কানা শেখ মারা গেল, হুঁশিয়ার থাকা ভালো

বহুদিন আগে ‘বর্তমানে’ থাকতে একটি বিশেষ নিবন্ধ লিখেছিলাম৷ বিষয়বস্তু ছিল ওসামা বিন-লাদেনের দুই গুরুঠাকুরের একজন ওমর আবদেল রহমান, অপরজন হাসান আল-তুরাবি৷ একজন পরিচিত ছিল ‘কানা শেখ’ বলে, অপরজনকে ইংরেজিতে বলা হত ‘গ্রে কার্ডিনাল’৷ গ্রে কার্ডিনাল অর্থাৎ হাসান আল-তুরাবি আগেই মারা গিয়েছিল, ২০১৬ সালে৷ এবার কানা শেখ অর্থাৎ ওমর আবদেল রহমানও বরাবরের জন্য চোখ বুজল৷

নিখিলেশ রায়চৌধুরী

দুজনেই ছিল ফ্যানাটিক৷ কট্টরপন্থী মুসলিম সন্ত্রাসবাদী মতবাদের প্রচারক৷ আল-কায়েদার ব্রেন আয়মান আল-জাওয়াহিরি ছিল ওমর আবদেল রহমানের প্রত্যক্ষ চ্যালা৷ মজা হল, নাসের যত দিন মিশরের প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তত দিন ওমর আবদেল রহমান তাঁর বিরুদ্ধে প্রচার করেও কোনও রকম সুবিধা করে উঠতে পারেনি৷ জন কে কুলি তাঁর ‘আনহোলি ওয়র’ বইতে খুব সুন্দর লিখেছিলেন, নাসেরের সময় ওমর আবদেল রহমানের প্রচার ছিল অনেকটা কার্টারের জমানায় টেক্সাসে তাঁর বিরুদ্ধে প্রচার চালানোর মতো৷ কেউই তাতে পাত্তা দিত না৷ নাসের নিজে ছিলেন ধর্মনিষ্ঠ মুসলমান৷ প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন৷ কিন্তু কট্টরপন্থী ধর্মান্ধ মোল্লাদের তিনি পেলেই হাতের সুখ মেটাতেন৷

ওমর আবদেল রহমানের কপাল খোলে নাসেরের পরবর্তী শাসক আনোয়ার সাদাতের আমলে৷ সেই সময়েই আফগানিস্তানে রুশ ফৌজের আগ্রাসনের ঘটনা ঘটে৷ পালটা আমেরিকার ইন্ধনে তার পেটোয়া মুসলিম রাষ্ট্রগুলি কট্টরপন্থী জেহাদিদের তোল্লাই দিয়ে সেখানে পাঠায়৷ মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদাত ‘কানা শেখ’ ওমর আবদেল রহমান ও তার চ্যালাচামুণ্ডাদের প্রবল বেগে তোল্লাই দিতে শুরু করেন৷ ঠিক যেমন তৎকালীন সুদানি শাসককুলও হাসান আল-তুরাবির পায়ে পড়ে যায়৷ কৃতজ্ঞতাস্বরূপ পরবর্তীকালে ওমর আবদেল রহমানের চ্যালারাই সাদাতের দেহরক্ষী সেজে তাঁর প্রাণহরণ করে৷ কিন্তু ততদিনে প্যান্ডোরার বাক্স তো হাট করে খোলা হয়ে গিয়েছে!

- Advertisement -

১৯৮৯-৯০-তে আফগান জিহাদ শেষ হল৷ ওমর আবদেল রহমান ও আল-তুরাবির চ্যালাচামুণ্ডারা দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ল৷ একদল আলজেরিয়ায় ফিরে শুরু করল মারণ-উচাটন৷ আর একপাল মিশরে ফিরে আগুন জ্বালিয়ে দিল৷ সুদানি যারা ছিল তারা দেশে ফিরেই আবার আল-তুরাবির শরণ নিল৷ দেখতে দেখতে আগুন লাগল সুদানেও৷ শেষ পর্যন্ত নর্থ সুদান-সাউথ সুদান তো দুভাগে ভাগই হয়ে গেল৷ পরবর্তীকালে এদেরই একটা ছাতার তলায় নিয়ে এল ওমর আবদেল রহমানের প্রত্যক্ষ চ্যালা আয়মান আল-জাওয়াহিরি এবং ওসামা বিন লাদেন৷ আল-কায়েদার মাধ্যমে৷ শোনা যায়, আল-কায়েদার সাংগঠনিক কাঠামোও নাকি আসলে ওমর আবদেল রহমানেরই ব্রেন চাইল্ড৷

তবে ওমর আবদেল রহমানই হোক, কিংবা হাসান আল-তুরাবিই হোক, অথবা ওসামা বিন-লাদেনই হোক, কেউই বোধহয় তাদের পরবর্তী মিউটেশন ইসলামিক স্টেটের মতো নারকীয় কর্মকাণ্ড ঘটানোর কথা কল্পনাও করতে পারেনি৷ কিন্তু কট্টরপন্থী মুসলিম সন্ত্রাসবাদ সহ যে কোনও উগ্র সন্ত্রাসবাদের ক্ষেত্রে ঠিক এ রকমটাই ঘটে৷ একের থেকে জন্ম হয় আরও ভয়াবহ সংস্করণের৷ অ্যামিবার মতো এক ভাগ হয়ে যায় বহুতে, বহু আবার প্রয়োজন একজোট হয়, তার পর কমন এনিমির কাছে ধাক্কা খেলে, বাধা পেলে কিংবা তাকে পর্যুদস্ত করা হয়ে গেলে একে অপরকে ছোবল মারতে শুরু করে৷ এ কথা উগ্র দক্ষিণপন্থার ক্ষেত্রেও যেমন সত্য, উগ্র বামপন্থার ক্ষেত্রেও সত্য৷ দেশে দেশে, কালে কালে তা বারংবার প্রমাণ হয়ে গিয়েছে৷ রুশ নভেম্বর বিপ্লবের নেতা ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন স্রেফ কথার কথা লেখেননি যে, উগ্র বামপন্থা আর উগ্র দক্ষিণপন্থা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ৷

তার উপর রাজনৈতিক সন্ত্রাসবাদের চাইতে কট্টর ধর্মান্ধতা ও সন্ত্রাস আরও ভয়ংকর৷ এরকুল পোয়রোর একটি গল্পে আগাথা ক্রিস্টি লিখেছিলেন, রাজনৈতিক ফ্যানাটিকদের চাইতে ধর্মীয় ফ্যানাটিকরা আরও সাঙ্ঘাতিক৷ তাই হাসান আল-তুরাবি এবং ওমর আবদেল রহমানের এন্তেকাল মানেই কট্টরপন্থী মুসলিম সন্ত্রাসবাদের আপদ চুকল, তা নয়৷ বরং, তাদের স্মরণে এর উপসর্গ আরও উথলে উঠতে পারে৷ ভারতেও, পৃথিবীর অন্যান্য মুসলিম জনসংখ্যাওয়ালা দেশেও৷ কারণ, পৃথিবীর দুই মহাশক্তি আমেরিকা কিংবা রাশিয়া ইন্ধন না জোগালেও এদের মতো নরমাংসভোজীদের উসকানি এবং তেল দেওয়ার মতো দেশের সংখ্যা এখনও নিতান্ত কম নয়৷

Advertisement ---
---
-----