এখন ‘আন্তর্জাতিকতাবাদী’ আসলে মাফিয়ারা

নিখিলেশ রায়চৌধুরীঃ  আন্তর্জাতিকতাবাদ খুবই ভালো ধারণা৷ যখন কোনও রাষ্ট্রীয় সীমারেখা থাকবে না, সবাই সবার সঙ্গে মিশবে৷ থাকবে না কোনও পাসপোর্ট, যে যখন চাইবে তখনই এক দেশ থেকে আর এক দেশে চলে যাবে, ইত্যাদি, ইত্যাদি৷ কিন্তু এ রকম একটা ব্যবস্থা এখনও পর্যন্ত অন্তত কল্পনাতেই সম্ভব৷ বাস্তবে নয়৷

বাস্তবে যখন এই স্বপ্নকে রূপ দেওয়ার চেষ্টা চলে তখন দেখা যায়, সেই ছিদ্রপথে নানা রকমের কালসর্পের আনাগোনা শুরু হয়ে যায়৷ সেই ছিদ্রপথে কখনও শান্তিনিকেতন থেকে রবীন্দ্রনাথের নোবেল পদক উধাও হয়ে যায়, কখনও আবার সোনা ও মাদকের কারবারিদের উৎপাত বেড়ে যায় মারাত্মক হারে৷

এক দেশের সঙ্গে আর এক দেশের মানুষের সখ্যতা বাড়াতে কে না চায়৷ অন্তত সুস্থ মানুষের সেই ইচ্ছাটাই অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার৷ একেবারে হৃদয়হীন পাষণ্ড ছাড়া অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে পায়ে পা বাধিয়ে যুদ্ধ লাগিয়ে রক্তপাত ঘটাতে কেউই চায় না৷ সেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বাধানোর আগে যেমন হয়েছিল৷ ফরাসি সৈন্য আর জার্মান সৈন্য পরস্পরের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে৷ তার পর হঠাৎ একটা গুলি ছুটে এল৷ ধরাশায়ী হল এক পক্ষের সৈনিক৷ আর অমনি শুরু হয়ে গেল মহাযুদ্ধ৷

- Advertisement -

কিন্তু বিশ্ববোধ ও আন্তর্জাতিকতার নামে ক্ষেত্রবিশেষে আগেও যা ঘটেছে কিংবা এখনও যা চলছে সেখানে সাংস্কৃতিক ভাবনার থেকে বড় হয়ে দাঁড়ায় ধান্ধাবাজি৷ আগেও দেখা গিয়েছে যারা বিশ্ব সংস্কৃতির নামে জোট বেঁধেছিল তারা অনেকেই কোনও না কোনও দেশের হয়ে আর এক দেশে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ফেঁসেছিল৷ এখনও ঠিক একই ব্যাপার চলছে৷ বিশেষ করে, তথ্যপ্রযুক্তির উন্নতির সূত্র ধরে৷

এখনও এমন বহু লোক আছে যারা মনে করে, অমুক দেশের মতো যদি নিজের দেশের সমাজব্যবস্থাটি হত তাহলে আর কোনও দুঃখ থাকত না৷ কেউ ভাবে, গণতন্ত্রের কোনও মূল্য নেই৷ তার চাইতে কঠোর একনায়কতান্ত্রিক শাসন জরুরি৷ এইসব লোকের সেন্টিমেন্ট যদি কেউ ফাঁপিয়ে তোলে এবং তার বিনিময়ে তাদের ‘খুশি’ করে দেওয়ার বন্দোবস্ত করে, তাহলে তারা অন্য দেশের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি কিংবা অপরাধ করার জালে ফেঁসে যায়৷

সেইসঙ্গে এখন আবার ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবে উত্তর-আধুনিক চিন্তাভাবনার মতো উত্তর-উদারনৈতিক চিন্তাধারার ধুম পড়েছে৷ ফলে, কিছু তলিয়ে দেখার আগেই তরুণ প্রজন্ম হু হু করে তলিয়ে যাচ্ছে৷ মাঝে মাঝে যদিও বা ভুস করে একটু ভেসে ওঠার চেষ্টা করছে, কিন্তু পালটা আবেগের চোরাবালি তাদের বেশিক্ষণ ভেসে থাকার সুযোগ দিচ্ছে না৷ কারা তাদের নাচাচ্ছে তারা এখনও বুঝতে পারছে না৷ বুঝে ওঠার আগেই তাদের বেশ উত্তেজক টোটকা-পুরিয়া জুটে যাচ্ছে৷

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, তাঁর পুলিশ নোবেল পদক চুরির রহস্য ভেদ করতে পারবে৷ এক্ষেত্রে সিবিআইয়ের কোনও দরকার নেই৷ কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেই পদক উদ্ধার করা যায়নি৷ আদৌ তা করতে পারা যাবে কি না, তাও কেউ জানে না৷ চুরি হওয়ার পর সেই নোবেল পদক হাতফেরতা হয়ে কাদের হাতে পৌঁছেছে সেটাও জানা যায়নি৷ মুখ্যমন্ত্রীর দাবিমতো রাজ্যের পুলিশ-প্রশাসনের উপর আস্থা রাখলে চলত৷ কিন্তু এ রাজ্যেও যদি কেউ আড়াল থেকে খুঁচিয়ে এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি করে যেখানে নৈরাজ্য ঠেকাতে শেষ পর্যন্ত আধা-সামরিক কিংবা ফোর্ট উইলিয়াম থেকে সরাসরি সেনাবাহিনীকে তলব করতে হয়, তখন কি হবে?

১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর দেখেছিলাম, জ্যোতি বসু থেকে শুরু করে সিপিএমের তাবড় নেতা ঘরে ঢুকে গিয়েছিলেন৷ তাঁদের বিপ্লববাজি ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গিয়েছিল৷ পরিস্থিতি সামাল দিতে যথারীতি নামতে হয়েছিল সেনাবাহিনীকে৷ সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণেই কলকাতা সহ গোটা রাজ্যে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছিল৷

প্রচুর ‘সত্য’ সংবাদ প্রকাশের নামে এখন পোর্টালীয় গণতন্ত্রে এমন একটা অবস্থা দাঁড়িয়েছে, যেখানে শুঁড়ির সাক্ষী মাতাল আর শুঁড়িরাই আবার ঘুরিয়ে মাতালদের সাক্ষী৷ আজ এক খবর বের হচ্ছে তো ঠিক তার পরের দিনই একেবারে উলটো খবর ছড়ানো হচ্ছে৷ সূত্র কে কেউ জানে না৷

অনেকটা রাশিয়ান রুলেটের মতো৷ যে যা থেকে ফয়দা পায়! এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো৷ এই ধরনের অবস্থাটা কিন্তু সৃষ্টি করছে এক শ্রেণির মাফিয়া গোষ্ঠী৷ এবং, তাদেরই পরস্পরের মধ্যে রয়েছে একটা জবরদস্ত আন্তর্জাতিক বোঝাপড়া৷ তারা দেখছে তরুণ প্রজন্মের কার কিসে ইন্টারেস্ট৷ আর সেই সেই জায়গায় তাদের কাজে লাগিয়ে তারা নিজেদের মতলব হাসিল করছে৷

কিছু দিন আগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের মুখেই বলেছেন (মুখ ফসকে বলে ফেলেছেন কি না জানি না), এই বাংলায় সবাই থাকে৷ কেউ কারও ক্ষতি করে না৷ পাকিস্তানিরাও আছে…৷ এতে কারা খুশি হচ্ছে জানি না৷ তবে বাম আমলে খিদিরপুর এলাকায় টেনশন দেখা দিলেই নিজের চোখে পাকিস্তানের পতাকা উড়তে দেখেছি৷ সেখানে তখন কলিমুদ্দিন শামস ও তার সাঙ্গোপাঙ্গর প্রচণ্ড দাপট৷

ভারত এমন একটি দেশ যেখানে হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ সব নাগরিক মিলেমিশে থাকেন৷ সেটাই এদেশের সভ্যতা৷ আলাদা করে পাকিস্তানিদের ওসকানোর কোনও দরকার এখানে রয়েছে? যদি দরকার হয় তাহলে সেটা ঠিক কাদের়? সাধারণভাবে ভারতবাসীর তো সে রকম কোনও প্রয়োজন হয় না?

সুতরাং, ‘আমাদের প্রয়োজন সামগ্রিক শান্তি-কল্যাণ’, ‘আমাদের সকলের মিলেমিশে থাকা জরুরি’–এসব ফালতু বাকতাল্লার আড়ালে কে বা কারা চুপিসাড়ে তাদের মতলব হাসিল করছে, সেটা খুঁজে দেখা দরকার৷ তাদের ফলার ডলারে-পাউন্ডে, না ইউয়ানে, না কি দিনারে কিংবা রিয়ালে? তথাকথিত মানবতাবাদী বা আন্তর্জাতিকতাবাদীরা প্রায়ই ভুলে যান যে, এখনও সাধারণ ভারতবাসীর বিদেশে পাড়ি দেওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই৷ শাশ্বত ভারতকে যাঁরা চেনেন তাঁরাই সে কথা জানেন৷ এই অবস্থায়, বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে যে আন্তর্জাতিকতাবাদীরা তরুণ প্রজন্মকে তাতাচ্ছে তাদের আসল উদ্দেশ্যটা কী, সেটা এদেশের প্রশাসনের মাথায় যাঁরা আছেন তাঁদের ভেবে দেখা উচিত৷

Advertisement ---
---
-----