সন্ত্রাসবাদী ও চীনাদের হাত থেকে ‘ইসলামি বোমা’কে বাঁচাতে পারবেন ইমরান?

নিখিলেশ রায়চৌধুরী: পাকিস্তানে এখন এক অদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতি৷ ইমরান খান এখনও তাঁর প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখাতে পারেননি৷ তখতে চড়ার জন্য যে আসন সংখ্যা প্রয়োজন সেটা তাঁর নেই৷ যদিও জিতেই তিনি বলেছেন, ক্ষমতায় বসলে তাঁর প্রথম কাজ হবে ইরান ও চীনের সঙ্গে আরও ভালো করে সম্পর্ক গঠন৷

পাকিস্তানের উপর জি জিনপিংয়ের চীনের প্রভাব যতই বাড়ুক না কেন, এখনও সেদেশের ক্ষমতায় ওঠাচ্ছে-বসাচ্ছে আমেরিকার গুপ্তচর সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ)৷ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন ভারতের সঙ্গে দ্রুত সামরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার পক্ষপাতী৷ তাই, দেশের মানুষের কাছে নিজের ডেয়ারডেভিল ভাবমূর্তি তুলে ধরার জন্যই বোধহয় ইমরান খান এখন ইরান ও চীনের সঙ্গে তাঁর দেশের সম্পর্ক মজবুত করার উপর এত জোর দিচ্ছেন৷

আইএস ঠেকাতে ইমরানের উপর ভরসা রেখেই এগতে চাইছে সিআইএ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এখন অন্যতম টার্গেট ইরান৷ ইরানের পরমাণু কর্মসূচি আমেরিকার প্রশাসনের পছন্দ হচ্ছে না৷ বহু আগে থেকেই ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বানচাল করার জন্য ইজরায়েলের সঙ্গে মিলে আমেরিকার প্রশাসন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে৷ কিন্তু সেই কর্মসূচি ভণ্ডুল করতে গিয়ে তারা এমন এক বিপদ ডেকে এনেছে যার প্রতিক্রিয়া হিসাবে গোটা বিশ্বজুড়ে নচ্ছার হ্যাকারদের তাণ্ডব এখন এক মারাত্মক আকার নিয়েছে৷

- Advertisement -

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে মূলত মাথাব্যথা ইজরায়েলের৷ তার কারণ, ইরান মুখে যতই অসামরিক পরমাণু কর্মসূচির কথা বলুক না কেন, তাদের পরমাণু কেন্দ্রের পরীক্ষানিরীক্ষার সুবিধা কট্টর শিয়াপন্থী সন্ত্রাসবাদী শক্তি হেজবোল্লার হাতে পড়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে৷ ভারতের সঙ্গে ইরানের কোনও বিরোধ নেই৷ কিন্তু ইরানকে নিয়ে মাথাব্যথা রয়েছে পশ্চিম এশিয়ার৷ সেইসঙ্গে আমেরিকান প্রশাসনেরও৷

সিরিয়ায় এখন হেজবোল্লার প্রবল দাপট৷ ইসলামিক স্টেটকে (আইএস) রুখতে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশর আল-আসাদ সেদেশে হেজবোল্লার ঘাতক বাহিনীকে জায়গা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন৷ এখন তারা সিরিয়ার অনেক জায়গাতেই মুক্তাঞ্চল গঠন করে নিজস্ব শরিয়তি আইন চাপিয়ে দাপটে রাজত্ব করছে৷ বলা বাহুল্য, তাদের সহায়তা জোগাচ্ছে ইরানের গোঁড়া ক্ষমতাসীন শক্তি৷

পাকিস্তান বরাবরই পশ্চিমী শক্তির স্যাটেলাইট৷ এক সময় তারা ব্রিটিশ রাজশক্তির মগজের ভরসায় পরিচালিত হত৷ ঠাণ্ডা যুদ্ধ প্রবল হয়ে ওঠার সময় থেকে তারা আমেরিকান প্রশাসনের তাঁবেদার৷ তবে, আমেরিকার প্রশাসনের বেশিরভাগ কর্তা কখনই ইসলামাবাদ, বিশেষত সেদেশের সামরিক শক্তিকে পুরোপুরি বিশ্বাস করেনি৷ তার কারণ, পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিশ্বের দুষ্টগ্রহগুলির বরাবরই মধুর সম্পর্ক ছিল৷ বেজিংয়ের তো বটেই৷

বেজিংয়ের পরোক্ষ মদত না থাকলে পাকিস্তানের পক্ষে কখনই পরমাণু বোমা বানানো সম্ভব হত না৷ পাকিস্তানের পরমাণু বিশেষজ্ঞ আবদুল কাদির খান ভারতের মিসাইলম্যান এপিজে আবদুল কালামের মতো প্রতিভাধর বিজ্ঞানী ছিলেন না৷ তিনি খুব ভালো করে চুরিবিদ্যাটি শিখেছিলেন৷ যে কারণে, উত্তর কোরিয়া থেকে শুরু করে সব কটি সন্ত্রাসবাদী দেশের সঙ্গে তাঁর মাখামাখি ছিল৷ পরমাণু রিয়্যাক্টরের নকশা চুরি করে তিনি এ ধরনের বিভিন্ন দেশকে তা বিলিয়েছিলেন৷ আবার তাদের কাছ থেকে পাকিস্তানি পরমাণু বোমা বানানোর প্রয়োজনে ইউরেনিয়াম প্রভৃতি উপাদান নিয়েছিলেন৷ আমেরিকার প্রশাসন কিন্তু তখন আবদুল কাদির খানকে পূর্ণ সহায়তা জুগিয়েছিল৷

তার কারণ, সত্তরের দশকে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন ভারতের পরমাণু বোমা নির্মাণ কর্মসূচির তারা প্রবল বিরোধী ছিল৷ যেহেতু তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল ভারত-বন্ধু তাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার তাঁদের তাঁবেদার রাষ্ট্র পাকিস্তানকে পরমাণু শক্তি হিসাবে দাঁড় করাতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন৷ মাও সে-তুংয়ের চীন তাতে খুশি হয়েছিল৷

এখন সেই ইসলামি পরমাণু বোমাই পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ তথা সাধারণ নির্বাচনের পক্ষপাতী রাজনৈতিক শক্তির কাছে এক আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছে৷ কারণ, আমেরিকার প্রতিরক্ষা দফতর পাকিস্তানি পরমাণু কেন্দ্রের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকলেও পরমাণু বোমাগুলি সন্ত্রাসবাদীদের হাতে পড়ার আশঙ্কা সেদেশে দস্তুরমতো রয়েছে৷ পাকিস্তানের সামরিক গুপ্তচর সংস্থা ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই) এখনও সন্ত্রাসবাদের আঁতুড়ঘর৷ আমেরিকার প্রশাসন সে কথা জানা সত্ত্বেও পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র বলে ঘোষণা করছে না৷ ভারতকে নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপে (এনএসজি) ঢুকতে চীন লাগাতার বাধা দেওয়া সত্ত্বেও সে ব্যাপারে রাষ্ট্রসংঘে কোনও কড়া পদক্ষেপ নিতেও তারা রাজি হচ্ছে না৷
ভারত পৃথিবীর বৃহত্তম গণতা্ন্ত্রিক দেশ৷ এদেশে এমনিতেই বহু চীনা এবং পাকিস্তানপন্থী পঞ্চম বাহিনী নানা ছলাকলায় সাধারণ নাগরিকদের শান্তি-সুরক্ষায় ফাটল ধরাতে তৎপর৷ বিশেষ করে, চীনের ‘অসাধারণ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি’তে এদেশে আপ্লুত হওয়ার মতো লোকের এখন অভাব নেই৷ যদিও তাঁরা অনেকেই জানেন না, হান সাম্রাজ্যবাদী মতবাদে বিশ্বাসী মাও-অনুসারী চীন কোনও দিনই ভারতের বন্ধু হতে চায় না৷ আজও তারা মনে করে এশিয়ায় শেষ কথা স্রেফ তারাই বলবে৷ বাদবাকি দেশগুলি কার্যত তাদের করদ রাজ্য হিসাবে পদানত থাকবে৷

ভারতে এই মুহূর্তে যাঁরা চীনপ্রেমী তাঁরা একবার গোটা চীন ঘোরার ভিসা এনে দেখান দেখি যে, জি জিনপিংয়ের চীনদেশ ঠিক কতখানি লিবারেল! অবশ্যই চীনের নেতৃত্ব তাঁদের ‘ভালোমতো’ দেখেন এবং পোষেন৷ তাই এঁরা হয়তো দাবি করবেন যে, চীনে এখন ক্ষীরের নদী বইছে৷ মাও সে-তুংয়ের আমলেও ভারতে এ রকম হরেকরকম্বা টেবিল চাপড়ে অনেককেই কপচাতে শোনা যেত৷

পাকিস্তানের মসনদে চড়লে এহেন চীনের সঙ্গেই বেশি সখ্যতার পক্ষপাতী বালতিস্তানি ইমরান খান৷ যদিও অধিকৃত কাশ্মীরের বালতিস্তানে তাঁর নিজস্ব গোষ্ঠী বা ক্ল্যানের লোকেরা তাঁকে কতখানি পছন্দ করেন, সে কথা বলতে পারব না৷

Advertisement
---