ধর্মান্ধদের চাবকে ঠাণ্ডা করতেন ‘মর্দানি’ বিমলপ্রতিভা

প্রসেনজিৎ চৌধুরী:  ঘোড়ার পিঠে চেপে চাবুক হাঁকাতেন৷ মুখে জ্বলত একটার পর একটা সিগারেট৷ ব্রিটিশ মদতপুষ্ট কয়লা খনির দালাল-গুণ্ডা যারাই ধর্মের জিগির তুলে বিভেদ বানাতে চাইত তাদের দিকে হিম চোখে তাকাতেন৷ ভয়ে বুক শুকিয়ে যেত দুষ্কৃতিদের৷ বেগতিক দেখলে ঝলসে উঠত সেই মহিলার চাবুক৷ তখন মার খেয়ে পিঠটান দেওয়া ছাড়া আর কীই বা করার থাকে৷ এই বাঙালি মহিলার এই রুদ্রাণী রূপে ভরসা পেতেন সাধারণ মানুষ৷ জন্ম শতবর্ষ কবেই পার হয়েছে৷ এমন দুরন্ত সাহসী মহিলা বিমল প্রতিভার মতো কাউকে দরকার গোষ্ঠী সংঘর্ষ কবলিত এলাকায়৷

কয়লা শহর রানিগঞ্জের মাটিতে ধর্মান্ধতার জিগির তুলে গোষ্ঠী সংঘর্ষ ও তাকে ঘিরে চরম বিতর্ক চলছে৷ অথচ এই শহর ও কয়লা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হাজারো মানুষ জানেন শ্রমই হল আসল ধর্ম৷ এই পরম্পরা নিয়েই প্রজন্মের পর প্রজন্ম কাটাচ্ছেন রানিগঞ্জবাসী৷ যেখানে সর্বধর্ম সমন্বয়ই বারবার প্রাধান্য পেয়ে এসেছে৷ গত কয়েকদিনের ঘটনা সম্পূর্ণ অনভিপ্রেত বলেই মনে করছেন শহরবাসী৷

স্বাধীনতার আগে রানিগঞ্জেই বারে বারে সম্প্রীতিকে নষ্ট করার একাধিক চেষ্টা করেছিল তৎকালীন ব্রিটিশ মদতপুষ্ট বিভিন্ন কয়লা খনির দালাল ও ঠিকাদাররা৷ আর তাদেরই বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই চাবুক চালাতেন বাঙালি মহিলা বিমলপ্রতিভা দেবী৷ তাঁর কথা ধরা আছে শ্রমিক আন্দোলন সংক্রান্ত ইতিহাসের পাতায়৷ বিমলপ্রতিভা, এক স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা অবিস্মরণীয় নারী৷ ঠিক যেন সিনেমার পর্দার সেই ‘হান্টারওয়ালি’ নায়িকা৷

- Advertisement -

জন্ম ১৯০১ সালে কটক শহরে৷ সেখানকার স্বদেশী আন্দোলনে জড়িত মুখোপাধ্যায় পরিবারে৷ পিতা সুরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণায় বিমলপ্রতিভা সরাসরি স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন৷ পরে বিয়ে হয় কলকাতার এক বনেদি রক্ষণশীল পরিবারে৷ তবে রক্ষণশীলতার বাঁধন কেটে স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন বিমলপ্রতিভা৷ এই কাজে তাঁর সহকর্মী ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের ভগ্নী উর্মিলা দেবী৷

কড়া ধাঁচের বিমলপ্রতিভার কাজে আকৃষ্ট হয় ভারত নওজোয়ান সভা৷ এই সংগঠনের সর্বভারতীয় সভাপতি ছিলেন ভগৎ সিংয়ের অনুরোধে বাংলা প্রদেশের চেয়ারপার্সন তথা শীর্ষ পদে ছিলেন বিমলপ্রতিভা৷ দুই বিপ্লবীর চিন্তাধারার মিল ছিল বেশি৷ সেই সূত্রে গোপনে সশস্ত্র পথের বিপ্লবীদের সাহায্য করতেন বিমলপ্রতিভা৷ ১৯২৮ সালে তিনি যোগ দিয়েছিলেন জাতীয় কংগ্রেসে৷ ১৯৪০ সালে কংগ্রেস ত্যাগ করেন অসম সাহসী এই মহিলা৷ রাজনীতিকভাবে নরমপন্থায় তাঁর বিশ্বাস ছিলনা৷ এরপরেই শুরু হয় বিকল্প পথে দেশের স্বাধীনতায় অংশ নেওয়ার পালা৷

মহিলা শাখার কাজ ছেড়ে সরাসরি শ্রমিক আন্দোলনে আকৃষ্ট হন বিমলপ্রতিভা৷ শুরু হয় এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়৷ যা সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়৷ ১৯৪১ সালে তাঁকে গ্রেফতার করে প্রেসিডেন্সি জেলে রাখা হয়৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পুরো সময়টাই জেলে কাটিয়েছিলেন বিমলপ্রতিভা৷ ১৯৪৫ সালে মুক্তি পেয়েই তিনি সরাসরি শ্রমিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন৷ কলকাতা থেকে অনেক দূরে দামোদর নদ তীরবর্তী বর্ধমানের আসানসোল, বার্নপুর, রানিগঞ্জ হয় তাঁর কর্মক্ষেত্র৷

আর এখানেই শুরু বিমলপ্রতিভা দেবীর জীবন ঘিরে রোমাঞ্চকর অধ্যায়৷ খনি-শিল্পাঞ্চলের রুক্ষ পরিবেশে তাঁর মতো সম্ভ্রান্ত পরিবারের বধূ যেভাবে প্রকাশ্যে ঘোড়া চড়ে চাবুক হাঁকাতেন তা ক্রমে গল্পের আকার নিতে শুরু করে৷ প্রকাশ্যে সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে, তীব্র গতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে শ্রমিক বস্তিতে ঘোরা৷ আর শ্রমিকদের সংঘটিত করে ব্রিটিশ বিরোধী ভাষণ দেওয়ায় তাঁর জুড়িদার কেউ ছিলেন না৷

রানিগঞ্জের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, কয়লা কুঠির শহরে প্রবল অত্যাচার চালাত বিভিন্ন কুঠির মালিক পক্ষ৷ এদের সবাই ব্রিটিশ ও ভারতীয় অংশীদার বা সম্পূর্ণ ব্রিটিশ সংস্থা৷ সেখানেই ধর্মনিরপেক্ষ সংঘটিত শ্রমিক আন্দোলন করতেন বিমলপ্রতিভা দেবী৷ তাঁকে রুখতে বহু ছক করা হয়েছিল৷ কিন্তু কে দাঁড়াবে অমন হন্টারওয়ালি মর্দানির সামনে৷ ফলে যারা কিছু টাকার লোভে হামলা চালাতে যেত, তাদের চাবকে ঠাণ্ডা করতেন বিমলপ্রতিভা৷ শুধু কয়লাখনির শ্রমিকদের মধ্যেই নয়, রেল শহর আসানসোলের রেল শ্রমিকদের মধ্যেও বিরাট জনপ্রিয় ছিলেন তিনি৷ ফলে তৈরি হয়েছিল ব্রিটিশ বিরোধী বিশাল শ্রমিক সংগঠন৷

সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত আরসিপিআই রাজনৈতিক দলের শ্রমিক শাখার দায়িত্ব নিয়েই আসানসোল-রানিগঞ্জ-বার্নপুরে এসেছিলেন বিমলপ্রতিভা৷ স্বাধীনতার কিছু আগে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী সংঘর্ষের মধ্যেও অবিচল ছিলেন এই মহিলা নেত্রী৷ প্রকাশ্যেই ধর্মান্ধদের চাবকে ঠাণ্ডা করেছিলেন৷ সেই কথা ভেসে বেড়ায় কয়লা শহরের বাতাসে৷ অকুতোভয় এই মহিলা নেত্রীর প্রয়াণ হয় ১৯৭৮ সালে৷ হিন্দিভাষী শ্রমিকদের মধ্যে তিনি ছিলেন ‘মর্দানি হান্টারওয়ালি’৷ কিছু ইতিহাস বিশেষ বিশেষ সময়ে মনে পড়ে বৈকি৷

Advertisement ---
-----