গেরুয়া অ্যাকশনের ফাঁদে পা দিয়ে তৃণমূলের অন্দরেই তীব্র মতান্তর

দেবযানী সরকার, কলকাতা: ভোট বড় বালাই! চৌকাঠে হাজির পঞ্চায়েত নির্বাচন৷ অগত্যা, রামনবমীকে কেন্দ্র করে রাজ্যের হিন্দুত্ব ভোটে বিজেপির এককভাবে থাবা বসানোর প্রচেষ্টাকে রুখতে এবারই প্রথম নজিরবিহীনভাবে দলনেত্রীর নির্দেশে বাংলার মাটিতে রামনবমী কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ নিয়েছিল শাসকশিবির৷

পাল্টা হিসেবে রণংদেহী মূর্তি ধারণ করে গেরুয়া শিবির৷ যার নিটফল: আসানসোল, রানিগঞ্জ সহ কয়েকটি এলাকায় সোমবারের হিংসার রেশ অব্যহত ৪৮ ঘণ্টা পরেও৷ ইতিমধ্যে ঝরেছে ২টি প্রাণ৷ বোমার ঘায়ে একটি হাত উড়ে গিয়েছে এক পুলিশ আধিকারিকের৷ তপ্ত রাজ্য রাজনীতি৷ বুধবারও উত্তেজনা রয়েছে আসানসোলে৷ বেশ কিছু এলাকায় প্রশাসনের তরফে জারি করা হয়েছে-১৪৪ ধারা৷

আরও পড়ুন: খোলা আকাশের নিচেই চলছে মিড ডে মিল খাওয়া

ওয়াকিবহাল মহলের মতে, রাম নবমীকে কেন্দ্র করে হিন্দি বলয়ের সংস্কৃতিকে আঁকড়াতে গিয়ে শাসক বনাম গেরুয়ার আকচাআকচির জেরে ধাক্কা খেয়েছে বাংলার বাঙালিয়ানা৷ যার জেরে প্রশ্নের মুখে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি৷ শুধু তাই নয়, গেরুয়া ‘টোপে’ কেন পা দিয়ে নিজেদের মুখ পোড়ানো হল- তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে শাসকের অন্দরেও৷

তৃণমূলের শিক্ষক সেলের নেতা বিজন সরকার খোলাখুলি বলছেন, ‘‘আমাদের বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে রামনবমী বেমানান৷ ছোটবেলা থেকে আমরা এই সংস্কৃতি দেখেনি৷ বিজেপি এটাকে আমদামি করে বাংলায় চাপিয়ে দিতে চাইছে৷ আর আমরা (তৃণমূল) বিজেপির পাতা সেই ফাঁদে পা দিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়লাম! এটা দুর্ভাগ্যজনক৷’’ খানিক থেমে তাঁর সংযোজন, ‘‘এটা আমাদের বাংলার সংস্কৃতি নয়৷ অন্নপূর্ণা পুজো, বাসন্তি পুজোয় গুরুত্ব দিতে পারত তৃণমূল৷ বাঙালির সংস্কৃতির প্রতি আমাদের আরও শ্রদ্ধাশীল হওয়া প্রয়োজন৷ তাতে দল ও বাংলারই ভালো হবে৷’’

আরও পড়ুন: সংরক্ষণের সার্টিফিকেট নকল করলেই ৩ বছরের জেল

একান্ত আলাপচারিতায় শাসকদলের কলকাতার এক বর্ষীয়ান নেতার অকপট স্বীকারোক্তি, “যেকোনও অ্যাকশনের রি-অ্যাকশন হলেই তার ফল খারাপ হয়৷ এক্ষেত্রেও আমরা একই অভিজ্ঞতার সাক্ষী হলাম৷ এমনটা না হওয়ায় বাঞ্ছনীয় ছিল৷’’ বলছেন, ‘‘রামনবমী নিয়ে প্রতিযোগিতায় নামতে গিয়ে আমরাই তো বিজেপিকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেললাম৷ এসব না করলেও বাংলার মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে থাকবে৷’’ খানিক থেমে আক্ষেপের সুরে বলেছেন, ‘‘তবে দলের নির্দেশ ছিল৷ কিন্তু কলকাতায় আমাদের সেভাবে রামনবমী পালন হয়নি৷ যে জায়গাগুলোতে বিজেপির ভোট বেড়েছে বা সংগঠন বেড়েছে বা যেখানে হিন্দি ভাষাভাষি মানুষের সংখ্যা বেশি, সেখানেই আমাদের রামনবমী বড় করে পালন হয়েছে৷”

সোমবারের রামনবমীর রেশ অব্যহত বুধবারেও৷ শাসক বনাম গেরুয়া শিবিরের এহেন রেষারেষিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহল থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া উঠে এসেছে৷ ওয়াকিবহাল মহলের মতে, রাজ্যের শাসনভার যেহেতু শাসকের হাতে, তাই তাঁদের আরও সংযত হওয়া উচিত ছিল৷ তাঁরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, রামনবমী নিয়ে গত বছর রাজনীতির মঞ্চে নজর কেড়েছিল বিজেপি ৷ যার সমালোচনা করতে ছাড়েনি তৃণমূল৷ কিন্তু এবছর তাঁরাই বিজেপির দেখানো পথে হেঁটে কার্যত ব্যুমেরাং হল৷ এমনকি কোথাও কোথাও টেক্কাও দিয়েছে গেরুয়া শিবিরকে৷ যা দেখে দলের নেতা কর্মীদের একাংশের বক্তব্য, এভাবে হিন্দি বলয়ের সংস্কৃতিকে আঁকড়ে হিন্দুত্বের প্রমাণ দেওয়ার চেষ্টা – বাঙালিদের কাছে ভুল বার্তা দিচ্ছে৷ যা তৃণমূলের পক্ষে বিপজ্জনক৷

আরও পড়ুন: প্রায় দেড় লক্ষ পড়ুয়ার কোনও জাত-ধর্ম নেই: শিক্ষামন্ত্রী

তৃণমূলের উত্তর ২৪ পগরণার পর্যবেক্ষক নির্মল ঘোষ মেনে নিয়েছেন, ‘বাধ্য’ হয়েই তৃণমূলকে রামনবমী পালন করতে হয়েছে৷ তাঁর কথায়, ‘‘এটা ঠিকই আমরা যেমন লক্ষী পুজো, শীতলা পুজো, দুর্গাপুজো করি সেভাবে অতীতে কোনওদিন রামনবমী পালন করিনি৷ একদল লোক রাজ্যে এটাকে সামনে রেখে হাঙ্গামা তৈরি করছে৷ ওরা যাতে বাংলার মানুষের কোনও ক্ষতি করতে না পারে, তাই বাধ্য হয়েই আমরা এই কর্মসূচি পালন করছি৷ তবে আমার বিধানসভা কেন্দ্রে পাঁচটি বাসন্তি পুজো হয়েছে৷ সেখানেও আমরা ছিলাম৷”

যদিও তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় যাবতীয় দায়ভার বিজেপির ঘাড়ে চাপিয়ে বলেছেন, ‘‘রাজ্যের মানুষ দেখেছেন- কারা অশান্তি পাকিয়েছে এবং এখনও প্রতি মুহূর্তে অশান্তি পাকানোর চেষ্টা করছে৷ পুলিশ প্রশাসন যথাসাধ্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে৷’’ সুযোগ বুঝে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সিপিএমের বিধানসভার পরিষদীয় দলনেতা সুজন চক্রবর্তী, ‘‘বিজেপি কিংবা তৃণমূল- এদের মধ্যে কোনও ফারাক নেই৷ ধর্ম বা ভক্তির জন্য নয়, এরা রামনবমী পালন করে সাম্প্রদায়িকতার সুড়সুড়ানি দেওয়ার জন্য৷ সোমবারের কয়েকটি ঘটনা থেকেই স্পষ্ট, এরা রামনবমীকে কেন্দ্র করে রাজনীতির তাস খেলছে৷ বাংলার মানুষ সব দেখছেন৷ তাঁরাই এর জবাব দেবেন৷”

আরও পড়ুন: রাজ্যে হিংসার ঘটনায় মমতার সরকারকে রিপোর্ট তলব কেন্দ্রের

বিজেপির সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার সুড়সুড়ানির একই বন্ধনীতে নাম জড়িয়ে যাওয়ায় রামকে কেন্দ্র করে শাসকের বিড়ম্বনা বেড়েছে৷ দলের অন্দরের মতান্তর থেকেই তা স্পষ্ট৷

----
-----