমি কি নিষিদ্ধপল্লী নাকি?”

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন , ‘এসবই দু’জনের আদায় কাঁচকলায় সম্পর্কের জের। তাই প্রয়োজন না থাকলেও সংবাদ মাধ্যমের সামনে সুজিত বসুর শ্রীভূমি এলাকার নাম আসতেই তাঁর মুখ ফসকে বেড়িয়ে গিয়েছে নিষিদ্ধ পল্লী কথাটি’।

রবিবার শ্রীভূমির স্পোর্টিং ক্লাবে বৈঠকে স্বাভাবিকভাবেই উপস্থিত ছিলেন সুজিত বসু। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা এও বলছেন , “যার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো নয় তাঁর ডেরায় গিয়ে তাঁর সামনে গিয়ে ভুল স্বীকার করতে হয়েছে। এই বিষয় নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠতেই সম্ভবত অল্প হলেও চটে গিয়েছিলেন মেয়র’।

মুকুল রায় সব্যসাচী দত্তের বাড়িতে বসে লুচি আলুরদম ঘটনার পরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের জানিয়ে দিয়েছিলেন বিষয়টি নিয়ে চর্চা কম হওয়ার। শনিবার জলপাইগুড়ি থেকে ফিরেই মুখ্যমন্ত্রী বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করেন। তিনি মেয়র ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গে কথা বলেন। ঠিক হয়, সব্যসাচীকে ডেকে তাঁর কথা শুনতে হবে।

সেইমতো রবিবার শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাবে বৈঠক ঠিক হয়। দলনেত্রীর নির্দেশ মেনে মেয়র ফিরহাদ হাকিম শ্রীভূমির স্পোর্টিং ক্লাবে সব্যসাচী দত্তকে নিয়ে বৈঠক করেন। এই বৈঠকে সব্যসাচী নিজের ভুল স্বীকার করেন। বৈঠকের পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “‌আমি তৃণমূলে ছিলাম, আছি, থাকব।”

মেয়র ফিরহাদ হাকিম বলেন, “সব্যসাচী মুকুল রায়ের চক্রান্ত‌ বুঝতে পারেননি। বিনা নিমন্ত্রণে মুকুল সব্যসাচীর বাড়িতে গিয়েছিলেন। নিজে প্রেসকেও নিয়ে যান। ভদ্রতার খাতিরে সব্যসাচী তাঁকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারেননি। চারদিকে বিভ্রান্তি ছড়াতেই মুকুল এই কাজ করেন। একে অপরের প্রতি অবিশ্বাস ও সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি করতে চান। তৃণমূল ঐক্যবদ্ধ, অটুট।” শ্রীভূমির সেই আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, ও বিধাননগর পুরনিগমের তৃণমূলের কাউন্সিলররাও।

সেদিন কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম সাংবাদিকদের এও বলেছিলেন, “‌সব্যসাচী দলের গুরুপূর্ণ নেতা, বিধায়ক ও মেয়র। মুকুল যে একটা চাল দিয়েছিলেন, সেটা সব্যসাচী বুঝতে পারেননি। বিজেপিতে যাঁরা গিয়েছেন, তাঁরা ধান্দাবাজ। তৃণমূলের মধ্যে বন্ধুত্ব, খাওয়াদাওয়া থাকবে।

বিজেপির বিরুদ্ধে মমতার নেতৃত্বে আমরা লড়ছি। যারা দেশকে নষ্ট করে, তাদের সঙ্গে কোনও আপস নয়। মোদি না যাওয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই চলবে।‌ ‌মুকুল রায় যে দল করেন সেই দল গান্ধী ও নেতাজির আদর্শে বিশ্বাসী নয়। আমরা ওই দুই মনীষীর আদর্শে বিশ্বাসী। মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে আমরা দল করি। যাঁরা মমতার আদর্শে বিশ্বাসী, তাঁরা বিজেপিতে যাবেন না।”‌