লোকসভার আগেই প্রশ্নের মুখে ‘ব্র্যান্ড মোদী’

দেবময় ঘোষ: ২০১৯ সালে মোদীর অ্যাসিড টেস্ট৷ ‘ব্র্যান্ড মোদী’র বড় পরীক্ষা৷ এপ্রিল-মে লোকসভা নির্বাচন হলে নরেন্দ্র মোদী কী আবার ফিরছেন? বিশ্বের সবথেকে বড় গণতন্ত্রে এখন এটিই কোটি টাকার প্রশ্ন৷ কয়েকমাস আগে পর্যন্ত মোদী এবং বিজেপির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অমিত শাহ ২০১৯ নির্বাচন নিয়ে দুশ্চিন্তা করতেন না৷ কিন্তু দেশে শেষ বিধানসভা নির্বাচন পর্বের পর তাঁরা দুজনেই আর শুধু চিন্তায় আটকে নেই৷ চিন্তার পরিধি দুশ্চিন্তার সীমা অতিক্রম করেছে৷

সংবাদ মাধ্যমে মোদীকে সেই কারণেই বলতে হয়েছে, পাঁচ রাজ্যের মধ্যে তেলেঙ্গানা বা মিজোরামে বিজেপি ক্ষমতায় আসবে, এমন কল্পনা তিনি স্বপ্নেও করেননি৷ তবে হ্যা, ছত্তিশগড়ে দলের হার হয়েছে৷ রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশে বিজেপি হারেনি৷ ভোটে কংগ্রেস একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি৷ বিধানসভা ত্রিশঙ্কু হয়েছে৷ অন্যান্য পার্টির সমর্থনে সরকার গড়েছে কংগ্রেস৷

- Advertisement -

বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে ২০১৪ সাল থেকেই জনতার কাছে আসার চেষ্টা করেছেন মোদী৷ কিছু পুরানো প্রকল্পকে নতুনভাবে করার চেষ্টা করেছেন তিনি৷ তবে বিমূদ্রাকরণ বা নোটবন্দী বা ডিমোনেটাইজেশন নিয়ে সব থেকে বেশি আলোচনা হয়েছে৷ রাতারাতি ৫০০ এবং হাজার টাকার নোট বাতিল করে তিনি দেশের সিংহভাগ জনতার কাছে ‘খলনায়ক’ হয়েছেন৷ তবে তাঁর একাত্ম সমর্থকরা সেসময় বলেছিলেন, নোটবন্দী হল কালো টাকার বিরুদ্ধে ‘মাস্টারস্ট্রোক৷’ অবশ্য নোটবন্দী নিয়ে মোদীও অনেকদিন পরে আবার বলতে শুরু করেছেন৷

সম্প্রতি তিনি বলেছেন, দেশে কালো টাকার বিরুদ্ধে অভিযান প্রয়োজনীয় ছিল৷ সেই কারণেই প্রয়োজনীয় ছিল নোটবন্দী৷ গদির তলায় নোট লুকানোর দিন শেষ৷ দেশে কোনও সমান্তরাল অর্থনীতি চলতে পারে না৷ তবে বন্দী করা অর্থের (পুরানো ৫০০ এবং হাজারের নোট) হিসেব মিলিয়ে কী দেখা গিয়েছে, সেটিই নির্বাচনের আগে মোদীর মাথা ব্যাথার কারণ হতে পারে৷ যা অর্থ বাজারে ছিল, তা প্রায় সবই ফিরে এসেছে ব্যাংকে৷

ফইল ছবি

নোটবন্দী মোদীকে যতটা জ্বালাতন করেছে, গুডস অ্যান্ড সার্ভিস ট্যাক্স (জিএসটি) ততটা করেনি৷ সারা দেশের ব্যবসায়ী সমাজ এই জিএসটির ব্যাপারে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছিল৷ তবে বছর শেষে, বিভিন্ন দ্রব্যে ট্যাক্স ছাড় দিয়ে আমজনতার মন পেয়েছেন মোদী৷ কিন্তু, ব্যবয়াসী সমাজের একটা বড় অংশ মোদীর উপর ক্ষিপ্ত৷ ভোটবাক্সে তাঁরা জবাব দিতে চান৷ তাদের নিয়ে বেশি চিন্তিত নন মোদী৷ বরং সংবাদমাধ্যমে তিনি বলছেন, জনতা জিএসটির ফলে লাভ করতে শুরু করেছে৷ একসময় জিনিসপত্রের উপর ৩০ শতাংশ বিক্রয় কর ছিল৷ এখন শূন্য শতাংশ জিএসটি’রও উদাহরণ রয়েছে দেশে৷

মোদী যে সবার সঙ্গে কথা বলে সরকার চালান, সে সুনাম তাঁর নেই৷ ক্যাবিনেটে মোদীর সহযোগীরা ঘনিষ্ঠ মহলে বলেন, প্রধানমন্ত্রী সকলের কথা মন দিয়ে শোনেন৷ কিন্তু নিজে সিদ্ধান্ত নেন৷ বিজেপির সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ হবে যদি শরিকরা মোদীকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে না চায়৷ মোদী নিজেই বলছেন, এনডিএ-এর সঙ্গে যে শরিকরা থাকেন তারা ‘ফলে ফুলে’ বাড়েন৷ কংগ্রেস নিজের শরিকদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়৷ কিন্তু শরিক দলগুলি কী একই রকম ভাবে? মোদীর ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’ স্লোগান শরিকদের জন্য খুব জনপ্রিয় হয়নি৷ শরিকদের নিয়ে সুখে সংসার করতে পারেন, এমন সুনাম নেই অমিত শাহেরও৷

ফাইল ছবি

রামমন্দির নিয়ে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির প্রশ্নের মুখে ইতিমধ্যেই পড়েছেন মোদী৷ তাঁর সরকার চাইছে, আদালতের রায় মেনে চলা হোক৷ আবার, বিজেপির আদর্শগতগুরু রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ সহ বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং বজরং দল চাইছে ‘অর্ডিন্যান্স’ এনে আগামী তিন মাসে অযোধ্যায় তৈরি হোক রামমন্দির৷ উদ্যোগ নিক মোদী সরকার৷ নয়তো মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তিশগড়ের মতো দেশের অন্যান্য জায়গা থেকেও নিশ্চিহ্ন হবে বিজেপি৷ হিন্দু সংগঠনগুলির চাপে মাথা নত করলে দেশে অস্থিরতা তৈরি হবে জানেন মোদী৷ কেন্দ্রীয় সরকারকে ‘অসহিষ্ণু’ উপাধিতে ভূষিত করেছে দেশের বিরোধীরা৷ এপ্রিল-মে’তে দেশের সাধারণ নির্বাচনের আগে বিরোধীদের হাত শক্ত করতে চায় না মোদী৷

দিল্লি, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তিশগড়, কর্ণাটক বিধানসভা নির্বাচনের পর সরকার গড়তে পারেনি বিজেপি৷ গুজরাটে কঠিন লড়াইয়ের মুখে পড়তে হয়েছে বিজেপিকে৷ অল্পেশ-জিগনেশ-হার্দিকরা ‘জিরো থেকে হিরো’ হয়েছেন৷ রাহুল গান্ধীর হাত তাঁরা শক্ত করেছেন৷ ঘরের পাশের ‘সেদিনের ছেলে’ ইমরান খানও তাঁর বিরুদ্ধে মন্তব্য করছেন৷

কিন্তু একথা বাস্তবসম্মত যে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদীর রাজনৈতিক শত্রুর সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে৷ কারণ মোদী ভালো বক্তা৷ তাকে যাঁরা পছন্দ করেন না, তাঁর বক্তব্যকেও ঘৃণা করেন৷ ‘ব্র্যান্ড মোদী’কে নেগেটিভ পাবলিসিটি দিতে এরা সকলেই কিছু না-কিছু সাহায্য করছেন৷ ইতিমধ্যেই ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’ এবং ‘সুট-বুটকে সরকার’ – এইসব উক্তিগুলি সংসদের ভিতরে বাইরে জনপ্রিয়তা পেয়েছে৷

ফাইল ছবি৷

এটা পরিষ্কার যে সারা দেশে মোদী ম্যাজিক ফের জীবিত করার চ্যালেঞ্জে নিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী৷ নয়তো টিভির সামনে বসে তিনি ‘সার্জিকাল স্ট্রাইক’ পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা করতেন না৷ তবে ২০১৪ সালের ম্যাজিকে এখন দেশবাসী মজবে না, তা ভালোই জানেন অমিত শাহরা৷ এবারে ভারতের সাধারণ নির্বাচনকে অনেকেই আমেরিকার প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করেছেন৷ মোদী বনাম রাহুল৷ সেক্ষেত্রে ‘ব্র্যান্ড মোদী’র কথা স্মরণ করিয়েই ভোট চাইবে বিজেপি৷ নজরে থাকবেন যিনি তাঁর নাম – নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী – আপনি পছন্দ করুন বা নাই করুন – নজর এড়িয়ে যেতে পারবে না৷