সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় : যৌনকর্মীর ঘরের মাটি ছাড়া চিন্ময়ী হয় না মৃন্ময়ী দুর্গা। তারাই আবার অচ্ছুতের দলে পড়েন। কিন্তু আজ থেকে শ’দেড়েক বছর আগে মহানগরের এক যৌনকর্মীর ঘরের দুর্গা পুজোকে নিজের ঘরে তুলেছিলেন নবদ্বীপের এক স্বর্ণব্যবসায়ী। এখনও চন্দ্র বাড়িতে মহাধুমধামে এগিয়ে চলেছে পতিতার রেখে যাওয়া সেই দুর্গা পুজো।

অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়। স্থান কলকাতার নিমতলা অঞ্চলের যৌনপল্লি। শোনা যায় সেখানে এক পতিতা মহাসমারহে দুর্গাপূজা করতেন। তবে দুর্গাপুজো ধুমধামে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে যেটা সবথেকে বেশি প্রয়োজন সেটা অর্থ। যতদিন কাজ করেছেন ততদিন অবধি নিজের রোয়াবে চালিয়ে গিয়েছেন পুজো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বয়স বাড়তেই স্বাভাবিকভাবেই রোজগার কমে যায়। আর্থিক টানাপোড়েন শুরু হয়। মায়ের পুজো এগিয়ে নিয়ে যেতে একসময় যৌবনের উপার্জন করা সমস্ত কিছু বিক্রি করতে চাইলেন নবদ্বীপের স্বর্ণব্যবসায়ী নীলমণি চন্দ্রকে। গয়না বিক্রির কারণ জানতে পেরে ব্যবসায়ী রাজি হননি। উলটে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমৃত্যু পতিতার পুজোয় সাহায্য করলেন নীলমণি। এরপরের অধ্যায়টা ইতিহাস।

পতিতা পূজার ভার দিয়ে গেলেন নীলমণি চন্দ্রকে। সেই শুরু চন্দ্র বাড়ির পুজো যা এই বছরে ১৩৭ বছরে পা দেবে। চিন্ময়ী দুর্গাকে ঘরে তুলেই নীলমণি ফিরিয়ে আনেন মায়ের পুজোর জৌলুস। পারিবারিক উৎসব সর্বজনীন হয়ে উঠত। ওই পরিবারের বর্তমান সদস্য সুশোভন চন্দ্র বলেছেন, “বড়, মেজ আর ছোট শরিকের মিলিত উদ্যোগে চন্দ্র বাড়ির পূজো ছিল এলাকার অন্যতম সেরা পূজো। ছাগবলি, আতসবাজির মহড়া, কাদাখেলা অনেক কিছুই হত নাটমন্দিরের সামনের উঠোনে। নবমীর দিন কয়েক হাজার কাঙাল ভোজন করাতেন।” আজ সেই দিন নেই। পরিবার ভাঙতে ভাঙতে ছোট হয়ে গিয়েছে।

রয়েছে শুধু পুজোর নিয়মাবলী এবং ভোগের ঐতিহ্য। রথে ঠাকুরের পাট পড়ে, আর দ্বিতীয়ার দিন দেবীপ্রতিমা সিংহাসনে তোলা হয়। সিংহ এখানে ঘোড়ার মত। ঠাকুরের সমস্ত গয়না মাটির। প্রায় দু’হাত উচ্চতার ১০ পোয়া প্রতিমা মাটির সাজের চল এখনও বর্তমান।

ব্রাহ্মণ নয়, তাই দেবীকে অন্নভোগ দেওয়া হয় না চন্দ্র পরিবারের। দেওয়া হয় চাল, ডালের নৈবেদ্য আর ওই ২৪ টি করে লুচি ও মিষ্টির ভোগ। ঠিক ২৪ টি রসগোল্লা, ২৪ টি লুচি, ২৪ টি আলুভাজা খেয়ে পূজোর চারদিন কাটিয়ে ২৪ জন বাহকের কাঁধে চেপে কৈলাসে ফিরে যান মা। কিন্তু এই ২৪-এর তত্ব এখনও অজানা। এমনই জানিয়েছেন ওই পরিবারের সদস্য সুশোভন চন্দ্র।

কলকাতায় দুর্গা পুজো করতে কোর্টের দ্বারস্থ হতে হয়েছিল সোনাগাছি যৌনকর্মীদের। তথাকথিত সভ্য সমাজের অনেক বাধা এসেছিল। অথচ শত বছর আগে পতিতার ঘরের পুজোকে ঘরে তুলেছিলেন নীলমণি চন্দ্র। এভাবেই হয়তো লেখা হয় ইতিহাস। সম্পূর্ণ হয় একটা বৃত্ত।

----
--