চলুন, আমরা আদি প্রস্তর যুগে ফিরে যাই

সম্প্রতি একটি ছোট্ট খবর প্রকাশিত হয়েছে৷ সেই ঠান্ডাযুদ্ধের পর ইউরোপে আমেরিকার মিত্রশক্তি ন্যাটো-র (নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন) বিমানবাহিনী আবার রাশিয়ার বিমানবাহিনীর গতিবিধির উপর নজর রাখতে শুরু করেছে৷ অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দেওয়ার পরেই উত্তর কোরিয়ার উপকূল জুড়ে দীর্ঘ হচ্ছে চীনের বিমানবাহিনীর ছায়া৷ মার্কিন রণতরীগুলি এগিয়ে আসছে কি না, সেটাই দেখছে তারা৷ বলা বাহুল্য, ১৯৫০-৫৩-র পর আমেরিকার প্রশাসন যদি আবার একটি কোরিয়ান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে আগের মতোই উত্তর কোরিয়ার বকলমে যুদ্ধটা চালাবে চীন-ই৷

নিখিলেশ রায়চৌধুরী

কিন্তু ঠান্ডা যুদ্ধের আমলের থেকে এখন ব্যাপারটা তালগোল পাকাচ্ছে অনেক বেশি৷ কারণ, রুশ-মার্কিন ঠান্ডা যুদ্ধের চরম পর্যায়ে আমেরিকা-পশ্চিম ইউরোপ আর চীন ছিল ভাই-ভাই একঠাঁই৷ এখন আমেরিকা একদিকে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে তুড়ুং ঠুকছে, আর একদিকে ন্যাটো ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়াকে সামরিকভাবে চাপে রাখতে চাইছে৷ ব্যাপারটা আরও বেশি ঘোরালো হয়ে উঠছে দুই গোলার্ধ জুড়েই জাতিধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে একটা বিদ্বেষবিষ ছড়ানোর মধ্যে দিয়ে৷ দেখেশুনে মনে হচ্ছে, উন্নত দুনিয়া ও উন্নয়নশীল বিশ্ব— উভয় দিকেই একসঙ্গে অনেকের মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে৷ নইলে গোটা বিশ্ব জুড়ে জাতপাতের নামে মুখের দুই কষ বেয়ে এহেন হিটলারি গ্যাঁজলা ঝরতে অন্তত ষাট-সত্তর বছর দেখা যায়নি৷ তা-ও এ রকম লার্জ স্কেলে৷ যা অবস্থা তাতে দুনিয়ার কোথাও না কোথাও একটা যুদ্ধ যদি না বাধে এবং তার সূত্র ধরে যদি বোধশক্তিহীন গণহত্যালীলা না চলে, তাহলেই আশ্চর্য হয়ে যেতে হবে৷

সরাসরি তেমন বড় কোনও যুদ্ধ না হলেও ইদানীংকালে গণহত্যালীলা যে ঘটেনি, তা নয়৷ কিন্তু বিদ্বেষবিষ ছড়াতে ছড়াতে তা যে প্রায় গোটা বিশ্বকে গ্রাস করবে, সেটা অন্তত এত অত্যাধুনিক সভ্যতার কালে ভাবা যায়নি৷ যখন পুটুস করে হোয়াটসঅ্যাপ করলেই আপনি যা চান সেটাই মুখে গুঁজে দেওয়া হচ্ছে, সেই যুগে দাঁড়িয়েও কি না এত ঘৃণা! তাহলে কি তারও উৎস সেই সোশ্যাল মিডিয়া, হোয়াটসঅ্যাপ? হালে কলকাতার মতো শহরেও যে হারে নামী-দামী দোকানে অ্যাডলফ হিটলারের ‘মেইন কাম্ফ’ ঢেলে সাজিয়ে রাখতে দেখছি, জ্ঞান হওয়া ইস্তক তা কিন্তু দেখিনি৷ গোটা বিশ্ব জুড়ে হিটলারের অনুগামীর সংখ্যা বাড়লে, খুব স্বাভাবিকভাবেই তার পালটা প্রতিক্রিয়াও বাড়বে৷ একবিংশ শতকের আমেরিকায় যদি টেনেসির বাইরেও কু ক্লক্স ক্ল্যানের ভক্তকুল চক্রবৃদ্ধি হারে তাদের সংখ্যা বাড়ায়, তাহলে কি ম্যালকম এক্সের শিষ্যরাও সেখানে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে? তবে বরাবরই বিশ্বে সব জাতের দাঙ্গাকারীদের মধ্যে একটা জায়গায় খুব মিল— যাঁরা শান্তি-কল্যাণের কথা বলেন তাঁদের তারা পছন্দ করে না৷ তারা ভালোবাসে পাওয়ারপ্লে!

- Advertisement -

হিটলারের পর বিশ্বে আর এক মহামানবকে দেখা গিয়েছিল৷ তাঁর নাম মাও সে-তুং৷ মজা হল, ঠান্ডা যুদ্ধের আবহে প্রথমেই আমেরিকার প্রশাসনের সঙ্গে মাও সে-তুংয়ের হুকুমবরদারদের সরাসরি মধুচন্দ্রিমা ঘটেনি৷ প্রথম মধুচন্দ্রিমাটি ঘটেছিল ন্যাটোর সঙ্গে পিপলস লিবারেশন আর্মি-র! দৌত্যকার্যটি করেছিলেন তৎকালীন পশ্চিম জার্মানির দক্ষিণপন্থী শাসককুল৷ পশ্চিম জার্মানির প্রথম শাসক আডেনাউয়ের মাও সে-তুংয়ের মধ্যে এক ‘মসিহা’-কে দেখতে পেয়েছিলেন৷ শুধু তাই নয়, ১৯৬০-এর দশকে ক্রুশ্চেভের সঙ্গে সব সম্পর্ক লাটে ওঠার পর পরই মাও সে-তুংয়ের চীন প্রথম বাণিজ্য ও প্রত্যক্ষ সামরিক সহায়তা যাদের কাছ থেকে পেয়েছিল সেই দেশটির নাম পশ্চিম জার্মানি৷ ন্যাটোর সামরিক বিশেষজ্ঞরা সেই সময় বেজিংয়ে গিয়ে পিএলএ-কে সামরিক উপদেশ দিতেন, প্রশিক্ষণ দিতেন৷ সাধে কি আর মাওয়ের রেড গার্ডদের শিবিরে ‘রেড বুকে’র পাশাপাশি ‘মেইন কাম্ফ’ পড়া বাধ্যতামূলক ছিল! পাশ্চাত্য সভ্যতার চিরায়ত সাহিত্য, সঙ্গীতের অ্যালবাম রেড গার্ডরা রাস্তার উপর ঢেলে পোড়াত, ঠিক যেমনটা একসময় জার্মানিতে করত হিটলারের অনুগামীরা৷ ফলে, একের ভক্তরা যে অন্যের মধ্যে যুগপুরুষের ছায়া দেখবে তাতে আর আশ্চর্য কী!

এখন সেই হিটলারের প্রতি ভক্তি আবার উথলে উঠছে, সেইসঙ্গে মানববিদ্বেষ৷ যদিও এই বিদ্বেষের ‘সায়েন্টিফিক’ উৎস ইতিহাসের নিরিখে খুব বেশি দিনের নয়৷ সপ্তদশ শতাব্দী৷ তবু গোটা পৃথিবী জুড়ে তার লেজ ধরেই শুরু হয়েছে মানুষ থেকে বানরে ফিরে যাওয়ার এক বিচিত্র ছটফটানি৷ একদিকে আইএসের মতো ঘাতকবাহিনী মানবসভ্যতার যাবতীয় চিহ্ন মুছে ফেলতে যেমন উৎসাহী, তথাকথিত সভ্য দুনিয়ার হর্তাকর্তারাও তার থেকে খুব বেশি পিছিয়ে আছেন বলে মনে হচ্ছে না৷ হঠাৎ করেই, স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল জুড়ে যেন এ রকম একটা ভাব— মানুষের সভ্যতার তো অনেক দিন হল, এবার সব চুকিয়ে-বুকিয়ে আবার আদি প্রস্তর যুগ কিংবা তারও আগে কোথাও ফিরে যাওয়া যাক৷ একটা হেস্তনেস্ত হয়ে যাক, যা থাকে কপালে!

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট উত্তর কোরিয়াকে উচিত শিক্ষা দিতে চাইছেন, আবার সেই তিনিই চীনের প্রেসিডেন্ট জি জিনপিংকে খাতির করে ডেকে তুষ্ট করছেন৷ ওদিকে সিরিয়া আর তুরস্ক নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কটা এমন জায়গায় নিয়ে যেতে চাইছেন, যাতে আইএসআইএস আবারও দ্বিগুণ শক্তিতে মারকাট চালাতে পারে৷ দেখেশুনে মনে হচ্ছে, পাপেট মাস্টার সেই হাতে গোনা কয়েকজন৷ তারাই এখানে একে উসকাচ্ছে, তো ওখানে তাকে৷ সর্বত্র যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দিতে পারলে তাদেরই সব চাইতে বেশি লাভ৷ কিন্তু এভাবে মানব সভ্যতার ক্রমঅধঃপতন ঘটতে থাকলে সেই লাভের গুড় খাওয়ার মতো পিঁপড়েও আর বেঁচে থাকবে তো?

Advertisement ---
-----