আইএসআইয়ের পোষা দাউদ ইব্রাহিম পাকিস্তানেই আছে

নিখিলেশ রায়চৌধুরী: এমন একটা খবর রটেছে যে, দাউদ ইব্রাহিম তার অপরাধ জগতের কুর্সি ছেড়ে দেবে৷যেহেতু তার ষাট বছর বয়স হয়ে গিয়েছে, অতএব যে কোনও লিখিত-পড়িত আপিস-কাছারির মতো তার টেরর ইনকরপোরেটেডের চেয়ারম্যানের চেয়ারটাও ছেড়ে দেওয়া উচিত৷এও শোনা গিয়েছে, এই চেয়ার সে দিয়ে যাবে তার ভাই আনিস ইব্রাহিমকে৷অর্থাৎ, তার বিশ্বস্ত শাগরেদ ছোটা শাকিল যেমন অধস্তন ছিল, তেমনই থাকবে৷ বলা বাহুল্য, ডি কোম্পানির সাম্রাজ্যে ফাটল ধরার এটাই সূচনা৷

নিখিলেশ রায়চৌধুরী বিশিষ্ট সাংবাদিক
নিখিলেশ রায়চৌধুরী
বিশিষ্ট সাংবাদিক

একইসঙ্গে পিটিআই সূত্রে আর একটি খবর যে, পাকিস্তানি ‘ডন’ পত্রিকার এক বড়সড় কর্তা জানিয়েছেন, দাউদ এখন আর পাকিস্তানে বাস করে না৷ঘন ঘন আসে-যায়৷ কিন্তু পাকাপাকিভাবে আর থাকে না৷
ওসামা বিন-লাদেন যখন গা-ঢাকা দিয়ে ছিল, তখনও এ রকম নানা জল্পনা ডানা মেলেছিল৷অবশেষে মার্কিন মেরিন কমান্ডো অভিযানে যখন তার ভবলীলা সাঙ্গ হল তখন দেখা গেল, অ্যাবোটাবাদের পাক সেনাবাহিনীর পোষ্য হিসাবে তাদেরই ঘাঁটির লাগোয়া একটি ডেরায় সে বাস করছিল৷দুই-একজন মার্কিন সাংবাদিক ছাড়া যে সম্ভাবনার আভাস আর কেউই দিতে পারেনি৷

‘ডন’ পত্রিকার ওই কর্তার মতে, দাউদ নিয়মিত সুদান এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় যাতায়াত করে৷সেটা করা অসম্ভব কিছু নয়৷ কেউ যদি পাক সামরিক গুপ্তচর বাহিনী ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের হুকুমবরদার এবং পোষা বান্দা হয়, তাহলে তার পক্ষে এইসব দেশে নিয়মিত যাওয়া খুব একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়৷বিশেষ করে, যে বান্দাকে এখনও আইএসআইয়ের নানা কাজে লাগে৷
যদিও বাস্তব যা, তাতে দাউদ ইব্রাহিমের পক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার চাইতেও এখন উত্তর সুদানের মতো দেশে যাওয়াটা অনেক বেশি সহজ৷সুদান এখন দুই ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে৷ দক্ষিণ সুদানে খ্রিস্টানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ৷আর উত্তর সুদান ঘোষিত ইসলামি রাষ্ট্র৷এমনিতেই আফ্রিকার বুকে গৃহযুদ্ধে বিদীর্ণ সুদান বরাবরই সন্ত্রাসবাদী ও অপরাধীদের পছন্দের জায়গা৷ পেশাদার খুনি ‘জ্যাকেল’ কার্লোসও ধরা পড়েছিল এই সুদানেই৷আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পর নির্বিঘ্ন কার্যকলাপের জন্য সুদানের মাটি ছিল আল-কায়েদার অত্যন্ত ভরসার জায়গা৷এখন উত্তর সুদান স্বতন্ত্র রাষ্ট্র৷ তাদের অস্তিত্ব টিঁকে রয়েছে আরব শেখশাহির পেট্রডলারের দাক্ষিণ্যে৷আইএসআই যে সেখানে দাউদ ইব্রাহিম চরতে দেবে, সেটা স্বাভাবিক৷
দাউদকে নিয়ে ভারতে যত গল্পকথাই চালু থাক, যত দিন না আইএসআইয়ের আশীর্বাদ সে পেয়েছে তত দিন তার সাম্রাজ্য ফুলেফেঁপে উঠতে পারেনি৷এই আশীর্বাদপ্রাপ্তির আগে পর্যন্ত দাউদ ও তার কারবারের পরিধি যা ছিল, তাতে ইতালি-কলম্বিয়া-মেক্সিকো কিংবা রাশিয়ার মাফিয়ারা তাকে অনায়াসে পকেটে পুরে ফেলতে পারত৷দাউদকে আজকের দাউদে পরিণত করেছে পাক সেনাবাহিনী, বিশেষ করে আইএসআই৷আইএসআই না থাকলে আমেরিকার বুকে বিপুল বেনামা স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বানানো দাউদের পক্ষে কখনই সম্ভব হত না৷ দুঃখের বিষয়, ভারত এ ব্যাপারে বার বার তথ্য দিলেও ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আত্মঘাতী বিমান হামলার আগে পর্যন্ত মার্কিন প্রশাসনের হুঁশ ফেরেনি৷২০০২ সালে তারা দাউদকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদীদের তালিকাভুক্ত করে এবং সেইমতো আমেরিকায় তার সমস্ত সম্পত্তি এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বাজেয়াপ্ত করে৷

- Advertisement -

তার পরেও এতগুলো বছর ধরে দাউদ টিঁকেই বা আছে কী করে, কী করে বা তার অপরাধ জগতের সাম্রাজ্য চালাচ্ছে আর এত প্রশ্রয়ই বা পাচ্ছে কোথায়? ঘুরে-ফিরে সেই আইএসআইয়েই বৃত্তটি শেষ হচ্ছে৷আইএসআইয়ের নেটওয়ার্কের একটি বড় কৌশল হল, পারতপক্ষে তারা কোনও লিখিত রেকর্ড রাখে না৷ যা করে কিংবা করতে বলে, সবই মুখে মুখে৷কিন্তু তাদের কার্যপ্রণালী আমেরিকার গোয়েন্দা বাহিনী সিআইএ যে জানে না কিংবা বুঝতে পারে না, তা তো নয়৷ পাক রেঞ্জারদের স্কাউটবাহিনী হিসাবে কাজ শুরু করে আইএসআই যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রের ভিতরে রাষ্ট্র হতে পেরেছে, তার জন্য তো সিংহভাগ কৃতিত্ব তো সিআইএ-রই প্রাপ্য!  এখনও যিনিই আইএসআইয়ের প্রধান হন, তিনি সর্বাগ্রে আমেরিকায় বড়কর্তাদের স্যালুট ঠুকতে যান৷অতএব, দাউদ কোথায় আছে এবং কী করছে সে খবর ল্যাংলিরও অনেক অফিসার ভালোমতোই জানেন, কিন্তু তা তাঁরা ফাঁস করবেন না৷ হয়তো খোদ মিঃ প্রেসিডেন্টকেও তা জানতে দেবেন না৷ এখনও মার্কিন প্রশাসনে ভারতকে বেগ দিতে ইচ্ছুক, এমন লোকের সংখ্যা কম নয়৷
যে যাই বলুক, বিভিন্ন ঘটনা পরম্পরা থেকে এটাই মনে হয় যে, যেখানেই ঘুরে বেড়াক না কেন, দাউদের পাকা আস্তানাটি রয়েছে পাকিস্তানেই৷পাকিস্তানের কোনও সামরিক ঘাঁটিই তার আশ্রয়স্থল৷ হতে পারে তা অ্যাবোটাবাদ, হতে পারে রাওয়ালপিণ্ডি, হতে পারে মুরি হিলস্টেশন, কিংবা অধিকৃত কাশ্মীরের কোনও সেনা ব্যারাক, কিন্তু আইএসআইয়ের বকলসে বাঁধা বান্দা তাদের হাতছাড়া হয়নি৷ আইএসআই তা হতে দেবে না৷

 

 

Advertisement
---