সময়ের পরিবর্তনই হয়েছে, শিক্ষা হয়নি পুলিশের

রানা দাস, কলকাতা: লালগড়ের ঝিটকা, আলিপুরদুয়ারের পর এবার দিনহাটা৷ ১২ বছর পরেও সিআইডি-র বোম্ব ডিসপোজাল স্কোয়াড যে একই রকম চরম অপদার্থ রয়ে গিয়েছে, বোমা নিস্ক্রিয় করার ক্ষেত্রে তাঁরা যে নুন্যতম সতর্কতা নিতে অভ্যস্ত নন, বুধবার দুপুরে তারই সাক্ষী থাকল দিনহাটার কৃষিমেলা এলাকা৷ বোমার ভিতরে থাকা বারুদ নষ্ট করতে গিয়ে আগুনে ঝলসে গেলেন সিআইডির এক বম্ব ডিসপোজাল স্কোয়াডের কর্মী৷ ঝলসে গিয়েছে তাঁর মুখ। যার জেরে লালগড়ের ঝিটকার জঙ্গল-আলিপুরদুয়ারের সঙ্গে একসুত্রে বেঁধে গেল দিনহাটা৷

বারুদ নিষ্ক্রিয় করতে গিয়ে বিস্ফোরণে ঝলসে গেলেন সিআইডি কর্মী

লালগড় তখন মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকা৷ আর আলিপুরদুয়ার কামতাপুর লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (কেএলও) মুক্তাঞ্চল৷ ২০০৬ সাল৷ ২১ সেপ্টেম্বর৷ কর্মসূত্রে মেদিনীপুরে শহরে৷ আগেই দিনই ঝাড়গ্রামের এক প্রত্যন্ত এলাকা বাস থেকে নামিয়ে সিপিএম নেতা অনিল মাহাতকে খুন করে মাওবাদীরা৷ সেদিন থেকে প্রবল ঝড়বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা৷ কোথাও গাছ উপড়ে, কোথাও খুঁটি উপড়ে রাতভর বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল জেলা৷ ঝড়ের তাণ্ডবে জেলার বিভিন্ন প্রান্তই লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল৷

সকালেই মেদিনীপুর শহরে সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের কাছে খবর আসে, লালগড়ে ঝিটকার জঙ্গলে প্রচুর আরডিএক্স বিস্ফোরকের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ৷ জেলা পুলিশ পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছে৷ খবর পাওয়া মাত্রই একটি চ্যানেলের ক্যামেরাম্যান আর আমার চিত্র সাংবাদিকে সঙ্গে নিয়ে বাইকে চেপে ঘটনাস্থলে পৌঁছে জানতে পারলাম, আরডিএক্স পাওয়ার খবরটা ভুল ছিল৷ বাস্তবে একটা গাছ কেটে রাস্তা বন্ধ করে রেখে দেওয়া হয়েছে৷ আর সেই কাটা গাছের কান্ডের পাশে একটা ল্যান্ডমাইন পোঁতা রয়েছে৷ ল্যান্ডমাইনটা পোঁতা ছিল দিক নির্দেশ করে৷ অর্থাৎ, রাস্তা দিয়ে যাওয়া কোনও গাড়িতে আঘাত হানার জন্যই পুঁতে রাখা হয়েছিল৷ মাইনের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে বৈদ্যুতিক তার৷ যা চলে গিয়েছে ঘন জঙ্গলের মধ্যে৷

- Advertisement DFP -

একটা বোমা বা ল্যান্ডমাইনের সন্ধান পেলে, প্রথমেই যাদের তলব পড়ে, এই ক্ষেত্রেও অপেক্ষা করা হচ্ছিল সিআইডি’র বম্ব স্কোয়াডের জন্য৷ সংবাদমাধ্যমের পৌঁছনোর অনেক পরে এসে ঘটনাস্থলে হাজির হন জেলা পুলিশ কর্তারা৷ তারও পরে আসে বম্ব স্কোয়াড৷ প্রাথমিক অবস্থায় বম্ব স্কোয়াড সদস্য যা করে থাকে, ঝিটকার জঙ্গলে পাওয়া ল্যান্ডমাইন নিষ্ক্রিয় করতে সেই একই কাজগুলো একে একে করে নিলেন তাঁরা৷ সন্তর্পনে কেটে নেওয়া হল বৈদ্যুতিক তার৷ আমাদের আশ্বস্ত করা হল৷ বিপদ কেটে গিয়েছে৷ এবার খুলে দেখার পালা, স্টিলের টিফিন বক্সটি খুলতে স্কোয়াডের সঙ্গে আনা বাক্স থেকে বের করা হল ছেনি-হাতুড়ি৷ সেই সময়ের আগে পর্যন্ত জানতাম যে, ছেনি-হাতুড়ি রাজমিস্ত্রিদের কাছেই থাকে৷

পুলিশের বম্ব স্কোয়াডেরও থাকে, সেদিনই তা প্রথম জানলাম৷ সিআইডির বাঘা অফিসার আশ্বস্ত করেছেন৷ তাই কিসের ভয়৷ ল্যান্ডমাইনের কাছেই ছিলাম৷ দেখছিলাম ছেনি-হাঁতুড়ি দিয়ে কীভাবে ল্যান্ডমাইন খোলা হয়৷ হাঁতুড়ির প্রথম আঘাতের একটু আগেই সাংবাদিকের মন বলে উঠেছিল, এটা এখন ফেটে গেলে, কাল সকালের কাগজে ভাল একটা খবর ‘বাই লাইন’ দিয়ে বেরতে পারে৷ ভাবনা শেষ হতেই, বিকট শব্দে কান বন্ধ হয়ে গেল৷ চোখের সামনে দেখতে পেলাম, সাদা ধোঁয়ার সঙ্গে সিআইডির বম্ব স্কোয়াডের বাঘা অফিসার ‘ভক্তা’র (পুরো নামটা মনে পড়ছে না) দেহটা কুণ্ডলি পাকিয়ে উড়ে গেল৷

সাত বছরের ব্যবধানে ২০১৩ সালে জলপাইগুড়ি আলিপুরদুয়ারের চৌপথি মোড়েই ব্যাগসহ পরিত্যক্ত সাইকেলকে ঘিরে বোমাতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছিল৷ শঙ্কা থেকেই সাইকেল থেকে ব্যাগটা সরিয়ে রাখা হয়েছিল জনবহুল এলাকা থেকে দুরে একটি ফাঁকা মাঠে৷ আর সেই ‘সম্ভাব্য’ বোমাকে নিষ্ক্রিয় করতে গিয়েই প্রাণ হারাতে হল সিআইডি’র বম্ব স্কোয়াডের এক অফিসারকে৷

ফের প্রমাণ হল- দিন বদলেছে, প্রযুক্তির উন্নতিই হয়েছে৷ এখনও উন্নতি হয়নি রাজ্য পুলিশের বোম্ব ডিসপোজাল স্কোয়াড৷ সেদিনও খুব গা ছাড়াভাবে বোমা নিষ্ক্রিয় করতে গিয়ে দুই পুলিশ অফিসারের মৃত্যু হয়েছিল, আমার মতো সাংবাদিকদের ফিরে আসতে হয়েছে মৃত্যুমুখ থেকে৷ এদিনও সিআইডি’র বম্ব স্কোয়াডের তিন অফিসার গা ছাড়া মনোভাব নিয়েই বোমা নিষ্ক্রিয় করতে গিয়েছিলেন৷ ছিল না ন্যূনতম সতর্কতা৷ বর্ম পড়ার প্রয়োজনও মনে করেননি৷ফলে সাত বছরের ব্যবধানে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল৷ অকালে প্রান দিতে হয়েছিল আরও এক দক্ষ পুলিশ অফিসারকে৷

ফের পাঁচ বছরের ব্যবধানে বুধবার বোমার ভিতরে থাকা বারুদ নষ্ট করতে গিয়ে আগুনে ঝলসে গেল সিআইডির বোম্ব ডিসপোজাল স্কোয়াডের এক কর্মীর মুখ। দিনহাটার কৃষিমেলা এলাকার এই ঘটনা ফের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল- প্রযুক্তির উন্নতি হলেও রাজ্যের বোম্ব ডিসপোজাল স্কোয়াড রয়ে গিয়েছে সেই মান্ধাতা আমলেই৷ অগত্যা, যা হওয়ার তাই হয়েছে৷ কবে মান্ধাতা আমল থেকে বেরিয়ে আসবেন এরাজ্যের বোম্ব স্কোয়াড, কবে তাঁরা উপযুক্ত প্রশিক্ষত হয়ে উঠবেন- তার সদুত্তর নেই খোদ শীর্ষ কর্তাদের কাছেও৷

Advertisement
----
-----