নিখিলেশ রায়চৌধুরী: উত্তরপ্রদেশ সহ পাঁচ রাজ্যের ভোট ফলাফল নিয়ে যখন দেশজুড়ে তুমুল উত্তেজনা ঠিক সেই সময়েই ছত্তিশগড়ের সুকমায় মাওবাদীদের হামলায় মারা গেলেন সিআরপিএফের ১২ জন জওয়ান৷ গত বুধবারই বিহারের গয়া জেলায় কোবরা ব্যাটেলিয়ানের অভিযানে চার মাওবাদী খতম হয়েছে৷ শনিবারের ঘটনা কি তারই বদলা?

মাওবাদী উপদ্রবের ব্যাপারে ভারতের স্বরাষ্ট্র দফতরের আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল৷ বিগত কয়েক বছর ধরে প্রায় প্রত্যেক দিনই পূর্বে ঝাড়খণ্ড থেকে শুরু করে ওডিশা, ছত্তিশগড় ধরে পশ্চিমে মহারাষ্ট্রের পূর্বাংশ পর্যন্ত জঙ্গল জুড়ে মাওবাদীদের বিরুদ্ধে অপারেশন চলছে৷ কমবেশি সাফল্যও মিলছে৷ কিন্তু তার পরেও মাওবাদীদের তৎপরতা বন্ধ হয়নি৷ আধা-সামরিক অভিযানের পাশাপাশি সরকারিভাবে বহু উন্নয়নমূলক প্রকল্পও গ্রহণ করা হয়েছে৷ তা সত্ত্বেও ঝোপ বুঝে কোপ মারার মাওবাদী গেরিলা পন্থা থেকে যে এদেশের মাওপন্থীরা একচুলও সরে আসেনি, সুকমার ঘটনায় সেটা আবারও প্রমাণিত হয়ে গেল৷

Advertisement

সুকমা কিন্তু অনেক দিন ধরেই মাওবাদীদের বিচরণ ক্ষেত্র৷ সুতরাং সেখানে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা থাকা উচিত ছিল৷ যদি সত্যিই থাকত, তাহলে কি মাওবাদীরা এই আঘাত হানার সুযোগ পেত? নোটবন্দির পর ছত্তিশগড় ও ঝাড়খণ্ডের একাধিক জায়গা থেকে তাড়া তাড়া বাতিল ১০০০ ও ৫০০ টাকার নোটের বস্তা উদ্ধার হয়েছে৷ বোঝাই গিয়েছে, কোনও না কোনও সূত্রে কালো টাকায় ওই নোটগুলি মাওবাদীরা পেয়েছিল৷ শেষ পর্যন্ত ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছে৷ হয়তো তহবিলের অভাবেই মাঝখানে কিছু দিন তাদের ছোবল মারা বন্ধ ছিল৷ এখন আবার আর্থিক জোগান মিলছে, সেইসঙ্গে অস্ত্রশস্ত্রও৷ জিয়নকাঠির ছোঁয়ায় তারা আবার মাথাচাড়া দিতে শুরু করেছে৷

সুকমার এই ঘটনা ঘটার অব্যবহিত আগের দুটি ঘটনার কথা উল্লেখ না করে পারছি না৷ এক, ভারত সরকার দলাই লামাকে অরুণাচলে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ায় লাল চীন রুষ্ট৷ দুই, নেপাল সীমান্তে একটা অবৈধ সাঁকো তৈরি নিয়ে সশস্ত্র সীমা বলের জওয়ানদের সঙ্গে ঝামেলার জেরে কাঠমাণ্ডুতে শুরু হয়েছে ভারত-বিরোধী বিক্ষোভ৷ ঠিক এ রকমই একটি মুহূর্তে ঘটল সুকমায় সিআরপিএফ জওয়ানদের উপর হামলাবাজির ঘটনা৷ মারা গেলেন ১২ জন আধা-সামরিক জওয়ান৷ এ কি নিছক সমাপতন?

মাসুদ আজহারকে লাল চীন যখন সন্ত্রাসবাদী হিসাবে মানতে চায় না তখন তারা এদেশের আরও অনেক উগ্রপন্থী ও বিচ্ছিন্নতাকামী শক্তিকেও যে বিপজ্জনক বলে মনে করবে না, সেটাই স্বাভাবিক৷ ভারতের পক্ষে তারা বিপজ্জনক হলেও চীনের কাছে নয়৷ বরং, দিল্লিকে এরা যত ব্যতিব্যস্ত করবে ততই বেজিংয়ের কাছে তারা আদর এবং কদর পাবে৷ হয়তো সেইসঙ্গে আরও কারও কারও কাছে৷ ভারত এমন একটি দেশ যেখানে একই সূত্র থেকে বল সঞ্চয় করে অক্টোপাশের মতো বিভিন্ন সংগঠনের নামে সন্ত্রাসমূলক কার্যকলাপ ঘটানো আনকোরা নতুন কিছু নয়৷ এ জিনিস আগেও হয়েছে, এখনও চলছে৷ যদি কট্টরপন্থী মুসলিম সন্ত্রাসবাদের ভেক ধরে কাজ না হয়, তাহলে মাওপন্থার নামে হবে কিংবা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কোনও না কোনও বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের নামে৷ আপাতত ছোবলটা এল মাওবাদীদের দিক থেকে, এর পর আবারও হয়তো ফুঁসে উঠবে কাশ্মীরের ‘স্বাধীনতা সংগ্রামী’রা৷

এদেশের অভ্যন্তরীণ দফতরের মাথায় রাখা উচিত, দাউদ ইব্রাহিমের নেটওয়ার্কের এখনও একটি বড় ঠিকানা হল নেপাল৷ কিছু দিন আগেই ভারত-নেপাল সীমান্তে ডি কোম্পানির একজন বড়সড় হাওয়ালা অপারেটর ধরা পড়েছে৷ সুকমার ঘটনা দেখিয়ে দিল, একটা-দুটো মাছ তুলে আত্মশ্লাঘার কোনও অবকাশ নেই৷ দিনরাত সতর্ক থাকা দরকার৷ ভারতেরই খেয়েপরে ভারতবিরোধী পঞ্চম বাহিনীর বংশবিস্তারের কমতি আগেও ছিল না, এখনও নেই৷ আরও দুঃখের বিষয়, এদেশের শাসন ও নিরাপত্তা কাঠামোরই নানা খোপে তারা বাসা বেঁধে আছে৷ নানা নামে, নানা রংয়ে৷ কোনও পলিটিক্যাল কিংবা কালচারাল উইচহান্ট চালিয়ে এদের নাগাল পাওয়া ভার৷ এরা সব ‘মগ্ন মৈনাক’!

সব থেকে যেটা চিন্তার সেটা এই যে, বিভিন্ন ঘটনার সূত্রে এদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্ন স্তরে নৈতিক বল ক্রমেই ক্ষয়ে চলেছে৷ সামরিক ও আধা-সামরিক জওয়ানদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে ফের বাড়ছে৷ ঊর্ধ্বতন অফিসারদের আচার-আচরণ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ্যে ফুটে বের হচ্ছে৷ এটা কিন্তু মোটেই ভালো লক্ষণ নয়৷ এর উপর তারা যদি দেখতেই থাকে যে, তাদের জীবনের মূল্যে স্রেফ লাভ হচ্ছে পলিটিশিয়ানদের, তার পর দেশনেতাদের মর্যাদার ব্যাপারে তারা আর কী তেমন মাথা ঘামাবে? এদেশের পলিটিশিয়ানরা চাইছেনটা কী, আর একটি সিপাহি বিদ্রোহ?

 

----
--