‘ইউজিসির পরিবর্তে এইচইসিআই এনে উচ্চ শিক্ষায় সরকারি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা কেন্দ্রের’

দিপালী সেন, কলকাতা: বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) প্রত্যাহার করে হায়ার এডুকেশন কমিশন অফ ইন্ডিয়া (এইচইসিআই) গঠনের পরিকল্পনা আসলে উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ আনার প্রচেষ্টা৷ এমনই মত কলকাতার শিক্ষাবিদদের৷ তাঁদের মতে, ইউজিসি রদ করে এইচইসিআই গঠন করা হলে তা উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থার স্বাধিকার হরণ করবে৷

গত জুন মাসেই উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক রদবদলের পরিকল্পনা প্রকাশ্যে এনেছে কেন্দ্রীয় সরকার৷ তা হল ইউজিসি প্রত্যাহার করে উচ্চ শিক্ষা কমিশন গঠন৷ গত ২৭ জুন এই নতুন আইনের খসড়া প্রস্তাব করে অংশীদারদের কাছ থেকে পরামর্শ চেয়েছিল কেন্দ্র৷ খসড়া আইনে সব নিয়ামক সংস্থাগুলিকে এক ছাদের তলায় আনার প্রস্তাব রয়েছে৷ ১৯৫৬ সালের ইউজিসি আইনের পরিবর্তেই ‘হায়ার এডুকেশন কমিশন অফ ইন্ডিয়া অ্যাক্ট, ২০১৮’ নামে এই নতুন আইনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে৷

উচ্চ শিক্ষায় একটি চলতি স্বশাসিত নিয়ামক ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ কী কারণে নতুন উচ্চ শিক্ষা কমিশনের প্রয়োজন কেন? এর মাধ্যমে কি তাহলে কেন্দ্রীয় সরকার উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইছে? এই ধরনের একাধিক প্রশ্ন উঠে এসেছে সংশ্লিষ্ট মহলে৷ শুধু প্রশ্ন নয়৷ উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থাকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনতেই এই নতুন কমিশনের প্রস্তাব করা হয়েছে বলেই মত একাধিক শিক্ষাবিদের৷

এ বিষয়ে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অমল মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ডঃ সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছিল৷ অমলবাবুর মতে, মঞ্জুরি কমিশন এখনও অত্যন্ত ভালোভাবে কাজ করছে৷ দেশের সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ অর্থাৎ, উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির তদারকি করেছে, অনুদান দিয়েছে৷ সেই কার্যকরী কমিশনকে পরিবর্তন করে উচ্চ শিক্ষা কমিশন করা সম্পূর্ণ নিরর্থক বলেই মনে করছেন প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ অমল মুখোপাধ্যায়৷

অমল মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন একটি স্বশাসিত সংস্থা এবং সেটাই ন্যায্য৷ কারণ, যারা শিক্ষার তদারকি করবেন তাদের সরকারি নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হওয়া দরকার৷ এখন উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থার তদারকির জন্য সরকার নিয়ন্ত্রিত একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে চাইছে কেন্দ্রীয় সরকার৷ আমি মনে করি এটা গুরুতর অন্যায়৷’’ এ ছাড়া, বর্তমান সরকারকে বিদায়ী সরকার বলে আখ্যাও দিয়েছেন তিনি৷ তাঁর মতে, ‘‘বর্তমান সরকার কার্যত বিদায়ী সরকার৷ আর কয়েক মাস পরেই বিদায় নেবে এই সরকার৷ তাই শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন করার কোনও অধিকার এই সরকারের নেই বলেই আমি মনে করি৷’’

সরাসরি সরকারি নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি না তুললেও ইউজিসির পরিবর্তে কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চ শিক্ষা কমিশন আনার প্রচেষ্টা নিয়ে বেশ কতগুলি প্রশ্ন তুলেছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকারও৷ তাঁর প্রথম প্রশ্ন, ‘‘ইউজিসির অসুবিধাটা কী হচ্ছে?’’ তাঁর মতে, ‘‘ইউজিসিকে ঘিরে কিছু ছোটখাটো সমস্যা ছিল৷ সেটা আমি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকাকালীন অনুভব করেছিলাম৷ কিন্তু, তা সত্ত্বেও ইউজিসির একটা নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছিল৷ সেটা তো বেশ ভালোভাবেই চলছিল৷ এই ব্যবস্থা তো কোথাও মুখ থুবড়ে পড়েনি বা বড় কোনও গণ্ডগোল দেখা যায়নি৷ ফলে, সেটা তুলে দিয়ে উচ্চ শিক্ষা কমিশন তৈরির পরিকল্পনার পিছনে কী কারণ রয়েছে সেটা আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়৷’’

পবিত্র সরকার আরও বলেন, ‘‘বর্তমানে যে ব্যবস্থা চালু রয়েছে, সেই ব্যবস্থা তুলে দিয়ে যে নতুন ব্যবস্থা আনা হবে, তার সুযোগ সুবিধা কী হবে তা নিয়ে সরকার এখনও আমাদের সামনে কোনও পরিষ্কার ধারণা তুলে ধরেনি৷ উচ্চ শিক্ষা কমিশন তৈরি হলেই যে তা ইউজিসির তুলনায় কাজকর্মে অসাধারণ উন্নতি দেখাবে তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়৷ তাই আমরা বুঝতে পারছি না ইউজিসি তুলে দিয়ে উচ্চ শিক্ষা কমিশন গড়লে কী লাভ হবে৷’’

স্পষ্ট ধারণা না থাকায় কতগুলি প্রশ্ন তোলেন পবিত্রবাবু৷ যার মধ্যে সব থেকে বড় করে উঠে আসে উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থায় সরকারি নিয়ন্ত্রণের প্রসঙ্গ৷ তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘‘এটা কি উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারি কৌশল?’’ তিনি জানিয়েছেন, উচ্চ শিক্ষা কমিশন এলেই উচ্চ শিক্ষায় যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে সেই ধরনের কোনও আশা তাঁদের নেই৷ বরং, আশঙ্কা রয়েছে, প্রশ্ন রয়েছে৷

সরকারি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সহমত প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও অল বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশনের (আবুটা) সভাপতি তরুণকান্তি নস্করও৷ তাঁর বক্তব্য, ‘‘ইউজিসি অবলুপ্ত করে হায়ার এডুকেশন কমিশন অফ ইন্ডিয়া গঠন করার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সমেত সমগ্র উচ্চ শিক্ষাকে আরও বেশি সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন করতে চাইছে৷’’

বর্তমানে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে প্রয়োজন অনুসারে বিবেচনা করে অনুদান দিয়ে থাকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন৷ কিন্তু, নতুন খসড়া আইনটি পাশ হয়ে গেলে এই মঞ্জুরির ক্ষমতা উচ্চ শিক্ষা কমিশনকে দেওয়া হবে না৷ মঞ্জুরির দায়িত্ব চলে যাবে মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের হাতে৷ আর সেটা ঘটলে শিক্ষার স্বাধিকারে হস্তক্ষেপ পড়বে বলেই মনে করছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদগণ৷

পবিত্র সরকার এ বিষয়ে বলেন, ‘‘ইউজিসি একটি স্বশাসিত সংস্থা৷ তার ক্ষমতা এভাবে কেড়ে নেওয়া এভাবে উচিত নয়৷ ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশে মঞ্জুরির ক্ষমতা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টা একেবারেই উচিত নয়৷’’ অমল মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘মঞ্জুরির ক্ষমতা সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে সরকার তাদের অনুগত যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেগুলিকে বেশি অনুদান দেবে ও অন্য প্রতিষ্ঠানগুলিকে কম অনুদান দেবে৷ তাই এই ক্ষমতা সরকারের হাতে গেলে শিক্ষার সর্বনাশ হয়ে যাবে৷ শিক্ষার স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করাটা খুব জরুরি৷’’

এ বিষয়ে আবুটার তরফে তরুণকান্তি নস্কর বলেন, ‘‘নতুন আইনের দ্বারা যে কমিশন গঠিত হতে চলেছে তার উপর শিক্ষা ও গবেষণার মান যাচাই করা, নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেওয়া এবং সর্বোপরি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়ার অবাধ অধিকার দেওয়া হচ্ছে৷ কিন্তু, বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে আর্থিক অনুদান প্রদানের কোনও অধিকার এই আইনে থাকছে না৷ ফলে এই আইন শুধু শিক্ষার স্বাধিকার হরণ করবে তা নয়, শিক্ষা সংকোচনও করবে৷’’

এখন অনুদান দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন আঞ্চলিক কমিটি তৈরি করে৷ এই কমিটিতে থাকেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদগণ৷ তাঁরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি পরিদর্শনে গিয়ে সরজমিনে তদারকির পরই সিদ্ধান্ত নেন কোন প্রতিষ্ঠানকে কত অনুদান দেওয়া হবে৷

----
-----