টগর বোষ্টমী সেজে সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলা করা যায় না

বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশের হার এতই বেড়েছে যে, পশ্চিমবাংলার প্রশাসন উদ্বিগ্ন হয়ে এ ব্যাপারে কেন্দ্রকে জানিয়েছে৷ বোধহয় তারই পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ উভয় সীমান্তই সিল করে দেওয়ার কথা ভাবছে দিল্লি৷ বাংলাদেশ থেকে ইদানীংকার অনুপ্রবেশের যে চিত্রটি মিলেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, এই অনুপ্রবেশকারীদের বেশিরভাগই ঢুকছে অসমের বরাক উপত্যকা, মেঘালয় কিংবা ত্রিপুরা হয়ে৷ সেখান থেকে তারা একেবারে ভারতের নাগরিক বনে এসে বসত করছে পশ্চিমবাংলায়৷ এটাই মূলত এ রাজ্যের প্রশাসনের ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ আর সে কারণেই তারা দিল্লিকে জানিয়েছে৷

নিখিলেশ রায়চৌধুরী

অসমে এখন বিজেপি সরকার৷ কিন্তু এই ধরনের সমস্যা স্রেফ রাজনৈতিক রং দিয়ে মেটানো যায় না৷ দরকার হয় সদিচ্ছার৷ এমনিতেই বেশ কয়েক বছরের অপরাধ মানচিত্রে অসমের বরাক উপত্যকা একটা উল্লেখযোগ্য জায়গা করে নিয়েছে৷ কট্টরপন্থী মুসলিম সন্ত্রাসবাদী থেকে মাওবাদী, সেইসঙ্গে জেল-পালানো দাগি আসামি— সকলেরই ঠিকানা আপাতত অসম রাজ্যের এই শান্ত ‘ফটোজেনিক’ উপত্যকা৷ গত কয়েক বছরের ছবিটাই যেখানে এ রকম সেখানে এক বছরের মধ্যে সেই রুটেই হঠাৎ করে অনুপ্রবেশ বেড়ে যাওয়া আরও বেশি দুশ্চিন্তার কারণ৷ এই সময়কালের মধ্যেই অসম রাজ্যে ভোটে জিতে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে৷ তার পরেও এই কাণ্ডটা ঘটেছে৷ কী করে সেটা ঘটল? বলা বাহুল্য, ঘটার জন্য দায়ী সেই দুষ্ট ত্রিকোণ— রাজনীতিক, পুলিশ প্রশাসন এবং অপরাধচক্রের আঁতাঁত৷

বেশ কয়েক বছর ধরে বরাক উপত্যকার বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে চোরাচালানের মাধ্যমে যেমন মাদক এদেশে ঢুকেছে, ঠিক তেমনই ভিন রাজ্যে চুরি-হওয়া মোটরগাড়ির পার্টস বাংলাদেশে পাচার হয়েছে৷ এখন এ ধরনের মহৎ কম্মোয় কেবল মুসলমান অপরাধী এবং সন্ত্রাসবাদীরাই জড়িত ছিল, এই ধরনের দাবি কি বাস্তবসম্মত? বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন বরাক উপত্যকার একটি জেলায় যেমন মুসলমান জনসংখ্যার হার উল্লেখযোগ্য, ঠিক তেমনই ওই জেলার লাগোয়া আর একটি জেলায় হিন্দুরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ৷ এখন অনেকটা গিভ অ্যান্ড টেক পলিসিতে আন্তর্জাতিক স্তরের অপরাধীরাও যদি একটি জেলার সীমান্ত দিয়ে কিছু পাচারের বিনিময়ে অন্য জেলার সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশকারী ঢোকায়, তাহলে তা আটকানো যায় কীভাবে? শুধু রাজনীতি দিয়ে এই সমস্যার মোকাবিলা অসম্ভব৷ যেখানে কাঁচা টাকার গন্ধ থাকে সেখানে সব কিছুই কেনা যায়৷ এবং, যে কোনও রাজনীতির রংকে কেনা যায় সবার আগে৷

- Advertisement -

খাগড়াগড় কাণ্ডের পর থেকেই পশ্চিমবাংলায় সন্ত্রাসবাদীদের জাল বিছানোর প্রক্রিয়ার কথা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে৷ এমনকী, NIA-এর তরফ থেকেও এই ব্যাপারে এ রাজ্যের সরকারকে হুঁশিয়ার করা হয়েছে৷ আজ বাংলার প্রশাসন উৎকণ্ঠায় ভুগছে৷ কিন্তু এই উদ্বেগটা যদি তারা তখন থেকেই দেখাত, তাহলে হয়তো অনুপ্রবেশের রুট বদলটা সেই সময়েই এ রাজ্যের গোয়েন্দাদের নজরে আসত৷ কারণ, মাদক পাচার সহ জঙ্গিদের লুকানোর ডেরা হিসাবে বরাক উপত্যকার নামডাক আজকের নয়৷ অন্তত বছর পাঁচেকের৷

সীমান্ত সিল করলে হয়তো তার কিছু সুফল মিলবে৷ কিন্তু অপরাধচক্রও নিশ্চয়ই হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না৷ তখন হয়তো আবার নেপাল সীমান্ত সিল করার দরকার পড়বে৷ এই পরিস্থিতিতে অসমের বরাক উপত্যকা কিংবা ত্রিপুরার আন্তর্জাতিক সীমান্তের পাশাপাশি ভারতের দিক থেকে যেখানে সব থেকে বেশি প্রহরার দরকার, সেটা হল সুন্দরবন জল সীমান্ত৷ একটা সময় ছিল যখন পাচারকারী এবং অনুপ্রবেশ চক্রীদের সব চাইতে পছন্দের রুট ছিল সুন্দরবনের জল সীমান্ত৷ মাঝখান থেকে দেখা গেল, ভারত সরকার যখন বরাক উপত্যকা এবং ত্রিপুরা সীমান্ত সামলাতে গেল তখন আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্র আবার এই জল সীমান্তে তাদের তৎপরতা বাড়িয়ে দিল৷ সুতরাং, একসঙ্গে সব সীমান্তেই নজরদারি বাড়ানো দরকার৷

ধরে নেওয়া যাক, নজরদারি বাড়ল৷ চক্রীরা সব ঠান্ডা হয়ে গেল৷ কিন্তু একবার যে বিপদ বাসা বেঁধেছে তার থেকে পরিত্রাণ মিলবে কোন পথে? কারণ, আবারও বলছি, বিপদ কেবল দাড়ি-টুপি-জোব্বার পথে আসেনি, অন্য পথেও এসেছে৷ তিলক দেখে গলে গেলে বিপদ আরও পেয়ে বসবে৷

খবরে প্রকাশ, নির্বাচনের নামে হংকংয়ের বাসিন্দাদের ঘাড়ে জোর এক কমিউনিস্ট চীনপন্থী নেত্রীকে বসিয়ে দিয়েছে বেজিং৷ এখন কথা হল, আমার দুবাইকেও চাই, হংকংকেও চাই, আবার দেশের বুকে ভারতবিরোধী শক্তির দাপটও খর্ব করতে চাই— এ তো অনেকটা পিয়াজের খোসা ছাড়ানোর মতো ব্যাপার হয়ে গেল!

Advertisement
-----