’৬৭ সালে ভারতীয় সেনার পালটা মারের কথা ভুলে গিয়েছে চিন

পৃথিবীর অন্যতম ক্ষুদ্রকায় রাষ্ট্র ভুটান যে এশিয়ার মহাশক্তিধর চিনের বিরুদ্ধে এলাকা গ্রাসের অভিযোগ তুলবে, এটা বোধহয় বেজিংয়ের কর্তারা স্বপ্নেও ভাবেননি৷ হিমালয়ে তিব্বত-ভারত-ভুটান, এই তিনের সংযোগস্থলে ভুটানের কিছুটা অংশ খুবলে নিয়ে স্ট্র্যাটেজিক হাইওয়ে বানাচ্ছিল চিন৷ ভুটানের সঙ্গে ভারতের নিরাপত্তাগত বোঝাপড়া রয়েছে৷ সে কারণেই ত্রিমুখী সংযোগস্থলের ওই নির্মাণ নিয়ে ভারতের সেনাবাহিনীর সঙ্গে চিনের পিএলএ-র ঝামেলা হয়৷ আর তা হতে না হতেই চিনা সরকারি প্রচারমাধ্যমে শুরু হয়ে যায় যুদ্ধের দামামা বাজানো৷

ভুটান বলেছে, বেজিংয়ের সঙ্গে থিম্ফুর যা চুক্তি রয়েছে ‘‘ভুটানি এলাকায় রাস্তা বানিয়ে চিন তা সরাসরি লঙ্ঘন করেছে৷’’ চিনারা কিন্তু সেই অভিযোগ চাপা দিতে ঘুরিয়ে ভারতকে কাঠগড়ায় তুলেছে৷ তাদের দাবি, সিকিম রাজ্যের সঙ্গে তিব্বতের যে সীমান্ত রয়েছে এবং সেখানে ভুটানের সঙ্গে যে ত্রিমুখী সংযোগস্থল রয়েছে ভারত তাকে পাত্তা দিচ্ছে না৷  উত্তরোত্তর বলশালী হয়ে-ওঠা চিন যে কায়দায় একটি গুলিও না চালিয়ে দক্ষিণ ও পূর্ব চিন সমুদ্রের স্থিতাবস্থা বদলাতে চোরাগোপ্তা যুদ্ধ চালাচ্ছে, ঠিক একইভাবে হিমালয়ের সীমান্তেও তারা মিটারে-মিটারে, কিলোমিটারে-কিলোমিটারে গোপনে জবরদখলের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে৷ বিশেষ করে, স্ট্র্যাটেজিক এলাকাগুলিতে৷

প্রতিবেদক-ব্রহ্ম চেলানি

যখনই তার সেই জমি দখলের প্রক্রিয়াকে কেউ চ্যালেঞ্জ জানায় তখনই চিন উলটে নিজে আক্রান্ত হয়েছে বলে ধুয়ো তোলে৷ শুধু তাই নয়, অপর পক্ষ বিপজ্জনক প্ররোচনা দিচ্ছে বলেও হুমকি দেয়৷ তাছাড়া, মূল ইস্যু চাপা দিতে মারাত্মক প্রচার যুদ্ধের রাস্তা বেছে নেয়৷ চুম্বি উপত্যকার কিনারায় যে ফৌজি অচলাবস্থা চলছে, সেক্ষেত্রেও চিন একই ভূমিকা গ্রহণ করেছে৷ ভুটান ও সিকিমের মাঝখানে চিন-নিয়ন্ত্রিত চুম্বি উপত্যকা অনেকটা ভোজালির মতো ঢুকে এসেছে৷ এই ভোজালির ফলা থেকে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত চিকেন নেকের দূরত্ব সামান্যই৷ একবার সেই গলাটা কেটে দিতে পারলে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাদবাকি দেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে৷

- Advertisement -

সম্প্রতি, এই অতি গুরুত্বপূর্ণ স্ট্র্যাটেজিক এলাকায় চিন তার সামরিক পরিকাঠামো এবং সেনা মোতায়েনের বহর বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে৷ যাতে যুদ্ধ বাধলে ব্লিৎসক্রিগ বা সামরিক ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে এক কোপে তারা বাদবাকি ভারতের থেকে আলাদা করে ফেলতে পারে৷ তেমন আগ্রাসনের ঘটনা ঘটলে ভুটানের ভাগ্য পুরোপুরি চিনের করুণার উপর নির্ভর করবে৷

  • ভারত-ভুটান সামরিক চুক্তি

মাত্র ৭ লক্ষ ৫০ হাজার বাসিন্দার দেশ ভুটানের নিরাপত্তা ও সামরিক দায়িত্বের কিছুটা ভারতকে বহন করতে হয়৷ ভারতের সঙ্গে তাদের সেই রকম বন্ধুত্বমূলক চুক্তিই রয়েছে৷ রাজকীয় ভুটানি সেনাবাহিনীর লোকবল নিতান্তই কম৷ তাই চীনের সঙ্গে যেখানে যেখানে ভুটানের সীমান্ত রয়েছে, সেগুলির মধ্যে তুলনামূলকভাবে দুর্বল জায়গাগুলিতে পাহারার দায়িত্বে রয়েছে ভারতের ফৌজ৷

২০০৭ সালে ভুটান-ভারত মৈত্রী চুক্তি অনুসারে স্থির হয়েছিল, উভয় প্রতিবেশী ‘‘জাতীয় স্বার্থের ইস্যুতে একে-অপরকে ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা দেবে’’৷ ১৯৪৯ সালে ভারতের সঙ্গে ভুটানের যে চুক্তি হয়েছিল সেইমতো ভুটান ছিল কার্যত ভারতের আওতাধীন৷ যার অন্যতম শর্ত ছিল, তাদের বিদেশনীতিও ভারতই ঠিক করে দেবে৷ কিন্তু ২০০৭ সালের নতুন চুক্তিটি হয় উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে ভুটান পৃথিবীর নবতম রাজকীয় গণতন্ত্রে রূপান্তরিত হওয়ার পর৷ সেই চুক্তি অনুসারে ভুটানের নিরাপত্তা ছাড়া সেদেশের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপের কোনও শর্তই নেই৷

ভারত-তিব্বত-ভুটানের ত্রিসংযোগস্থলে টেনশন দেখা দেওয়ার কিছু দিন বাদেই গত ১৬ জুন পিপলস লিবারেশন আর্মি সেখানে মাটি কেটে তোলার ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে আসে এবং ভুটানের ডোকালাম মালভূমিতে রাস্তা বানানোর কাজ শুরু করে দেয়৷ ভুটানের অন্তর্গত ডোকালাম এলাকাটি যে নিজেদের, সেটা গায়ের জোরে প্রমাণ করতে চিনারা তার একটা চিনা নামও খুঁজে বের করেছে৷ ডংলং৷ সেখানে ঢুকে চিনাদের রাস্তা বানাতে দেখে ভারতীয় ফৌজিরা হাজির হতেই ঝামেলা বাধে৷ পিএলএ সেনাদের সঙ্গে ভারতীয় জওয়ানদের হাতাহাতি হয়৷ সেই থেকে ৩ হাজার মিটার উচ্চতার ওই জায়গায় সামরিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে৷ তবে চিনাদের সড়ক নির্মাণ পর্বও আপাতত থমকে গিয়েছে৷

লক্ষ করার বিষয়, ১৬ জুনের ওই ঘটনা নিয়ে ২৬ জুনের আগে কিন্তু চিন টুঁ শব্দও করেনি৷ ঠিক যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন তখনই এ নিয়ে প্রথম অভিযোগ তোলে চিন৷ এই বিবৃতির উদ্দেশ্যই ছিল মোদী-ট্রাম্পের আলোচনায় ব্যাঘাত সৃষ্টি এবং সেইসঙ্গে মোদীকে হুঁশিয়ারি দেওয়া যে, আমেরিকার দিকে ঢললেই বেজিং ভারতকে তার মাশুল গুনিয়ে ছাড়বে৷ চিনা বিবৃতিতে অভিযোগ তোলা হল, ‘চিনের ডংলং এলাকা’য় ভারতের ফৌজিরা ‘হানা’ দিয়েছে এবং সেখানে চিনের বৈধ নির্মাণকার্য থামিয়ে দিয়েছে৷ অর্থাৎ, চিন আক্রান্ত হয়েছে৷ সেইসঙ্গে এও বলা হল, ভারত যদি সেনা সরিয়ে না-নেয়, তাহলে দিল্লি তার সমুচিত জবাব পাবে৷

তার পরেই শুরু হল ভারতের বিরুদ্ধে চিনা জনসংযোগের উন্মত্ত ধামাকা৷ আসল উদ্দেশ্য ছিল চোখে ধুলো দেওয়া৷ চিনই যে ভুটানের এলাকা জবরদখল করেছে সেটা যাতে কেউ বুঝতে না-পারে৷ চিনা সরকারি কর্তা এবং রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম, ফৌজি অচলাবস্থা নিয়ে সর্বত্র চলল ভারতের বিরুদ্ধে ক্রমাগত তোপ দাগা৷ কিন্তু কোথাওই তারা ভুটানের নামটুকু পর্যন্ত উল্লেখ করল না৷

অতঃপর ২৮ জুন ভারতস্থ ভুটানি রাষ্ট্রদূত প্রকাশ্যে পিএলএ-র সীমান্ত ও ভুটানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের প্রতিবাদ করলেন এবং পূর্বাবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবি জানালেন৷ একইসঙ্গে বললেন, বেজিং এই অশান্তিতে তৃতীয় পক্ষের অংশীদারিত্ব স্বীকার করুক৷ বাস্তবিক, অসহায় এবং ভীত ভুটান (যাদের সঙ্গে চীনের কোনও কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই) বেজিংয়ের কার্যকলাপের প্রতিবাদ জানাতে আটটা দিন নষ্ট করে ফেলল৷ অর্থাৎ সেদিক থেকে চিনের হাতেই তারা খেলে গেল৷

  • ক্রমাগত চাপ বাড়াচ্ছে চিন

যদিও পাকা ধানে আচমকা মই দেওয়ায় ভারতকে চিন ছাড়ল না৷ উদাহরণস্বরূপ, গত ২৯ জুন চিনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের মুখপাত্র ১৯৬২-র যুদ্ধে ভারতের পরাজয়ের কথা পেড়ে বললেন, আপাতত রণং দেহি মূর্তি না ধরে ভারতীয় সেনাবাহিনী ‘সেই ঐতিহাসিক শিক্ষা’র কথা মনে রাখলে ভালো করবে৷ প্রত্যুত্তরে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বলতে বাধ্য হলেন, ১৯৬২-র ভারত আর আজকের ভারতের মধ্যে অনেক তফাত৷

যদিও এত সবের মধ্যে চিন নিজেই ভুলে গিয়েছে যে, ১৯৬২-র যুদ্ধের পাঁচ বছর পর ১৯৬৭ সালে তিব্বত-ভারত-ভুটানের এই ত্রিসংযোগস্থলেই ভারতের সেনাবাহিনীর সঙ্গে পিএলএ-র তুমুল সংঘর্ষ হয়েছিল৷ নাথু-লা আর চো-লা এই দুটি গিরিপথ দখল করার লক্ষ্যে হানাদারি চালাতে গিয়ে চিনারা সেবার প্রবল মার খেয়েছিল৷ পিএলএ-র ক্ষয়ক্ষতি সেবার কিছু কম হয়নি৷

ভারতের উপর চাপ বাড়াতে চিন কৈলাস ও মানস সরোবর যাত্রীদের উপরেও নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছে৷ হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন এবং তিব্বতের আদি ধর্ম ‘বন’— এই চার ধারার ধর্মাবলম্বীদের কাছেই কৈলাস-মানসের গুরুত্ব অসীম৷ ৪৫৫৭ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত মানস সরোবর পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিশুদ্ধ জলের হ্রদ হিসাবে গণ্য হয়৷ হিন্দুদের চোখে কৈলাস পর্বত দেবাদিদেব শিবের আবাস৷ কৈলাস পরিক্রমায় সেখানেই প্রাণত্যাগ করেছিলেন আদি শঙ্করাচার্য৷ এমনকী, বৌদ্ধদের কোনও কোনও মত অনুসারে কৈলাসেই নির্বাণলাভ করেছিলেন ভগবান বুদ্ধদেব৷ তার উপর, সিন্ধু-ব্রহ্মপুত্র সহ এশিয়ার চারটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর উৎপত্তিই ঘটেছে কৈলাস-মানস ঘিরে৷

ডোকালাম ইস্যুতে কৈলাস-মানসের পুণ্যার্থীদের যাত্রা ভঙ্গ করার যে স্বেচ্ছাচারী পন্থা চিন নিয়েছে তার পালটা হিসাবে দিল্লিরও এবার তিব্বত নীতি নতুন করে খতিয়ে দেখা উচিত৷ তিব্বত প্রশ্ন অনির্দিষ্টকালের জন্য ভারত শিকেয় তুলে রাখলে চিন চাপ বাড়াতেই থাকবে৷ বেকায়দায় পড়ে চিন এখন ভুটানি এলাকার উপর দখলদারির দাবি তুলছে এই বলে যে, ঐতিহাসিকভাবে এইসব অঞ্চলের সঙ্গে তিব্বতের (হান চিনা নয় কিন্তু!) যোগ আছে৷ চিনের এই অভিসন্ধিমূলক ঐতিহাসিক দাবির পালটা হিসাবে অনেকটা জোঁকের মুখে নুন দেওয়ার মতোই ভারত অবিলম্বে তিব্বতের উপর চিনের ঐতিহাসিক দাবি নিয়ে প্রশ্ন তোলা আরম্ভ করে দিক৷

আপন রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ পূরণের উদ্দেশ্যে গোপন যুদ্ধ আরম্ভ করে চিন এই মুহূর্তে সমগ্র এশিয়ার রণনৈতিক অস্থিরতার মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে৷ চিনের গোপন যুদ্ধের প্রণালীটি এ রকম— প্রথমে এলাকাগত ইস্যুতে একটা গোলযোগ তৈরি করো, অতঃপর তা নিয়ে যখন তর্কবিতর্ক তুঙ্গে তখন চুপিসাড়ে সেই এলাকার উপর নিজেদের অস্তিত্ব কায়েম করো৷ করো এমনভাবে, যাতে সেটা বৈধ বলেই বাইরে থেকে মনে হয়৷ এই নিরবচ্ছিন্ন চিনা অনুপ্রবেশের লক্ষ্য একটাই৷ যে যে অঞ্চল তারা চায়, সেখানে সেখানে সামরিক নিয়ন্ত্রণ জানান দেওয়া৷ তার পর চাপ সৃষ্টি করে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে চিনেরই আরোপিত শর্তে প্রতিপক্ষ একটা সমঝোতায় আসতে বাধ্য হয়৷

এই যে অনেকটা কাঁকড়ার মতো এলাকাগত আধিপত্য কায়েম, এর সঙ্গে দাবার চালের কোনও সম্পর্ক নেই৷ এটা অনেকটা প্রাচীন চিনা ইনডোর গেম ‘গো’-র মতো৷ শত্রুর দুর্বল জায়গাগুলিতে ক্রমান্বয়ে উপর্যুপরি আঘাত হেনে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সিঁড়ি-ভাঙা অঙ্কের কায়দায় পর্যায়ক্রমে জিতে চলা৷

সেই মাও সে-তুংয়ের আমল থেকেই আক্রমণকে আত্মরক্ষা বলে চালিয়ে যাচ্ছে চিন৷ প্রাচীন চিনা সমরতত্ত্ববিদ সুন ৎসি-র পরামর্শ ছিল—‘‘সমস্ত যুদ্ধই চোখে ধুলো দেওয়ার ক্ষমতার উপর নির্ভর করে’’৷ বেজিং সেটাই অক্ষরে অক্ষরে মেনে আধিপত্য বিস্তার করছে৷ যদিও পৃথিবীর সব থেকে ছোট রাষ্ট্রগুলির অন্যতম যে ভুটান তাদের এলাকা দখল করতে গিয়ে রাশিয়া, কানাডা এবং আমেরিকার পরেই আয়তনে বৃহৎ রাষ্ট্র চিনের কোনও প্রবঞ্চনাই আর ধোপে টিকছে না৷ গোটা বিশ্বের সামনে তার আধিপত্য কায়েমের আগ্রাসী রণনীতি নগ্ন হয়ে গিয়েছে৷

  • লেখক নামকরা ভূ-রণনীতিবিদ
Advertisement ---
---
-----