স্টাফ রিপোর্টার, কলকাতা: বিজেপির রথযাত্রা – যার নাম গণতন্ত্র বাঁচাও যাত্রা – তার ‘থিম সং’একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত ৷ যা জানার পর রাজনৈতিক মহলের ব্যাখ্যা – ‘এক ঢিলে কয়েকটি পাখি মারার চেষ্টা করেছে বিজেপি৷’

‘‘উড়িয়ে ধ্বজা অভ্রভেদী রথে ওই-যে তিনি, ওই-যে বাহির পথ ৷৷ আয় রে ছুটে, টানতে হবে রশি ঘরের কোণে রইলি কোথায় বসি ! ভিড়ের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে গিয়ে ঠাঁই করে তুই নে রে কোনোমতে …৷’’ রাজনৈতিক রথযাত্রা উপলক্ষে কবির এই গানকে ব্যবহার করাই শ্রেয় মনে হয়েছে গেরুয়া শিবিরের৷ কারণ, কবিগুরুর এই গানে উল্লেখ রয়েছে রথযাত্রার৷

পড়ুন: খসড়া ইস্তেহারে বিশেষ সুবিধা, মুসলিম তোষণের অভিযোগ কংগ্রেসের বিরুদ্ধে

নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহের রথ বাংলার ৪২টি লোকসভা কেন্দ্রে ঘুরবে৷ যাত্রা পথেই বাজবে পূজা পর্যায়ের এই রবীন্দ্রসঙ্গীত ৷ পার্টি সূত্রে যা খবর, দলের শিল্পীরাই ওই গান রেকর্ডিং করবেন৷ রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসু বলেন, ‘‘কয়েকদিনের মধ্যেই শিল্পিরা গণতন্ত্র বাঁচাও যাত্রা উপলক্ষে ওই গানের রেকর্ডিং সম্পূর্ণ করবেন৷ পার্টি নেতৃত্বের ওই গানটিকেই থিম সং হিসেবে উপযুক্ত মনে হয়েছে৷’’

ডিসেম্বরেরই শুরু হচ্ছে বিজেপির রথযাত্রা৷ রাজ্য পার্টির তরফে প্রস্তুতি-পর্বও তুঙ্গে৷ ইতিমধ্যেই ঠিক হয়ে গিয়েছে রথযাত্রার পথ৷ কোন পথে রথ যাবে বা কোন পথে রথ ফিরে আসবে, সে মানচিত্র তৈরি হয়ে গিয়েছে৷ আলোচনা শুরু হয়েছে, কী রকম দেখতে হবে নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহ রথ? খবরের শিরনামে থাকা লালকৃষ্ণ আদবানি রাম-রথের মতো? নাকি মোদী বা বসুন্ধরা রাজের মতো অত্যাধুনিক রথ৷

রাজ্য বিজেপির অন্দরের খবর, বিজেপির রথ আদতে একটি বাতানুকুল (Air Conditioned)বাস৷ ওই এসি বাসটিকেই রথের চেহারা পাবে৷ ‘রথের মতো সেজে’ বিজেপির বাস সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ সহ হাই-প্রোফাইল নেতাদের নিয়ে ছুটবে গ্রাম-শহরে পথে পথে৷ সেই রথে সওয়ারি হতে পারেন নরেন্দ্র মোদীও৷

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ব্যাখ্যা, রবীন্দ্র সঙ্গীতকে থিম-সং করা একটি দক্ষ রাজনৈতিক পদক্ষেপ৷ তৃণমূল ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছে, যে পথে রথ যাবে সেই পথ গঙ্গাজল দিয়ে ধুয়ে দেওয়া হবে৷ বিজেপির রাজনৈতিক রথযাত্রা সাম্প্রদায়িক সম্প্রতির ব্যাঘাত ঘটাবে৷ সেই কারণেই ওই রাস্তায় পরের দিন হবে একতা যাত্রা৷

এক্ষেত্রে রথযাত্রার সময় রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনিয়ে শাসক দলকে চিন্তার রাখবে বিজেপি ৷ কারণ বাংলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই একতার প্রতীক৷ কবিই বঙ্গভঙ্গ রদ চেয়েছিলেন ৷ তিনি লিখেছেন দেশের জাতীয় সঙ্গীত৷ যা প্রতিটি ভারতবাসীকে একসূত্রে গাঁথে৷

পর্যবেক্ষকদের দ্বিতীয় ব্যাখ্যা বিজেপিতে আরও কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে৷ বিজেপি বাঙালী জনমানসে প্রবেশ করতে পারেনি বলে বিরোধীরা প্রায়ই অভিযোগ করে থাকেন৷ যে পার্টির নেতারা এখন ‘‘ভারত মাতা কি জয়’’ বলে, মুখ থেকে ‘‘ভারত মাতার জয় হোক’’একবারের জন্যও শোনা যায় না , তারা তো হিন্দিভাষীদেরই পার্টি৷ জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের উদাহরণ সেখানে কাজে আসে না৷ রথযাত্রায় রবীন্দ্রনাথের গান সেক্ষেত্রে বিজেপি বিরোধীদের অনেক প্রশ্নের জবাব দিয়েছে৷

পড়ুন: অমিত শাহকে বিফ বিরিয়ানি পাঠানোর আবেদন আসাদুদ্দিনের

তবে রথযাত্রায় রবীন্দ্রসঙ্গীতে ব্যবহার একগুচ্ছ বিতর্কের জন্মও দিয়েছে৷ রবীন্দ্রসঙ্গীত বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সুধীর চক্রবর্তীর মতে, ‘‘এই গানর সঙ্গে রথযাত্রার কোনও সম্পর্ক নেই৷ সাধারণ ভাবনা থেকেই রবি ঠাকুর এই গানটি লিখেছিলেন৷ এক সময় এই গানটি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নামেও চালানো হত৷ নেতাজিকে বোঝাতেও এই রবীন্দ্রসঙ্গীত ব্যবহার করা হয়েছে৷’’ সুধীরবাবু অবশ্য বিজেপিকে কড়া ভাষায় ,মালোচনা করেছেন৷ তাঁর বক্তব্য, ‘‘বিজেপির রথযাত্রায় গানটি অন্যায় ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে৷ ওই গান ব্যবহার করে বাড়তি ভোট পাওয়া যাবে না৷ মানুষ এতো বোকা নয়৷’’

অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক তাপস রায়ের বক্তব্য, ‘‘বিজেপির ভাবমূর্তি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিরোধী৷ রথযাত্রার উদ্দেশ্য বাংলার মানুষ ভালোই বোঝে৷ রবীন্দ্রসঙ্গীত চালিয়ে কোনও উপকার হবে না৷ বাংলার মানুষ জানে, ওরা বাংলা বিরোধী৷ বিজেপি শাসিত অসমের তিনসুকিয়ায় বাঙালী হত্যার ঘটনাই প্রমাণ করছে বিজেপি বাংলা বিরোধী পার্টি৷’’

--
----
--