স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ীরা কুকর্মের সময় জড়িয়ে রাখেন নেতাদের

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: ব্যবসায়ীদের সঙ্গে রাজনীতির যোগ নতুন নয়৷ অনেক কিছু প্রমাণ সাপেক্ষ হলেও নানা সময় নানা রকম কেলেঙ্কারি ঘিরে অভিযোগ উঠতে দেখা যেত৷ রাজনীতি এবং শিল্পমহল উভয়ই প্রভাবশালী হওয়ায় তা প্রমাণ করা অবশ্যই শক্ত ৷ ফলে কিছু প্রমাণ হলেও অনেক কিছুই প্রমাণের অভাবে ছাড় পেয়ে যায়৷ তাছাড়া প্রমাণ হলেও যে শাস্তি হবে এমনটা আশা করা যায় না৷ প্রভাবশালীদের লম্বা হাত থাকায় নানা অছিলায় পার পেয়ে যান- কখন অসুস্থতার দোহাই দিয়ে আবার কখনও বা একেবারে দেশ থেকে পালিয়ে শাস্তি এড়ান৷

ব্যবসায়ী শিল্পমহলের কোনও বিশেষ রাজনৈতিক দল বা নেতারাই একমাত্র বন্ধু এমনটাও ভাবা অনুচিত ৷ সময়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব বদল ব্যবসায়ী-শিল্পমহলের কাছে একেবারে স্বাভাবিক ঘটনা৷ ফলে রাজনৈতিক পালা বদলের ফলে শিল্পমহলের বন্ধুও পরিবর্তনশীল ৷ ভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নেতাদের সঙ্গে সখ্যতা স্থাপন একেবারে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যেই৷ আর ভোটের সময় অর্থ দিয়ে সাহায্য করার বিনিময়ে রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে ভবিষ্যতে সুবিধা পাওয়ার অলিখিত চুক্তি তো থাকেই যা একে বারে ‘ওপেন সিক্রেট’ বলা চলে৷

সম্প্রতি নীবর মোদী ও পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের আর্থিক কেলেঙ্কারি নিয়ে দেশজুড়ে হই চই পড়ে গিয়েছে৷ পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের ১১,৪০০ কোটি টাকার প্রতারণার জড়িয়ে গিয়েছে নীরব মোদী ও তার আত্মীয় তথা ব্যবসায়িক অংশীদার মেহুল চোক্সিসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্যদের নাম৷ প্রতারক নীরব মোদীর দেশ ছাড়ার ব্যাপারে বর্তমান নরেন্দ্র মোদী সরকারের দিকে রাহুল গান্ধী আঙুল তুললেও, এই আর্থিক কেলেঙ্কারির বিষয়ে তাঁরাও একেবারে ধোয়া তুলসীপাতা নয় ৷ কারণ কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের আমলেই এই ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছিল বলে দাবি করেছেন এলাহাবাদ ব্যাংকের প্রাক্তন ডিরেক্টর দীনেশ দুবে৷

- Advertisement -

যা দেখে মনে হতে পারে কাকে ছেড়ে কাকে ধরবেন৷ আসলে যে যখনই ক্ষমতায় আসবে শিল্পমহল কুকীর্তি করে তা থেকে রক্ষা পেতে জড়িয়ে দেবেন দলমত নির্বিশেষে রাজনৈতিক দলগুলিকে৷ কারণ আর কিছু নয় রাজনৈতিক পালাবদল হলেও যাতে কোনও কিছু যায় আসে না৷ এই অষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা সম্পর্কের জেরে ব্যবসায়ীরা বেকায়দায় পড়লে এক প্রকার ব্ল্যাকমেলিং করে বাঁচার চেষ্টা করবে অথবা নেতাদের প্রভাবে ‘সেফ এক্সিট’ এর ব্যবস্থা করে দেশ ছেড়ে পালাবেন৷

এই নীরব মোদীর দেশ ছেড়ে পালানো নিয়ে যখনই বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের দিকে আঙুল উঠেছে তখন তা ঝেড়ে ফেলতে গিয়ে উল্টে কেমন যেন জড়িয়ে পড়ছে দিল্লির বর্তমান শাসক দল৷ গত মাসে ডাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম-এ ভারতীয় শিল্পপতিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদীর ছবিটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যেতে বেশি সময় নেয়নি ৷ জানুয়ারির শেষ দিকে তোলা ওই ছবিতে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে একেবারে মাঝখানে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে এবং পিছনের সারিতে অন্যান্য শিল্পপতিদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে রয়েছেন নীরব মোদী৷

এটাই নাকি শেষ নয়, এরপর আবার প্রতিপক্ষের ঝুলি থেকে বেরিয়েছে ২০১৫ সালের একটি ভিডিও। প্রধানমন্ত্রী নিবাসেই সোনা জমা প্রকল্প ঘোষণা করেছিলেন নরেন্দ্র মোদী। তখন সেখানে যেমন অরুণ জেটলি, নির্মলা সীতারামন, জয়ন্ত সিন্‌হা মতো কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা ছিলেন তেমনই ছিলেন মেহুল চোক্সি৷ আর একঘর লোকেদের সামনে ওই প্রকল্পের সাফল্য কামনা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন ‘আমাদের মেহুলভাই এখানে বসে রয়েছেন’ বলে৷

এদিকে দীনেশ দুবের বক্তব্য, নীবর মোদীর আত্মীয় মেহুল চোক্সির গীতাঞ্জলি জেমসকে আর ঋণ না-দেওয়ার আর্জি জানিয়েছিলেন৷ তিনি এই মর্মে ২০১৩ সালে অর্থ সচিবকে চিঠি দেন। পাশাপাশি সে কথা জানান রিজার্ভ ব্যাংকের কাছেও। তাঁর যুক্তি ছিল গীতাঞ্জলি জেমস যেন আগে নেওয়া ১৫০০ কোটি টাকার ঋণ পরিশোধ করে তারপরে ফের ঋণ দেওয়া হবে৷ উল্টে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে ঋণ অনুমোদন করার জন্য চাপ দেওয়া হয়৷ এই নিয়ে মতবিরোধের জেরেই তিনি বাধ্য হন ওই পদ থেকে ইস্তফা দিতে৷ শুধু তাই নয় বিজেপি পাল্টা অভিযোগ তুলেছে, ২০১৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লির এক হোটেলে রাহুল গান্ধী নীবর মোদীর জুয়েলারি প্রদর্শনীতে গিয়েছিলেন এবং ঠিক তার পরের দিন ব্যাংকের ডিরেক্টর দীনেশ দুবের বিরোধিতা সত্ত্বেও এলাহাবাদ ব্যাংক ওই ঋণ অনুমোদন করেছিল৷ অর্থাৎ এই দুর্নীতি কংগ্রেসের আমলের বলে অভিযোগ তোলেন৷

ব্যবসায়ীদের সব দলের সঙ্গে এহেন সক্ষতা নিয়ে কেউ কেউ কটাক্ষ করেন৷ কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলিও তো সময় মতো জোটসঙ্গী বদল করে – সেখানে নীতি কোথায় থাকে? ফলে নীতিহীন সখ্যতার শিক্ষা কে কার থেকে পাচ্ছে তা বলা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে ৷ বেশিদিন পিছন ফিরে দেখতে হবে না দেশ ছেড়ে পালান ৯০০০কোটি টাকার ঋণ খেলাপি বিজয় মালিয়ার অবস্থাটাই একবার দেখে নিলে, খুব ভাল একটা উদাহরণ মিলবে ৷ বিজয় মালিয়া ২০০২ সালে কর্ণাটক থেকে নির্দল হিসেবে রাজ্যসভার সদস্য হন কংগ্রেস এবং জনতা দল (সেকুলার) -এর সমর্থনে৷ এদিকে ২০১০ সালে তিনি দ্বিতীয়বার যখন রাজ্যসভায় যান তখন বিজেপি এবং জনতা দল (সেকুলার)এর সমর্থন নিয়েছিলেন৷

বিশেষ রাজনৈতিক দল বা নেতার প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে শিল্পমহল চিরকালই তাদের ব্যবসার কাজে লাগিয়েছেন৷ শুধু স্বাধীন ভারত বলে নয়, পরাধীন ভারতেও একই রকম ভাবে সত্য ৷ যা অবশ্যই প্রমাণ সাপেক্ষ তবে কথিত আছে বিড়লাদের আর্থিক বাড়বাড়ন্তের পিছনে মহাত্মা গান্ধীর একটা পরোক্ষ ভূমিকা ছিল৷ গান্ধীজির অনশন শুরু করলে তার একটা প্রভাব পড়ত শেয়ারবাজারে৷ আর বিড়লারা গান্ধীর ঘনিষ্ঠ হওয়ায় কখন গান্ধী অনশন শুরু করবেন এবং কখন তা ভাঙবেন সেই তথ্য অন্যদের তুলনায় বিড়লাদের কাছে আগে আসত ৷ সেই তথ্য কাজে লাগিয়ে শেয়ার বাজার থেকে মুনাফা করাটা তেমন কিছু কঠিন কাজ নয়৷

স্বাধীনতার পরে পঞ্চাশের দশকে প্রথম আর্থিক কেলেঙ্কারি হয়েছিল শেয়ারবাজারে৷ তখন তা নজরে আসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নেহরুর জামাই তথা রায়বেরিলির সাংসদ ফিরোজ গান্ধীর৷ তিনি লক্ষ্য করেন একটি ব্যাংক এবং একটি বিমা সংস্থার চেয়ারম্যান হওয়ার সুবাদে রামকৃষ্ণ ডালমিয়া কেমন করে ওই সব সংস্থার তহবিলকে কাজে লাগান বেনেট অ্যান্ড কোলম্যান অধিগ্রহণে এবং বেআইনি পথে কোম্পানির অর্থ তাঁর ব্যক্তিগত কাজে লাগান হচ্ছে৷ পাশাপাশি কলকাতা স্টক এক্সচেঞ্জের ফাটকাবাজ হরিদাস মুন্দ্রা কেমন ভাবে জীবন বিমা নিগমে তার প্রভাব খাটাচ্ছেন৷ এই বিষয়গুলি তুলে সংসদে সোচ্চার হন ফিরোজ গান্ধী৷ তাঁর তোলা আওয়াজে রীতিমতোই বেকায়দায় পড়েছিলেন তাঁর শ্বশুর নেহরুর মন্ত্রিসভা ৷ এই সব ঘটনার জেরে প্রথমে ডালমিয়ার দু’বছরের জেল হয়৷ পরে হরিদাস মুন্দ্রাকে পুলিশ গ্রেফতার করে৷ শুধু তাই নয় সংসদ উত্তাল হলে নেহরু সরকারে মুখ বাঁচাতে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী টিটি কৃষ্ণমাচারি বাধ্য হন পদত্যাগ করতে৷

পড়ুন: নেহরুর আমলেই আর্থিক কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন জামাই ফিরোজ

এই ঘটনার পরে বহু বছর পরে ৯০ দশকে শেয়ার কেলেঙ্কারির পর হর্ষদ মেহতা যখন বেকায়দায় পড়েন তখন তিনি মারাত্মক এক অভিযোগ এনেছিলেন খোদ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তথা কংগ্রেস সভাপতি নরসীমা রাওয়ের বিরুদ্ধে ৷ তিনি দাবি করেছিলেন, একটি সুটকেসে করে এক কোটি টাকার ঘুষ দিয়েছিলেন কংগ্রেস সভাপতিকে৷ সেটা সত্যি না ফাঁকা আওয়াজ বলা শক্ত ৷ তবে বেকায়দায় পড়লে যে খড়কুটো আঁকড়ে ধরে বাঁচতে এই ব্যবসায়ীরা যে এই ধরনে ব্ল্যাক মেলিং এর রাস্তায় নামেন তা নতুন কিছু নয়৷

তবে স্বাধীনতার পর কংগ্রেসের পাশাপাশি আস্তে আস্তে অন্যান্য দলেরও উত্থান হতে থাকে৷ বিশেষ করে কালের স্রোতে বিভিন্ন রাজ্যে বেশ কিছু আঞ্চলিক দলের উত্থান হতে দেখা গিয়েছে ৷ বর্তমানে কংগ্রেস ও বিজেপির মতো জাতীয় দুটি বৃহৎ দলের পাশাপাশি এই আঞ্চলিক দলগুলির ক্ষমতা দেখে ব্যবসায়ী শিল্পমহল সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাদের প্রতিও বেশ কিছু বছর যাবৎ আনুগত্য দেখাচ্ছে ৷ কখনও নিজের বাণিজ্য বিস্তারের জন্য ক্ষমতাশীল দলের শরণাপন্ন হচ্ছে আবার কখনও বা প্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পগোষ্ঠী প্রকল্প বানচাল করতে বিরোধী দলকে উস্কানি দিয়ে কাজে লাগাচ্ছে ৷ এই স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ীদের জন্য ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির মতোই দেশে বারবার আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটছে৷ যার পিছনে থাকা রাজনৈতিক দল এবং শিল্পগোষ্ঠীর আঁতাত বারে বারেই ফুটে উঠছে ৷ আর যখন সেই কেলেঙ্কারি জানাজানি হচ্ছে অস্বস্তি বাড়ছে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল ও তার নেতাদের ৷ আবার প্রভাব ঘাটিয়ে সেই কলঙ্ক থেকে মুক্তিও মিলেছে ৷

Advertisement ---
---
-----