স্টাফ রিপোর্টার, বাঁকুড়া: আর পাঁচজন সাধারণ ছাত্রছাত্রীর মতো এবার থেকে ‘ওরা’ও পিঠে বইয়ের ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যাবে। ‘ওরা’ মানে বাঁকুড়ার তালডাংরার হাড়মাসড়া গ্রামীণ হাসপাতালের পরিত্যক্ত কোয়ার্টারে বসবাসকারী ‘যাযাবর’ পরিবারের কদম, সূর্য, দীপ সৌরভ ব্যাদরা৷

প্রসঙ্গত ‘যাযাবর’ সম্প্রদায়ের এই প্রথম প্রজন্ম যারা স্কুলের গণ্ডি ছুঁলো। ভিক্ষা বৃত্তি আর শিকার করেই যাদের বছরের পর বছর কেটে যায়, সেই পরিবারের ছেলে মেয়েরা এখন স্কুলে যাচ্ছে! এটা ‘যাযাবর’ শ্রেণির মানুষের কাছে স্বপ্নের চেয়েও বেশি কিছু৷

Advertisement

আরও পড়ুন: উইম্বলডনের কোর্টেও ‘নেইমার শো’

একটা সময় ‘অপরাধ-প্রবণ’ আর ‘ছিঁচকে চোরে’র অপবাদ পাওয়া যেন সয়ে গিয়েছিল এই জনজাতির কাছে৷ তবে এবার তাদের ছেলেমেয়েরাও স্কুলে গিয়ে আর পাঁচজন সাধারণ পরিবারের ছেলেমেয়ের সঙ্গে বসে পড়াশোনা করবে৷

তবে খবরটা শুনে যারা এখনও বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না, তাদের চক্ষু-কর্ণের বিবাদ ভঞ্জনের জন্য জেলার তালডাংরার বিবড়দা-খাতড়া ভায়া হাড়মাসড়া বাস রাস্তা ধরে যেতেই হবে। তারপর হাড়মাসড়া হাসপাতাল মোড়ে নেমে সোজা যেতে হবে ওঁদের ডেরায়। সময়ে পৌঁছালে দেখা যাবে বাড়ির বড় সদস্যরা যখন শিকার বা ভিক্ষাবৃত্তিতে বেরিয়ে যাচ্ছেন, ঠিক তখন ওই পরিবারগুলির এই চার খুদে সদস্য খাটিয়ায় বসে আপন মনে নিজেদের পড়াশোনা করে চলেছে।

আরও পড়ুন: মানুষকে ভালো রাখার লড়াইয়ে মীর-ঋত্বিক

এই জনজাতির মানুষগুলি নিজেদের মধ্যে বিশেষ এক ধরনের ভাষায় কথা বললেও ওরা স্কুলে পড়ছে একেবারে নিখাদ বাংলাতেই। স্থানীয়ভাবে এদের অনেক সময় ব্যাজকার, ইরানী, বানজারা বা কাকতাড়ুয়া বলা হলেও আসলে এরা ‘যাযাবর’। এদের নির্দিষ্ট কোনও বাসস্থান নেই।

বছরভর পেটের তাড়নায় এরা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু এদের মধ্যে ব্যতিক্রমী এই চার-পাঁচটি পরিবার। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখানোর তাগিদ অনুভব করে এরা গত কয়েক বছর ধরে আস্তানা গেড়েছে হাড়মাসড়া হাসপাতালের পরিত্যক্ত কোয়ার্টারে।

আরও পড়ুন: স্কুলের ছাদে ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টায় অভিযুক্ত একাদশের ‘দাদা’

মোটামুটি একটা জায়গায় থিতু হতে না পারলে ছেলে মেয়েরা লেখাপড়া শিখবে কী করে আর স্কুলেই বা ভরতি হবে কী করে! এই তাগিদ অনুভব করে হাজারো কষ্ট, অভাব আর অনটনের মধ্যে এখানে থেকে যায় তারা। তবে এই সব তথ্য জানা গেল এই যাযাবর সম্প্রদায়ের মানুষদের কাছ থেকেই।

এই প্রসঙ্গে এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ক্ষুদিরাম বাস্কে ও সহ শিক্ষিকা অপর্ণা ঘোষাল বেশ খুশি৷ তাঁদের কথায় এমন ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার সুযোগ করে দিতে পারাটাও একটা ভাগ্যের ব্যাপার। প্রধান শিক্ষক ক্ষুদিরাম বাস্কে বলেন, ‘‘বর্তমানে ওই যাযাবর সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েদের স্কুলে আনতে পেরে খুব ভালো লাগছে। ওরা যেহেতু প্রথাগত শিক্ষার বিষয়ে ওয়াকিবহাল নয়, তাই ওদের প্রতি আমরা একটু বেশিই নজর দিই। আর সবচেয়ে ভাল কথা ওরা এখন অন্যান্য সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মিশে গিয়েছে। নিয়মিত স্কুলেও আসছে৷’’

তবে এই শিশুদের স্কুলের পথে নিয়ে আসার নেপথ্যে যার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি সে হলেন যাযাবর জনজাতির পিঙ্কু ব্যাদ৷ সেই অসাধ্য সাধনকারী গর্বিত মা পিঙ্কু ব্যাদ বলেন, ‘‘আমরা আগে লেখাপড়ার বিষয়ে কিছুই জানতাম না। কেউ কোনও দিন স্কুলেও যায়নি। এখন আমরা বুঝতে পেরেছি। তাই এখন আমার মেয়ে সহ আরও তিনজনকে স্কুলে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছি৷’’

আরও পড়ুন: সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা চলাকালীন চুরি গেল চোখ

বাবা, মা, শিক্ষকদের পাশাপাশি খুশি এই জনজাতির স্কুল পড়ুয়ারাও। যাযাবর সম্প্রদায়ের এই স্কুল-মুখী হওয়ার উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন এলাকার মানুষও। তারা বলেন, ‘‘এরা কয়েক বছর এখানে রয়েছে। কোনও খারাপ কাজ নজরে আসেনি। সবার সঙ্গে যথেষ্ট সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলে। এরা যেভাবে স্কুলে যাচ্ছে তা সত্যিই ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত৷’’

আরও পড়ুন: রথযাত্রা উৎসবে বিধাননগরের রঙিন রথ মেলা

----
--