বুলেট ট্রেন আর সর্দার সরোবর ড্যামেই কি গুজরাত জিততে চাইছেন মোদী?

মানব গুহ, কলকাতা: নভেম্বরের নোট বাতিল মার্চে উত্তপ্রদেশ বিধানসভা ভোটে দারুন সাফল্য এনে দিয়েছিল নরেন্দ্র মোদী ও বিজেপিকে৷ সামনের ডিসেম্বরের গুজরাত ভোটও এবার প্রেস্টিজ ফাইট মোদীজির৷ সেই দিকে তাকিয়েই কি বুলেট ট্রেন আর সর্দার সরোবর ড্যামের কোটি টাকার পরিকল্পনা ও প্রচার৷ বিরোধীদের দাবী কিন্তু সেরকমই৷

আরও পড়ুন: কি শাস্তি হবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ?

২০১২ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে একদমই সুবিধা করতে পারে নি বিজেপি৷ মোট ৪০৩ টি আসনের মধ্যে ২২৪ টি পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ পায় সমাজবাদী পার্টি৷ মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসেন মুলায়ম পুত্র অখিলেশ যাদব৷ বহুজন সমাজবাদী পার্টি পায় ৮০ টি আসন৷ বিজেপি পায় মাত্র ৪৭ টি আসন৷ কংগ্রেস পায় ২৮ টি আসন৷

- Advertisement -

আরও পড়ুন: বিশ্বের দ্বিতীয় উচ্চতম বাঁধ দেশকে উপহার মোদীর

২০১৭ সালের মার্চেই ছিল ফের উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচন৷ ২০১২ থেকে পরিস্থিতি অনেকটাই পাল্টেছিল ২০১৭ তে৷ কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি সরকার৷ দেশ জুড়ে এখনও মোদী ঝড় চলছে বলেই দাবী বিজেপির৷ এই অবস্থায় ভারতের সবচেয়ে বেশি আসনের বিধানসভাটা দখল করতে না পারলে মোদী ঝড়ের গল্প আর তো দেওয়া যাবে না৷ অতএব উত্তরপ্রদেশ দখল করতেই হবে৷ এটাই ছিল একমাত্র লক্ষ৷

আরও পড়ুন: মোদীর স্বপ্নের ‘আচ্ছে দিনে’ ভুগছে ভারতের আমজনতা

এমনিতেই ঘরোয়া বিবাদে ভেঙে চুরমাড় হয়ে গিয়েছিল মুলায়ম-অখিলেশের সমাজবাদী পার্টি৷ তবু, উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনের ঠিক ৪মাস আগেই গতবছরের ৮ ই নভেম্বর সন্ধ্যায় মোদীর নোটবন্দীর ঘোষণা৷ গোটা ভারত এক মুহূর্ত্বে ব্যাঙ্কের লাইনে৷ বাদ যায় নি উত্তরপ্রদেশও৷

আরও পড়ুন: দেশের ইতিহাসে বুলেট যুগের সূচনা করলেন মোদী

কাকতালিয় হলেও, মোদীর নোটবাতিলের মাস্টারস্ট্রোকে উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে ঝড়ের মত উড়ে গিয়েছিল সব আঞ্চলিক দল৷ ৪০৩ টি আসনের মধ্যে ৩২৫ টি আসন দখল করে মোদীর বিজেপি একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করল উত্তরপ্রদেশে৷ সমাজবাদী পার্টি, কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মেলালেও অখিলেশ যাদব-রাহুলের গান্ধীর ঝুলিতে মাত্র ৫৬ টি আসন৷ বিজেপি গতবারের ৪৭ থেকে এবার ৩২৫ টি, অন্যদিকে সমাজবাদী-কংগ্রেস জোট গতবারের ২৫২ থেকে নেমে মাত্র ৫৬ টি আসন পায়৷

আরও পড়ুন: একই পথে হাঁটলেন মোদী-মমতা

প্রকাশ্যে না হলেও, মোদীর নোট বাতিলের মাস্টারস্ট্রোককেই এর জন্য কৃতিত্ব দিয়েছিলেন বিরোধীরা৷ যদিও পরে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের বিভিন্ন রিপোর্টে প্রমাণ হয়ে যায়, নোট বাতিলের খুব একটা ফায়দা হয় নি৷ কিন্তু, সেই নোট বাতিলের প্রসঙ্গ টেনেই উত্তরপ্রদেশ দখলে নেয় বিজেপি৷

আরও পড়ুন: মোদীর রাজত্বে বিদেশি মুদ্রা সঞ্চয়ে রেকর্ড গড়ল ভারত

সামনে আবার একটা নির্বাচন৷ প্রধানমন্ত্রী হবার পর প্রথমবারের জন্য ছেড়ে আসা গুজরাত বিধানসভায় ভোট৷ এটাও নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদীর জন্য আরও একটা প্রেস্টিজ ফাইট৷ সম্মানের লড়াই৷ যদিও গতবার গুজরাত জিতেছিলেন মোদীই৷ তবু, এবারে কোনরকম ঢিলে দিতে রাজী নয় বিজেপি৷

আরও পড়ুন: ৩ বছরের অজ্ঞাতবাসে কোথায় ছিলেন মোদী, আজও রহস্য!

প্রশ্নটা ঠিক এখানেই উঠেছে৷ উত্তরপ্রদেশ জেতার জন্য ছিল নোট বাতিল৷ বিশাল প্রচার৷ তাহলে, গুজরাত জেতার জন্যই কি বুলেট ট্রেন আর সর্দার সরোবর বাঁধ? প্রশ্ন উঠছে সব মহলেই৷ প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন বিরোধীরাও৷

আগামী ডিসেম্বরেই গুজরাত ভোট৷ ২০১৪ সালে যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পদ ছেড়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী, সেই গুজরাতেই এবার বিধানসভা ভোট৷ ২০১৪ তে মোদীর নেতৃত্বে ১৮২ টি আসনের মধ্যে ১১৬ টি আসন পায় বিজেপি৷ মাত্র ৬০ টি আসন পায় কংগ্রেস৷ যদিও গুজরাতে বিজেপি ক্ষমতায় আছে ১৯৯৫ থেকেই৷ তা সত্ত্বেও, আগামী ডিসেম্বরের ভোটটা বিজেপির পক্ষে মাস্ট উইন প্রেস্টিজ ফাইট৷

আরও পড়ুন: মোদীজি-কে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালেন মমতা দিদি

যদিও, এখন পর্যন্ত সব ওপিনিয়ন পোলে বিজেপিকেই এগিয়ে রাখা হয়েছে, তবুও কোনরকম রিস্ক নিতে রাজী নয় বিজেপি৷ আর এই গুজরাত ভোটের দিকে তাকিয়েই ১ লক্ষ কোটি টাকার বুলেট ট্রেন ও ৫০ হাজার কোটি টাকার সর্দার সরোবর ড্যাম বলেই অভিযোগ বিরোধীদের৷

কংগ্রেসের তরফ থেকে পরিস্কার বলে দেওয়া হয়েছে যে গত এক মাসে ৪ টি বড় রেল দূর্ঘটনা ঘটেছে ভারতীয় রেলে, সেখানে বুলেট ট্রেনের স্বপ্ন বাতুলতা৷ বিরোধীদের তরফ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, বাজেটে শিক্ষার থেকেও বেশি খরচা বুলেট ট্রেনে৷ প্রশ্ন তোলা হয়েছে সর্দার সরোবর বাঁধের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়েও৷ তবে সব কিছুই উড়িয়ে দিয়েছে বিজেপি৷

বিরোধীদের অভিযোগ, পেট্রোল ডিজেলের দাম আকাশছোঁয়া হয়েছে এই সরকারের আমলে৷ রান্নার গ্যাসের দাম বেড়েছে মোদীর আমলে৷ নোটবাতিল সিদ্ধান্ত মুখ থুবড়ে পড়েছে৷ মহারাষ্ট্রে আজও কৃষক মৃত্যু অব্যহত৷ নোটবাতিলের জেরে ব্যাঙ্ক সুদের হার অনেক কমেছে৷ সমস্যা বেড়েছে আমজনতার৷ সবমিলিয়ে সাধারণ মানুষের ভরসা হারিয়েছে মোদী সরকার৷ তাই, ঠিক উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনের আগে নোটবাতিলের মত, গুজরাত নির্বাচনের আগেও কিছু একটা করে মানুষের মন অন্যদিকে ঘোরাতেই হত বিজেপিকে৷ সেই জন্যই বুলেট ট্রেন আর সর্দার সরোবর ড্যামের দেশ জোড়া প্রচার৷

বিরোধীদের তরফ থেকে সোস্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে যে, উত্তরপ্রদেশের ভোটের জন্য নোটবন্দী, আর গুজরাত ভোটের জন্য বুলেট ট্রেন ও সর্দার সরোবর প্রজেক্ট৷ যদিও বিজেপির তরফ থেকে এই অভিযোগ পরিস্কার উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে৷ তবে, সব ঘটনাই কি কাকতালিয় ? আবার কি মোদীর মাস্টারস্ট্রোক? এবারে একেবারে দু-দুটো৷ প্রশ্ন কিন্তু উঠছে৷

এতেই কি হবে? না, ১৮২ আসনের গুজরাত বিধানসভা জিততে ৩০০০ কোটি টাকা খরচা করে ঠিক ১৮২ ফুট উঁচু সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মূর্তিকেও আসরে নামতে হবে? সাতপুরা রেঞ্জের সাধু পাহাড় ভেঙে ১৮২ মিটারের এক অতিকায় বল্লভভাই প্যাটেলের মূর্তি বানাচ্ছে মোদীর বিজেপি সরকার৷ ৩০০০ কোটি টাকা খরচা করে মূর্তির কি দরকার, প্রশ্ন উঠেছে৷ কিন্তু দেখনদারীতে বিশ্বাসী মোদী বিরোধীদের এই প্রশ্নের উত্তর দেন নি বলেই অভিযোগ৷ মনে করা হচ্ছে ২০১৯ লোকসভা ভোটের দিকে তাকিয়েই এই মূর্তির বিজ্ঞাপন করা হচ্ছে৷ না কি, ডিসেম্বরে গুজরাত ভোটের ঠিক আগেই সাড়ম্বরে উদ্বোধন করবেন মোদী, সেটাই এখন দেখার৷

গুজরাত বিধানসভা ভোটের ফলই প্রমাণ করবে নোটবাতিলের পর উত্তরপ্রদেশ জেতার মত বুলেট ট্রেন আর সর্দার সরোবর ড্যামই ফের কামাল করল কিনা৷ তা যদি হয়, তাহলে ২০১৯ এর লোকসভা ভোটের আগে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মূর্তি ছাড়া আর কি কি চমক মোদী দেন সেদিকে লক্ষ রাখতেই হবে৷ তবে, সেগুলো নিশ্চয়ই আর কাকতালীয় থাকবে না৷ সেগুলো যে শুধুমাত্র ভোট বৈতরণী পার হবার জন্যই সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখবে না৷

Advertisement
-----