‘খেয়া’ ছেড়ে দিকশূন্যপুরে পাড়ি দিলেন ‘বোলপুরের রূপকার’

বোলপুর: শ্রাবণে শান্তিনিকেতনের পথে পথে বিষাদের সুর৷ একদিন এলাকার মানুষ ভোটে জিতিয়ে এনেছিলেন যে মানুষটাকে ধীরে ধীরে তিনিই হয়ে গেলেন বোলপুরের রূপকার৷ সোমবার সকালে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুর খবর এসে পৌঁছতে চোখের জল বাধ মানেনি এখানকার বহু মানুষের৷ একদিন রাজনীতি তাঁকে নিয়ে এসেছিল লালমাটির দেশে৷ রবিঠাকুরের দেশে৷

কিন্তু শান্তিনিকেতনের সজল প্রকৃতি, সরল-সাদামাটা মানুষগুলোর অকৃত্রিম ভালোবাসার বাঁধনে ক্রমেই আটকে পড়েন তিনি৷ গুরুদেবের এই শান্তিনিকেতনই হয়ে ওঠে তাঁর আত্মার বড় কাছের৷ তাই তো প্রথমে সার্কিট হাউসে থাকলেও পরবর্তীকালে স্থায়ী একটা থাকার বন্দোবস্ত করেন এখানে৷

আরও পড়ুন: শেষ সফরে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

- Advertisement -

সোনাঝুরির একেবারে কোল ঘেঁষে তৈরি করেন নিজের বাসভবন ‘খেয়া’৷ যা লোকের মুখে মুখে ফিরত ‘লালবাড়ি’ বলেও৷ বহুবার শান্তিনিকেতনে গিয়ে এলাকার লোকজনকে বলতে শুনেছি, ‘‘শেষ জীবনে সোমনাথবাবু এখানে এসেই থাকবেন, মিলিয়ে নেবেন!’’ সত্যিই তিনিও হয়তো মন থেকে চেয়েছিলেন, শেষজীবনে স্ত্রী রেণু চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে নিরিবিলি এই শান্তির নীড়ে দিন কাটাবেন৷ যদিও তা আর সম্ভব হল কোথায়! তার আগেই তো চলে গেলেন চির শান্তির দেশে৷

দীর্ঘদিন বোলপুরের সাংসদ ছিলেন তিনি৷ সে সময় মাসে ১৫-২০ দিনও টানা থেকে গিয়েছেন এখানে৷ তবে গত দু’বছর ধরে অসুস্থতার কারণে আসতে পারেননি৷ খেয়ার ভিতরে এখনও সাজানো রয়েছে তাঁর স্মারক, উপহার, বইগুলি৷ গুরুদেবের ছবি, গানের সিডিতে বোঝাই ঘর৷ রবিঠাকুর যে তাঁর বড় প্রিয় মানুষ ছিলেন৷ অবসরে তিনিই যে সঙ্গ দিতেন, ঘরে ঢুকলে তা টের পাওয়া যায়৷

দু’বছর পর সোমবার দরজা খোলা হল খেয়ার৷ অধ্যাপক স্বপন মুখোপাধ্যায় সোমনাথবাবুর প্রতিবেশি জানালেন, ‘‘আজ সকালে খবরটা পাই৷ আর গল্প করতে ডাকবেন না ভাবলেই ভিতরটা খালি হয়ে যাচ্ছে৷ চিরকালের জন্য চলে গেলেন৷ পাশের বাড়িতে আর কখনও আসবেন না আড্ডা দিতে৷ আমরা একজন অভিভাবককে হারালাম৷ উনি ভোটে জেতার পর থেকেই এখানে আছেন৷ প্রতি মাসেই উনি আসতেন৷ ১২-১৫ দিন থাকতেন৷ যখনই আসতেন আমাদের সঙ্গে দেখা করতেন৷ আজ দিনটা বড় বেদনার৷’’

আরও পড়ুন: প্রয়াত লোকসভার প্রথম বাঙালি স্পিকার সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

একইরকম শূন্যতা বোলপুরে সিপিএমের জোনাল কমিটির সদস্য উৎপল রুদ্রর মনেও৷ দল সোমনাথবাবুকে বহিষ্কার করতে পারে, কিন্তু অনুগামীদের মন থেকে কী এরকম এক নেতাকে সরানো সম্ভব! উৎপলবাবু জানালেন, ‘‘২৫ বছর আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি৷ জনসভা থেকে সেমিনার, পার্টির জোনাল কমিটির বৈঠক সবসময় তাঁকে পাশে পেয়েছি৷ বোলপুরে এলেই প্রতিদিন জোনাল পার্টি অফিসে আসতেন৷ আজ আমরা এমন একজনকে হারালাম যার অভাব অপূরণীয়৷ গোটা দেশের বাম রাজনীতির অপূরণীয় ক্ষতি৷’’

১৯৮৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বোলপুরের সাংসদ ছিলেন তিনি৷ সাংসদ থাকাকালীন ঢেলে সাজাতে চেয়েছিলেন বোলপুরকে৷ প্রান্তিক টাউনশিপ তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত৷ বীরভূমের প্রথম মহিলা কলেজ পূর্ণিদেবী চৌধুরি মহিলা মহাবিদ্যালয় তাঁর হাত ধরেই৷ শান্তিনিকেতনের উন্নয়ন পর্ষদের প্রতিষ্ঠাও তাঁর হাতেই৷

আরও পড়ুন: সোমনাথ দা’কে হারিয়েই প্রথম সাংসদ হয়েছিলেন মমতা

২০০৭ সালে ডাকবাংলো মাঠে ক্রীড়াঙ্গন তৈরি করেন তিনি৷ বিশ্বভারতীর মৈত্রী ছাত্রীনিবাস তৈরিতে তাঁর বিশেষ অবদান আজও মুখে মুখে ফেরে৷ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ই সেই মানুষ যিনি উন্নয়ন পর্ষদ প্রতিষ্ঠার পর জানিয়েছিলেন গুরুদেবের বাসগৃহ উদয়ন গৃহের উচ্চতার থেকে বেশি উচ্চতার কোনও বাড়ি যেন শান্তিনিকেতনে না তৈরি হয়৷ গুরুদেবের প্রতি তাঁর অগাধ শ্রদ্ধা৷ রবীন্দ্রনাথকে সম্মান জানাতেই শান্তিনিকেতনের মানুষের কাছে এটুকু চেয়েছিলেন৷

রাজনৈতিক জীবনের একটা তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় তাঁর বোলপুরে কেটেছে ঠিকই৷ তবে রাজনীতির অগোচরে শ্যামবাটী, সোনাঝুড়ির মাঠ, আদিবাসী গ্রাম, খোয়াই, প্রান্তিকের লালমাটির সঙ্গে কবে যে এই লালপার্টির নেতার এতটা সখ্যতা হয়ে গিয়েছে তা বোধহয় কেউ বুঝতেই পারেননি৷

Advertisement ---
-----