মানবজীবন সঙ্কটে ফেলে সুন্দরবনের জলে মিশছে ক্যাডমিয়াম

সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুন্দরবন : সুন্দরবন জলরাশি দেখে ভ্রমণপিপাসুদের মন ভরে ওঠে। কিন্তু এই জল খেয়েই যাদের অহরাত্রের পিপাসা মেটে সেই সুন্দরবনবাসির স্বাস্থ্যের অবস্থা প্রত্যেক দিন খারাপের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। কারণ সেখানকার জলদূষণ। তবে জলদূষণের কারণ আরসেনিক নয়। নতুন ভয়ের কারণ ক্যাডমিয়াম।

শহরের রাস্তায় বসা বাজারে সিসার প্রভাব দেখে চক্ষু চরক গাছ হয়েছে শহরবাসীর। ভেবেছেন শহর থেকে যারা দূরে সবুজ, নদীর ছায়ে যারা বসবাস করছেন তারাই বোধহয় খুব ভালো রয়েছেন। কিন্তু আদতে দেখা যাচ্ছে চিত্রটা সম্পূর্ণ অন্যরকম। কলকারখানা ধোঁয়া ধোঁয়াশা থেকে যারা দূরে থাকা সুন্দরবনের মানুষ আদতে মোটেই ভালো নেই। তাঁরা ভুগছেন জল সমস্যায়। জলে মারাত্মকভাবে বাড়ছে গিয়েছে ক্যাডমিয়ামের মাত্রা। আর এই সমস্যা সম্বন্ধে এখনও কিছুই জানে না ওই অঞ্চলের অধিবাসীরা। প্রত্যেক দিন একটু একটু করে চরম খারাপ ভবিষ্যতের দিকেই এগিয়ে চলেছে সুন্দরবনের জনজীবন।

ডাঃ শিবাজী ভট্টাচার্যের ‘MONITORING OF XENOBIOTICS IN FLORA, FAUNA AND HUMAN AND THEIR RELATIONSHIP AT SUNDARBAN DELTA’-র ফলাফল সেরকম কিছুই বলছে। ক্যাডমিয়াম মাত্রাতিরিক্ত শরীরে বেশি হলেই ক্যান্সারের সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে এটি যে কতটা মারাত্মক তা পরিস্কার। সবথেকে বেশি সমস্যা হল এই ক্যাডমিয়াম জলে মিশে যায়। আর এটাও ঘটনা ক্যাডমিয়াম ছাড়া মানবজীবন অচল, কারণ বাড়ির চকচকে রঙ থেকে কম্পিউটার সবটাই ক্যাডমিয়াম থেকেই মেলে। এগুলোই নদীর জলে মিশে বাড়াচ্ছে বিপদ।

- Advertisement -

শিবাজিবাবু তাঁর পরীক্ষাটি চালিয়েছেন পাঁচটি অঞ্চলের উপর ভিত্তি করে। এইসব অঞ্চলগুলি হল কুলটি, মালঞ্চ, কানমারি, ধামাখালি, ধুতুরাদহ। তিনি জানিয়েছেন, “ যেহেতু এই সব অঞ্চলের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে বিদ্যাধরী সেহেতু এই অঞ্চলের উপরেই পরীক্ষা চালিয়েছি। পরীক্ষার ফলাফলে দেখছি জলের খুব কাছাকাছি অঞ্চলেই সমস্যা বেশি। একটু দূরে গেলেই তুলনামূলক কমছে সমস্যা।” তিনি এও জানিয়েছেন, “যেহেতু বিদ্যাধরীতেই মিলেছে শহরের দূষণযুক্ত জল এবং রায়মঙ্গলে মিশে তা যেহেতু সুন্দরবনের মানুষের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে তাই ওইসব অঞ্চলের উপরেই পরীক্ষাটি চালানো হয়েছে।”

এই অঞ্চলগুলিকে পাঁচটি কোডে ভাগ করেছেন তিনি। ক্রমানুসারে S1,S2,S3,S4 এবং s5 এইভাবে ভাগ করেছেন ওই পাঁচ অঞ্চলকে। এর মধ্যে S1,S2,S3,S4 অঞ্চল বিদ্যাধরীর একদম পারেই অবস্থিত অর্থাৎ জলের একদমই কাছে। প্রায় সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত s5 (ধুতুরাদহ)।

এবার S1,S2,S3,S4 অঞ্চলে জলে আরসেনিকের চেয়ে অনেকটাই বেশি ক্যাডমিয়াম। নদীর জলে ক্যাডমিয়ামের পরিমাণ ০.১১৬, এক্ষেত্রে সীমারেখা ২.০০০। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে আরসেনিকের থেকে পরিমাণ বেশি। পুকুরের জলের ক্ষেত্রে ক্যাডমিয়ামের পরিমাণ ০.১৪০। এক্ষেত্রে সীমারেখা ২.০০০। এটিও আরসেনিক লেভেলের থেকে পরিমাণ বেশি। টিউবওয়েলের ক্যাডমিয়ামের পরিমাণ ০.১০৭ যেখানে থাকা উচিত ০.০০২। এক্ষেত্রে সীমারেখাও অনেকটা উপরে আরসেনিকের থেকেও পরিমাণ বেশি। সেখানে S5 অঞ্চলে পুকুরের জলে ক্যাডমিয়ামের পরিমাণ ০.০৬২ যা বিপদমাত্রার থেকে অনেকটাই নিচে।

তবে এখানে আবার টিউবওয়েলের জলে রয়েছে মাত্রা ছাড়ানো ক্যাডমিয়াম। এখানকার টিউবওয়েলের জলে ক্যাডমিয়ামের পরিমাণ ০.০৪৯।

অর্থাৎ নদী থেকে দূরে গিয়েও ক্যাডমিয়াম দূষণ থেকে মুক্তি মিলছে না। কোনও না কোনোওভাবে বেড়ে চলেছে ক্যাডমিয়ামের মাত্রা। সামনে রয়েছে খোলা পরিসংখ্যান। এরপরেও কেউ যদি সচেতন না হন তাহলে অদূরেই দাঁড়িয়ে ভয়ঙ্কর ভবিষ্যৎ।

Advertisement ---
-----