বিজেপি ও বিচ্ছিন্নতাবাদী জোট ‘সুশাসন’ দিক ত্রিপুরায়

ফাইল ছবি

প্রসেনজিৎ চৌধুরী: ব্যক্তিগত মন্তব্য থাকবে৷ তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনীয়৷ শুরুতেই এটা কবুল করে নিলাম৷ ত্রিপুরার রাজনীতি প্রবেশ করল নতুন যুগে৷ টানা বাম শাসনের অবসান হয়ে গিয়েছে কয়েকদিন আগেই৷ এবার বিজেপি ও বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি আইপিএফটির শাসন শুরু হল উত্তর পূর্বাঞ্চলের এই ছোট্ট রাজ্যে৷ কত ছোট এই রাজ্য?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হিসেবটাই ধরে নিন- প্রায় হাওড়া জেলার মতো৷ এমনই এক ক্ষুদ্র রাজ্যের রাজনীতিতে দেশ তো বটেই আন্তর্জাতিক মহল চোখ রেখে চলেছে৷ কারণ ত্রিপুরার নির্বাচন ছিল বামশক্তি বনাম রামশক্তির সরাসরি ভোট লড়াই৷ তাতে প্রথম ধাক্কায় নকআউট বামেরা৷

এতদিন যাঁর অঙ্গুলি হেলনে ত্রিপুরা চলত সেই মানিক সরকার প্রাক্তন৷ গণতন্ত্রে এটাই স্বাভাবিক৷ রাজা আসে..রাজা যায়…মানিক গেলেন বিপ্লব এলেন৷

- Advertisement -

রাজতান্ত্রিক করদ রাজ্য (প্রায় স্বাধীন) ত্রিপুরার দুটি গর্ব করত৷ এক ভারত ভূখণ্ডে বাংলাকে প্রথম দাপ্তরিক ভাষার (সরকারি) মর্যাদা দান ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বিশ্বে প্রথম কোনও স্বশাসিত সরকার দ্বারা স্বীকৃতি প্রদান৷ দুটি ঘটনা ঐতিহাসিক৷ তবে আরও একটি গর্ব ত্রিপুরার আছে৷ দেশে সম্ভবত প্রথমত কোনও রাজ্য সরকার উপজাতি ভাষা ককবরক-কে সরকারি ভাষার মর্যাদা দিয়েছে৷ এসবই গাল ভরানো বিষয়৷ কিন্তু যে ভয়ঙ্কর রক্তাক্ত সময় গত ৯০ দশকে দেখেছেন ত্রিপুরাবাসী তা রীতিমতো দগদগে৷ পৃথক রাজ্যের দাবিতে চলতে থাকা উপজাতি সংঘর্ষ ও সন্ত্রাসবাদে রক্তাক্ত ত্রিপুরা ক্রমশ পাল্টে গিয়েছে৷ এর জন্য অবশ্যই রাজ্যবাসী বাম জমানার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবেন৷

ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের পথ ধরেই ত্রিপুরাবাসী যাদের নির্বাচিত করলেন সেই বিজেপি ও বিচ্ছন্নতাবাদী শক্তি আইপিএফটি কতটা সুশাসন দেয় সেই বিষয়টি নিয়েও চর্চা শুরু হয়েছে৷ আগরতলার রাজনৈতিক মহল থেকে দিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিট পর্যন্ত আলোচনা, এই জোট কতটা শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারবে৷ কারণ নির্বাচন পরবর্তী ত্রিপুরাতে দুটি ছবি পাশাপাশি উঠে এসেছে৷ প্রথমত, তীব্র রাজনৈতিক হিংসা আর দ্বিতীয় রাজনৈতিক সৌজন্য৷

নির্বাচন শেষ হতেই রাজ্যের বহু স্থানে শুরু হয় হামলা৷ বামেদের ‘ঈশ্বর’ লেনিনের বিশাল মূর্তি ভেঙে ফেলা হয় বুলডোজার দিয়ে৷ মুহূর্তে সেই ছবি ভাইরাল গোটা বিশ্বে৷ তার জেরে কলকাতায় বিজেপির ‘প্রাণপুরুষ’ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মূর্তিতে কালি ছেটানো থেকে শুরু করে কেরলে গান্ধী, উত্তরপ্রদেশে আম্বেদকর. তামিলনাড়ুতে দ্রাবিড় ব্যক্তিত্ব পেরিয়ারের মূর্তি বিকৃত করা নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক ডামাডোল শুরু হয়েছে৷ মনীষীদের ভাস্কর্যের অবমাননা ও অসভ্যতা বিশ্ব দেখল৷

ত্রিপুরায় নির্বাচনের আগেই প্রয়াত হন রাজ্যের সমবায় ও মৎস্য মন্ত্রী খগেন্দ্র জামাতিয়া৷ সিপিএমের রাজ্য দফতর দশরথ দেব স্মৃতি ভবনে গিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান বিপ্লব দেব (তখনো হবু মুখ্যমন্ত্রী)৷ সেই সঙ্গে মানিক সরকারের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেন৷ এই সৌজন্য বহুদিন দেখেনি ত্রিপুরা৷

গত কয়েক দশকে কোনও নির্বাচিত নবীন বাম নেতাকে দেখা যায়নি একসময়ের মুখ্যমন্ত্রী তথা প্রাক্তন বিরোধী ও প্রবীণ কংগ্রেস নেতা সমীর রঞ্জন বর্মণের কাছে গিয়ে সৌজন্য প্রকাশ করতে৷ তবে ভদ্র-সুজন ব্যক্তি মানিক সরকার ব্যাতিক্রম৷ রাজনীতির বাইরে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে সমীরবাবুর সঙ্গে একই সারিতে আলাপচারিতায় দেখা গিয়েছে মানিকবাবুকে৷ এতটাই ছিল৷ এর বাইরে ছিল টানা শাসনে থাকার সুবাদে সিপিএম নেতাদের প্রবল ঔদ্ধত্ব৷ এই অভিযোগ আগেও উঠেছে৷ নির্বাচনের পরবর্তী পর্বেও উঠছে৷ তবে নিপাট ভদ্রলোক মানিক সরকারের দৈনন্দিন জীবন নিয়ে কোনও প্রশ্ন ওঠেনি৷ তিনি এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী৷

এসব বাদ দিলে যেটা সবথেকে গুরুত্ব পায় তা হল, আগামী পাঁচ বছর যাদের হাতে থাকবে ত্রিপুরা সেই শক্তি কতটা ‘সুশাসন’ দিতে পারবে ত্রিপুরায়৷ কারণ আইপিএফটি পৃথক তিপ্রাল্যান্ড (মতান্তরে তুইপ্রাল্যান্ড) দাবিতে অনড়৷ আর কেন্দ্র সরকার এই দাবিকে খারিজ করে দিয়েছে৷

এতে আইপিএফটির গোঁসা বাড়ছে৷ যেটা পরবর্তী সময়ে আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন অনেকে৷ সেক্ষেত্রে আবারও কি ভয়াবহ বিচ্ছিন্নতাবাদ শক্তি মাথাচাড়া দেবে ত্রিপুরায় ? উঠতে শুরু করেছে এমন প্রশ্ন৷ গত ২৫ বছর বাম শাসনে যা প্রায় শীত ঘুমে চলে গিয়েছিল৷ ব্যাপারটা চাগাড় দিয়ে ওঠে গত বছর থেকে৷ পৃথক রাজ্যের দাবিতে ‘উলঙ্গ’ আন্দোলন চালিয়েছিল আইপিএফটি এবং তাদের সমর্থন দেয় বিজেপি৷ সেই শক্তি আজ ক্ষমতায়৷

Advertisement
---