জুটি ভেঙে গিয়েছে, শোকাহত বুদ্ধ

স্টাফ রিপোর্টার, কলকাতা: তাঁর দক্ষতা ও সততা চিরকাল আমার স্মরণে থাকবে৷ প্রয়াত প্রাক্তন শিল্পমন্ত্রী নিরুপম সেন সম্পর্কে বলেছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য৷ বুদ্ধদেববাবু যখন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, শাসক-বিরোধীরা একটি শব্দবন্ধ কন্ঠস্থ করেছিলেন -‘বুদ্ধ-নিরুপম৷’স্তুতিতে বা বিচ্যুতে – বাম সরকারকে বোঝাতে‘বুদ্ধ-নিরুপম’শব্দবন্ধ ঘুরে ফিরে এসেছে৷ নিরুপম সেনকে পার্টিতে বা ক্যাবিনেটে শুধুমাত্রা সহকর্মী হিসেবেই নয়, একান্ত বন্ধু হিসেবেও পেয়েছেন বুদ্ধদেব৷

হয়তো সেই কারণে নিরুপমকে শ্রদ্ধা জানাতে বুদ্ধদেব শোকবার্তায় লিখেছেন, ‘‘কমরেড নিরুপম সেনের সঙ্গে দীর্ঘদিন পার্টিতে এবং সরকারে একসাথে কাজ করেছি। তাঁর দক্ষতা এবং সততা চিরকাল আমার স্মরণে থাকবে। তাঁর পরিবারের প্রতি আমার আন্তরিক সমবেদনা জানাচ্ছি।’’ বামফ্রন্টের এক ব্যতিক্রমী মুখ্যমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন বুদ্ধদেব৷ জ্যোতি বসু পরবর্তীযুগে বাম জমানা সম্পর্কে যথন নানান অভিযোগ উঠছে, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে স্পষ্ট হচ্ছে হতাশার বহিঃপ্রকাশ৷ সেইসময়, উন্নততর বামফ্রন্টের অঙ্গিকার করেছিলেন বুদ্ধদেব৷ মূল কথা – কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যত৷ নতুন ভাবনায়, বুদ্ধদেবের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মেলাতে সব থেকে আগে ছিলেন নিরুপম৷

১৯৪৬ সালের ৮ই অক্টোবর কমরেড নিরুপম সেনের জন্ম। তাঁর শৈশব কেটেছে বর্ধমান জেলার গোবিন্দপুর অঞ্চলে। সেখানকার রায়পুর হাইস্কুলে তাঁর পিতা ভুজঙ্গভূষণ সেন শিক্ষকতা করতেন। ঐ স্কুলেই নিরুপম সেন পড়াশুনা করেন এবং কৃতিত্বের সঙ্গে স্কুল ফাইনাল পাস করেন। এরপরে ১৯৬১ সালে তিনি বর্ধমান রাজ কলেজে ভর্তি হন বিজ্ঞান বিভাগে। সেই সময়েই তিনি ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হন এবং দ্রুত জনপ্রিয় ছাত্র নেতা হয়ে ওঠেন। তিনি অত্যন্ত সুবক্তা ছিলেন এবং মানুষকে আকর্ষণ করার ক্ষমতা রাখতেন। ছাত্রাবস্থাতেই নিরুপম সেন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ অর্জন করেন। তাঁর পার্টি সদস্যপদের প্রস্তাব করেছিলেন সি পি আই (এম) নেতা মদন ঘোষ এবং সমর্থন করেছিলেন সুশীল ভট্টাচার্য৷

- Advertisement -

১৯৬৬ সালে নিরুপম সেন বর্ধমান জেলায় ছাত্র ফেডারেশনের সম্পাদক নির্বাচিত হন। ইতিমধ্যে তিনি বর্ধমান রাজ কলেজ থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক হয়েছেন এবং তারপরে কলা বিভাগেও স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। শিক্ষান্তে তিনি প্রথম জীবনে কিছুদিন শিক্ষকতার কাজ করেছিলেন৷ প্রথমে বর্ধমানের সি এম এস হাইস্কুলের প্রাতঃবিভাগে এবং তারপরে তিকরহাট হাইমাদ্রাসায় কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। এরপরে ১৯৬৮ সালে তিনি পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হন৷

১৯৬৮ সালের এপ্রিলে বর্ধমানে অনুষ্ঠিত হয় মতাদর্শগত প্রশ্নে সি পি আই (এম)-র কেন্দ্রীয় প্লেনাম। প্লেনামে অংশ নিয়ে যেখানে পলিট ব্যুরো সদস্যরা রাত্রিবাস করতেন সেই বর্ধমান ভবনে স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন নিরুপম সেন, ডাইনিং রুমে টেবিলের ওপর চাদর পেতেই শুতেন পার্টির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক পি সুন্দরাইয়া ও অন্যান্য পলিট ব্যুরো সদস্যরা৷ বাইরে বারান্দায় অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে শুতেন নিরুপম সেন৷

১৯৮৫ সালেই নিরুপম সেন পার্টির রাজ্য কমিটির সদস্য হন। ১৯৯৫ সালে নিরুপম সেন সি পি আই (এম)-র রাজ্য সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন, জেলা থেকে রাজ্যে বর্ধিত দায়িত্ব নিয়ে আসেন। ১৯৯৮ সালে কলকাতায় সি পি আই (এম)-র ষোড়শ কংগ্রেসে তিনি পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন৷ ২০০৮ সালের পার্টি কংগ্রেসে তিনি সি পি আই (এম)-র পলিট ব্যুরোর সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে নিরুপম সেন ফের বর্ধমান (দক্ষিণ) বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন। এবার বামফ্রন্ট সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। ২০০৬ সালেও তিনি ঐ কেন্দ্র থেকেই পুনর্নির্বাচিত হন। এবারও তিনি শিল্প ও বাণিজ্য দপ্তরের মন্ত্রী হন। পরবর্তীকালে তিনি এরসঙ্গে বিদ্যুৎমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছিলেন৷ ২০১৮ শেষে এসে বুদ্ধ-নিরুপমের জুটি ভেঙে গিয়েছে৷