‘বড় প্রাপ্তি! কিন্তু এখনও অনেকটা হাঁটা বাকি’

মৌসুমি দাস, কলকাতা: তিনি যখন ক্লাস টেন-এ পড়তেন বাবা একদিন বাড়িতে টিভি নিয়ে এলেন। চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে বছর ১৫র ওই তরুণের চোখ পড়েছিল পুরুষের একটি ফ্যাশন শো’র দিকে। কেমন যেন মনে হয়েছিল তাঁর! আকৃষ্ট হয়েছিলেন তিনি। তবে ওই অল্প বয়সে এই কথা কাউকে জানানোর সাহস পাননি।

এরপর কলেজে গিয়ে দেবাশিস নামে এক ছেলের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় তাঁর। ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠ হতে থাকেন তারা। তবে তাদের এই বন্ধুত্বের ঘনিষ্ঠতাকে ভালো চোখে দেখেননি কেউ। হস্টেলসুপার একদিন ডেকে বলেছিলেন, তাদের যেন আর একসঙ্গে দেখা না যায়। মেনে নেননি তাঁরা৷ হস্টেল ছেড়ে একটি ভাড়া বাড়িতে থাকতে শুরু করেন। লড়াইয়ের শুরু সেদিন থেকেই… দেবাশিসের সেই বন্ধু এই বছর’ মিস্টার গে ওয়ার্ল্ড’এর দ্বিতীয় স্থানাধিকারী সমর্পণ মাইতি।

সমাজের বহু বাধা পেরিয়ে সমর্পণ আজ অনেকেরই রোল মডেল। সমকামীদের এই লড়াইয়ে সমর্পণ যেন এক উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক। মানসিকতার পরিবর্তনের এই লড়াইয়ের সঙ্গে সঙ্গে সমর্পণ গবেষণা করছেন ব্রেন ক্যান্সার নিরাময়ের উপায় নিয়ে।

- Advertisement -

বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়দানের পর সমকামীদের কাছে এ যেন ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা দিবস’। এত দিনের লড়াই শেষে আজকের এই জয়ে চোখ ভিজেছে অনেকেরই। এই রায়ে যেন আরও এক স্বাধীনতার সূর্য উঠল মাঝ আকাশে। ‘কলকাতা ২৪x৭’কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সমর্পণ ভাগ করে নিলেন আজকের এই জয়ের বিশেষ অনুভূতি৷

প্র. অবশেষে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিল,সমকামিতা আইনসম্মত। আজকের এই জয় কীভাবে উদযাপন করবেন?

সমর্পণ. আমি আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলাম, বেশ কিছুক্ষণ কোনও কথা বলতে পারিনি। আমার মনে হয়েছিল আমি যেন এক দীর্ঘ সময় ঘুমন্ত ছিলাম। হঠাৎ জেগে উঠলাম। কিন্তু এবার আমি রাস্তায় বের হব৷ আরও কিছু মুক্ত হৃদয়ের মানুষের সঙ্গে আজকের দিনটা উদযাপন করতে।

প্র. সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে সমাজ কীভাবে মেনে নেবে? কী মনে হয় আপনার?

সমর্পণ. এখন আমরা আইনী সুরক্ষা পেলাম। এই যাত্রা আজ থেকেই শুরু হল। সমাজ খুব সহজভাবে এটাকে মেনে নেবে না। তাই আমাদের ভুললে চলবে না, আমাদের আরও অনেক পথ যেতে হবে এই আইনত সমতাকে সামাজিক সমতায় পরিণত করতে।

প্র. সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সমকামিতার ক্ষেত্রে ‘ভালোবাসার স্বাধীনতা’কেই সবার উপরে রাখা হয়েছে। আপনার কী মনে হয় না এতে মানুষের ধারণা বদলাবে?

সমর্পণ. অবশ্যই। সামাজিক ধারনা খুবই জটিল। যুগ-যুগান্ত ধরে মানুষ যে ধারনা নিজেদের মনে বয়ে এনেছেন তা ভাঙা অত সহজ নয়। সামাজিক বিপ্লব একটা কঠিন কাজ। আর আমাদের এখন নতুন দায়িত্ব সেই বিপ্লবকে ডেকে আনা।

প্র. ৩৭৭ ধারা যখন বৈধ ছিল এবং সমকামিতাকে একটি অপরাধ হিসেবে দেখা হত কী কী ধরণের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছিলেন আপনি? সেই অবস্থার মোকাবিলা কীভাবে করেছিলেন?

সমর্পণ. সমস্যা হয়েছিল, যখন আমি বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলাম আমার বন্ধু-পরিজনেরা জিজ্ঞেস করেছিলেন কীভাবে তুমি তোমার ভবিষ্যৎ দেখো! ভারতে সমকামিতা একটি অপরাধ। তাই কে তোমার পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে আসবে? আইনের চোখে তোমার কোনও অধিকার নেই। যতদূর দেখা যায় শুধুই অন্ধকার। কিন্তু আজ যেন দীর্ঘ আঁধার পেরিয়ে অল্প একটা আলোর রশ্মি দেখা যাচ্ছে।

প্র. এখনও কী কী সমস্যার মুখে পড়তে হবে সমকামীদের?

সমর্পণ. সমাজের মেনে নেওয়াই সবচেয়ে বড় বিষয়। সেখানে এখনও বিয়ের সমতার বিষয়ে বলা হয়নি। যদি কেউ তার সঙ্গীর সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে জীবন শুরু করতে চান তাকে এখনও আইনী জটিলতার সম্মুখীন হতে হবে। আমাদের ভাবতে হবে সমলিঙ্গ ধর্ষণকে কীভাবে আটকানো যায়? কারণ এখনও এই ধরণের অপরাধের ক্ষেত্রে কোনও আইন তৈরি হয়নি।

প্র. আপনি কি মনে করেন আজকের এই রায়ে ভারত ইউরোপীয় দেশগুলির মতো একধাপ এগোলো?

সমর্পণ. অবশ্যই। আজকের এইদিন সমকামীদের একটি বিশেষ প্রাপ্তি। তবে সমকামীদের সমান অধিকারের ক্ষেত্রে এটি একটি ‘বেবি স্টেপ’। এখনও আমরা বিবাহের সমতা, সন্তান দত্তক নেওয়ার অধিকার, কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে সমস্যা আরও বেশ কিছু বিষয় নিয়ে লড়তে হবে। এই সবে শুরু…৷  (অনুলিখন: সুবর্ণা পাত্র)

Advertisement
-----