চোরা শিকারিদের শ্যেন নজরে পাখিরালয়, শিকার রুখতে প্রশাসনিক উদ্যোগ

স্টাফ রিপোর্টার, বর্ধমান: এবার চোরা শিকারিদের শ্যেন দৃষ্টি পড়ল বর্ধমানের পূর্বস্থলী ২এর চুপির পাখিরালয়ে৷ প্রতিদিনই চোরা শিকারিদের হাতে অসংখ্য বিদেশি পাখির মৃত্যু ঘটতে শুরু করায় রীতিমত উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল জেলা প্রশাসন৷

বুধবার এব্যাপারে কড়া নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পূর্ব বর্ধমান জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে৷ কাষ্ঠশালী বনবীথি সংস্থার সদস্য তথা পাখি বিশারদ সঞ্জয় সিংহ ও এই সংগঠনের সভাপতি নবীবক্স সেখ জানান, চুপির এই পাখিরালয়ে ১৯৮৪-৮৫ সাল থেকে পাখি আসছে৷ গঙ্গার গতিপথ পরিবর্তনের ফলে ১৯৯০-১৯৯১ সালে তৈরি হয়েছে ছাড়িগঙ্গা৷ একইসঙ্গে প্রতিবছরই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকা বিভিন্ন প্রজাতির ও বিভিন্ন দেশের পাখির এই সমাবেশের জন্য পর্যটকদের ভিড়ও বাড়তে শুরু করেছে ২০০৮-২০০৯ সাল থেকে৷

তাঁরা জানান, প্রচুর সংখ্যক পাখির মধ্যে রয়েছে রাডি শেলডাক যা এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার উত্তর ও দক্ষিণাংশ থেকে আসে৷ রয়েছে নর্দার্ন পিনটেল, গ্রে হেরণ, ফেরুজিনিয়াস ডাক, কমন পোকার্ড প্রভৃতি৷ তাঁরা জানান, ২০০৫-২০০৬ সালে এই পাখিরালয়কে ঘিরেই তৈরি হয়েছে পর্যটন কেন্দ্রও৷ ২০০৭ সালে তৈরি হয়েছে পরিযায়ী আবাস এবং পাখি দেখার জন্য টাওয়ারও তৈরি হয়েছে৷

- Advertisement -

প্রতিবছরই নভেম্বর মাস থেকে পাখি আসা শুরু হয়৷ ফেব্রুয়ারি থেকে ফিরে যাওয়া শুরু হয়৷ মার্চ মাস পর্যন্তও বিক্ষিপ্তভাবে অনেক পাখি থাকে৷ নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত পর্যটক আসে৷ তিনি জানান, পর্যটকদের জন্য কাষ্ঠশালী বনবীথির ৬-৭ টা নৌকাও চলে৷ এছাড়াও ছাড়ি গঙ্গার পিকনিক স্পটে প্রায় ২০ টা নৌকা থাকে৷ তিনি জানান, তাঁদের সংস্থার পক্ষ থেকে শেষ ২০১৭ সালের মার্চ মাসে সমীক্ষা করা হয়েছিল৷ তখন অধিকাংশ পাখি চলে গিয়েছে৷ কিন্তু সেই সময়ই ৭০০০ পাখি ছিল৷
সঞ্জয়বাবুরা এদিন জানান, কিন্তু গঙ্গার দিকে চোরা শিকারিদের উৎপাতের পাশাপাশি ছাড়ি গঙ্গায় জেলেদের জন্যও সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে৷ জেলেদের মাছ ধরার জালে জড়িয়ে অনেক পাখি মারাও যাচ্ছে৷

তিনি জানান, গত ৪ ডিসেম্বর কলকাতা থেকে পর্যটক হিসাবে কৌশিক মাঝি, শুভাশিস চক্রবর্তী এবং সৌমদ্বীপ বিশ্বাস পাখিরালয়ে আসেন৷ এখানে পাখিদের রক্ষা করার জন্য এবং পর্যটকদের গাইড করার জন্য তৈরি হয়েছে কাষ্ঠশালী বনবীথি৷ গাইড হিসাবে এই তিন পর্যটক নিয়ে রুকুনপুর চর, মেরতলা চর ঘোরার সময় তাঁরা দেখতে পান এক ব্যক্তি পাখি ধরার জন ফাঁদ পাতছেন৷ তাঁরা ওই ব্যক্তিকে কী করছেন জানতে চাইলে তিনি জানান, মাছ ধরছেন৷ ডাঙ্গায় মাছ ধরার জন্য কী করছেন এই প্রশ্ন করে কিছু ফটো তুলে তাঁরা সেখান থেকে চলে যান৷ কিছু সময় পর আবার সেখানে এসে দেখেন সেই ব্যক্তি ওই জায়গায় নেই৷ কিন্তু সেখানে কয়েকশো পাখি ধরার ফাঁদ পাতা রয়েছে৷ সঞ্জয়বাবু সেই ফাঁদগুলি খুলে নিয়ে পর্যটকদের সঙ্গে ফিরে আসেন৷ এরপরই সমস্ত বিষয়টি কাষ্ঠশালী বনবীথি-র পক্ষ থেকে ডিএফও এবং কাটোয়া রেঞ্জের রেঞ্জার নকুল সৌ মণ্ডলকে জানান হয় বলে জানিয়েছেন সঞ্জয় সিংহ৷ খবর পেয়ে বুধবার কাটোয়া রেঞ্জের রেঞ্জার নকুল সৌ মণ্ডল ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ করতে যান৷ সঙ্গে কাষ্ঠশালী বনবীথি-র সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন৷ কিন্তু এদিন বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাওয়া এবং নির্দিষ্ট সময়ের পরে যাওয়ায় রেঞ্জাররা ফাঁদ দেখতে পাননি৷

এদিনই কাষ্ঠশালী বনবীথির পক্ষ থেকে রেঞ্জারের কাছে দুটি দাবি রাখা হয়েছে৷ পাখীদের রক্ষা করতে সবসময়ের জন্য নিরাপত্তা রক্ষী রাখা এবং পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে বনদফরের পক্ষ থেকে আশেপাশের গ্রামগুলিতে মাইকিং-এর ব্যবস্থা করা৷ গঙ্গার ওপাড় নদীয়া জেলা হওয়ায় সেখানেও মাইকিং করে প্রচারের উদ্যোগ নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে৷

এই ছাড়িগঙ্গার দৈর্ঘ্য প্রায় ১১ কিলোমিটার এবং এরমধ্যেই রয়েছে চুপির এই চর৷ অন্যদিকে, গঙ্গার ৩ কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে মেড়তলার চর৷ গোটা এলাকাটাই পূর্বস্থলী ২ পঞ্চায়েত সমিতির তথা কাটোয়া বন-দফতরের অধীনে রয়েছে৷ এদিকে, বেপরোয়া এই পাখি শিকার সম্পর্কে এদিন পূর্বস্থলী ২ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি গোপা ঘোষ জানান, তিনি কিছু জানেন না৷ এখনও পর্যন্ত তাঁকে কেও অভিযোগও করেননি৷ তবে খোঁজ নিয়ে দেখবেন৷ কাটোয়া রেঞ্জের বনরক্ষক তথা রেঞ্জার নকুল সৌ মণ্ডল জানান, গঙ্গার মেড়তলার চরে কিছু পাখি আসে৷ দিন কয়েক আগে জাল পাতা হয়েছিল৷ আজ তা খতিয়ে দেখতে গিয়েছিলেন৷ কিন্তু কাউকে পাওয়া যায়নি৷ পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে আশেপাশের গ্রামে মাইকিং করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে৷ দুজন অস্থায়ী নিরাপত্তারক্ষী রাখার কথাও আলোচনা হচ্ছে৷

অপরদিকে, এই ঘটনা সম্পর্কে এদিন বর্ধমানের অতিরিক্ত জেলাশাসক (সাধারণ) নিখিল নির্মল জেলা মুখ্য বনাধিকারিক এবং কালনার মহকুমা শাসককে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন৷ তিনি জানান, কোনোভাবেই যাতে চোরা শিকারিরা এভাবে পাখি শিকার করতে না পারে সেজন্য দ্রুত উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে৷ এরই পাশাপাশি বর্ধমান জেলা পরিষদের সভাধিপতি দেবু টুডুও জানান, এই ঘটনা অতি উদ্বেগজনক৷ এরফলে পরিযায়ী পাখিরা যেমন আসা কমিয়ে দেবে, তেমনি পর্যটকরাও আর আসবেন না৷ তাই পূর্বস্থলী ২ পঞ্চায়েত সমিতিকে এব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নেবার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে৷

Advertisement ---
-----