‘চিকিৎসায় উন্নয়নের নামে ভাঁওতা দিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী’

‘পরিবর্তনে’র সরকারের আমলে কলকাতার আইপিজিএমইআর৷ ফাইল ছবি৷

বামফ্রন্ট পরিচালিত ৩৪ বছরের সরকার৷ আর, তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত পাঁচ বছরের সরকার৷ কোন আমলে কীভাবে, কতটা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি চিকিৎসা পরিষেবার মানোন্নয়ন? গত পাঁচ বছরে আদৌ কি উন্নত হয়েছে? না, পিছিয়ে পড়েছে এ রাজ্যের সরকারি চিকিৎসা পরিষেবা এবং চিকিৎসা-শিক্ষা? পশ্চিমবঙ্গের সরকারি চিকিৎসকদের সংগঠন সার্ভিস ডক্টরস ফোরাম (এসডিএফ)-এর সাধারণ সম্পাদক সজল বিশ্বাসের সঙ্গে www.kolkata24x7.com-এর প্রতিনিধি বিশ্বজিৎ ঘোষের কথোপকথনে প্রকাশ পেল বিভিন্ন বিস্ফোরক তথ্য৷

dr.s.biswas
এসডিএফের সাধারণ সম্পাদক ডাক্তার সজল বিশ্বাস৷

পশ্চিমবঙ্গে ২০১১-য় ‘পরিবর্তনে’র সরকারে রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতর নিজের অধীনেই রেখেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ যদিও, বিভিন্ন সময় বিরোধীদের বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়ার জেরে, শেষ পর্যন্ত চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে স্বাস্থ্য দফতরের প্রতিমন্ত্রী করা হয় বলে বিভিন্ন মহলের দাবি৷ পরে, অবশ্য আয়ুষ দফতরের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী করা হয় আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়কে৷ তবে, স্বাভাবিক ভাবেই রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে সিলমোহর দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী৷ এবং, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে মুখ্যমন্ত্রী এমন বলেছেন, বামফ্রন্টের ৩৪ বছরে এ রাজ্যের সরকারি চিকিৎসা পরিষেবা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে৷ আর, তাঁর আমলেই সরকারি চিকিৎসা পরিষেবার মানোন্নয়ন ঘটেছে৷ ‘পরিবর্তনে’র সরকারের মন্ত্রিসভার বিভিন্ন সদস্য অথবা তৃণমূল কংগ্রেসের চিকিৎসকদের সংগঠনের বিভিন্ন নেতা কিংবা দলের বিভিন্ন নেতা-কর্মীও বিভিন্ন সময় মুখ্যমন্ত্রীর ওই ধরনের দাবির মতোই মত ব্যক্ত করেছেন৷ কিন্তু, বাস্তব চিত্র কী ধরনের…?

প্রশ্ন: বামফ্রন্ট পরিচালিত ৩৪ বছরের সরকার আর তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত পাঁচ বছরের সরকার৷ কোন আমলে কতটা উন্নত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি চিকিৎসা পরিষেবার মান?
উত্তর: সরকারি চিকিৎসা পরিষেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট এবং পাঁচ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত সরকারের মধ্যে যেমন মিল রয়েছে, তেমনই অমিলও রয়েছে৷ তবে, কোন আমলে কীভাবে, কতটা উন্নত হয়েছে সরকারি চিকিৎসা পরিষেবার মান, সেই বিষয়টি পরিকাঠামোগত বিভিন্ন ক্ষেত্রের বাস্তব পরিস্থিতির উপর নির্ভরশীল৷ ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট আমলের শেষে যেমন ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে পরিকাঠামোগত খামতি থেকে গিয়েছিল৷ তেমনই, পাঁচ বছরের তৃণমূল কংগ্রেসের আমলের শেষেও পরিকাঠামোগত খামতি ৫০ শতাংশেই রয়ে গিয়েছে৷ কোনও কোনও ক্ষেত্রে পরিকাঠামোগত খামতি গত পাঁচ বছরে আরও বেড়েও গিয়েছে৷

- Advertisement -

প্রশ্ন: এখনও পর্যন্ত কোন কোন ক্ষেত্রে পরিকাঠামোগত খামতি ৫০ শতাংশেই রয়ে গিয়েছে? তা হলে, ৩৪ বছরের মতো গত পাঁচ বছরেও পশ্চিমবঙ্গের সরকারি চিকিৎসা পরিষেবার মান একই স্থানে রয়ে গিয়েছে…?
উত্তর: সরকারি চিকিৎসা পরিষেবার নিচের স্তরে রয়েছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র৷ মাঝের স্তরে রয়েছে স্টেট জেনারেল হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল৷ এই দুই স্তরে আগেও যেমন ছিল, এখনও তেমনই রয়েছে৷ অর্থাৎ, পরিকাঠামোগত ক্ষেত্রে এই দুই স্তরে এখনও ৫০ শতাংশ খামতি-ই রয়ে গিয়েছে৷ এই সব খামতির মধ্যে যেমন রয়েছে লোকবল অর্থাৎ, ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা৷ তেমনই রয়েছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্র-হাসপাতালের বেড সংখ্যা থেকে শুরু করে চিকিৎসা-যন্ত্র এবং চিকিৎসা পরিষেবা প্রদানের জন্য আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয়ও৷

ভোর কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী জেলা স্তরের প্রতিটি হাসপাতালে ২,৫০০-র বেশি বেড থাকার কথা৷ যে কারণে, জেলাস্তরের হাসপাতালগুলিতে বেড বাড়ানোর কথা বলা হলেও, এখনও ১০ শতাংশ খামতি রয়েই গিয়েছে৷ ভারতের জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ভোর কমিটি পায়োনিয়র৷ অথচ, তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত সরকারের আমলে যে সব পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, তার জন্য যেমন কোনও প্ল্যানিং কমিশন বসানো হয়নি৷ তেমনই, ভোর কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী পরিকাঠামোগত খামতিও পূরণ করা হয়নি৷

প্রশ্ন: মুখ্যমন্ত্রী যে বিভিন্ন সময় বলছেন সরকারি হাসপাতালের বেড সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে…?
উত্তর: এই পাঁচ বছরে সরকারি হাসপাতালে ৭৫ হাজার বেড বাড়ানো হয়েছে বলে সাধারণ মানুষকে ভাঁওতা দিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷

প্রশ্ন: কেন!! কীভাবে!!
উত্তর: সিক নিউবর্ন কেয়ার ইউনিট (এসএনসিইউ) এবং আইসিইউ অথবা আইসিসিইউ মিলিয়ে কত সংখ্যক বেড-ই-বা বাড়ানো হয়েছে এই পাঁচ বছরে? এই দুই ক্ষেত্রে হাতে গোনা সংখ্যক বেড বেড়েছে৷ মুখ্যমন্ত্রী ভাঁওতা দিচ্ছেন৷ কারণ, আগে থেকেই প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে ছ’টি করে বেড থাকার কথা রয়েছে৷ অথচ, রাজ্যের ৯০১টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যে ছ’টি করে বেড থাকার কথা, সেই সব বেডকে ধরেই বলা হচ্ছে ৭৫ হাজার বেড বেড়েছে৷

আগের সরকারের আমলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির ওই সব বেডকে মোট বেডের সঙ্গে গোনা হত না৷ যে কারণে, এই সরকারের আমলে বেডের সংখ্যা অনেক বেশি বাড়ানো হয়েছে বলে জানানো হচ্ছে৷ তবে, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির ওই সব বেডকে ধরে বৃদ্ধির সংখ্যা ৭৫ হাজার বলা হলেও, ওই সব বেড কিন্তু এখনও কার্যক্ষেত্রে দেখা-ই যায় না৷ আগের সরকারের আমলেও কার্যক্ষেত্রে দেখা যেত না ওই সব বেড৷

প্রশ্ন: সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, এসএনসিইউ, এসএনএসইউ (সিক নিউবর্ন স্টেবিলাইজেশন ইউনিট), মাদার অ্যান্ড চাইল্ড হাব, আইসিইউ অথবা আইসিসিইউ চালুর মাধ্যমেও কি তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত সরকারের আমলে চিকিৎসা পরিষেবার মানোন্নয়ন ঘটেনি?
উত্তর: বামফ্রন্ট আমলের প্রথম থেকেই এসএনসিইউ-এর কনসেপ্ট ছিল না৷ কাজেই, ৩৪ বছরে মাত্র ক’টি এসএনসিইউ চালু হয়েছে, আর, এই পাঁচ বছরে ক’টি চালু হয়েছে, তার মধ্যে তুলনা কীভাবে যুক্তিসঙ্গত হতে পারে? এসএনসিইউ-এর কনসেপ্ট আসার পরে বামফ্রন্ট পরিচালিত সরকারের আমলের শেষের দিকে অসুস্থ নবজাতকদের চিকিৎসার জন্য এই পরিষেবা চালু হতে থাকে৷ একই সঙ্গে এই বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, গত পাঁচ বছরে সংখ্যায় অনেক বেশি এসএনসিইউ চালু হয়েছে ঠিক-ই৷ কিন্তু, চালু হওয়া ওই সব ইউনিটেও পরিকাঠামোগত বিভিন্ন ধরনের খামতি রয়ে গিয়েছে৷ যেমন, এসএনসিইউগুলিতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীর খামতি রয়েছে৷ তেমনই, যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীর খামতিও রয়েছে৷

এসএনসিইউ, এসএনএসইউ-এর মতো আইসিইউ অথবা আইসিসিইউ কিংবা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালগুলির ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি অর্থাৎ, পরিকাঠামোগত বিভিন্ন ধরনের খামতি রেখেই এই সব পরিষেবা চালু করে দেওয়া হয়েছে৷ তার উপর, তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত সরকারের আমলে এই সব নতুন পরিষেবা চালু হলেও, সে সবের জন্য কোনও প্ল্যানিং কমিশনও বসানো হয়নি৷ যে কারণে, কোন স্তরে, কেন এই ধরনের পরিষেবা চালু হচ্ছে অর্থাৎ, উদ্দেশ্য কী এবং সে সবের রূপায়ণও সুপরিকল্পিত ভাবে হয়নি৷ সব মিলিয়ে, লোকবল এবং পরিকাঠামোগত অন্যান্য খামতি সঙ্গে নিয়েই চালু হওয়া এই সব নতুন পরিষেবার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের বেসিক নিডস-ই পূরণ হচ্ছে না৷ কীভাবে পরিষেবার সুফল পাবেন সাধারণ মানুষ, সে সব বিষয়ে নজর না দিয়ে শুধুমাত্র ঝাঁ-চকচকে এবং কাচের ঘর করে কী লাভ?

প্রশ্ন: সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ অর্থাৎ, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে রাজ্যে তিনটি মেডিকেল কলেজ চালুর কথা বিভিন্ন সময় বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী৷ তার উপর, মেডিকেল কলেজগুলিতে এমবিবিএসের সিটের সংখ্যাও বেড়েছে…
উত্তর: বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে পড়ুয়াদের জন্য সিট বাড়ানো হয়েছে ঠিকই৷ কিন্তু, শুধুমাত্র সিট বৃদ্ধির বিষয়টিকে উন্নয়ন হিসেবে ধরা যাচ্ছে না৷ কারণ, পঠনপাঠনের জন্য পরিকাঠামোগত বিভিন্ন খামতি যেমন সিট সংখ্যা বাড়ানোর আগেই ছিল, তেমনই ওই সব খামতি পূরণও করা হয়নি৷ যে কারণে, সিট সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য আসলে পরিকাঠামোগত ওই খামতি আরও বেড়ে গিয়েছে৷

প্রশ্ন: কীভাবে…? তা হলে, পশ্চিমবঙ্গের মেডিকেল এডুকেশনও কি ক্ষতিগ্রস্ত?
উত্তর: এমবিবিএসের সিট সংখ্যা বাড়ানো হলেও শিক্ষক-চিকিৎসকদের পদের সংখ্যা বাড়ানো হয়নি৷ আগে এমনীতেই এই পদগুলিতে শিক্ষক-চিকিৎসকের খামতি ছিল৷ অথচ, আগের ওই খামতিই এখনও পূরণ করা হয়নি৷ তার সঙ্গে রয়েছে পরিকাঠামোগত অন্যান্য খামতিও৷ যে সব কারণে, মেডিকেল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া (এমসিআই) থেকে প্রতি বছরই ওই সব বর্ধিত সিট বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে৷ আর, তার পরে আবার শর্তাধীনে এক বছরের জন্য সংশ্লিষ্ট সিটগুলির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারও করে নিচ্ছে এমসিআই৷

সব মিলিয়ে, সিট সংখ্যা বাড়ানো হলেও পরিকাঠামোগত বিভিন্ন ধরনের খামতি পূরণ না হওয়ায়, স্বাভাবিক ভাবেই, এমবিবিএসে শিক্ষার মান আরও নেমে যাচ্ছে৷ পাঁচ বছরে নতুন কোনও সরকারি মেডিকেল কলেজও চালু হয়নি৷ শুধুমাত্র বেসরকারি উদ্যোগে একটি এবং ভারত সরকারের শ্রমমন্ত্রকের অধীনে ইএসআই জোকায় চালু হয়েছে এমবিবিএসের পঠনপাঠন৷

প্রশ্ন: আর, নীতিগত ক্ষেত্রে অর্থাৎ, ৩৪ আর পাঁচ বছরের মধ্যে সরকারি পলিসির কোনও ফারাক…?
উত্তর: সরকারি চিকিৎসা পরিষেবা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছচ্ছে কি না, সাধারণ মানুষ পরিষেবার সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন কি না, তাঁরা উপকৃত হচ্ছেন কি না, এই সব বিষয়ই আসল উদ্দেশ্য৷ অথচ, বামফ্রন্ট আমলেও যে ধরনের নীতি ছিল, তৃণমূল কংগ্রেসের আমলেও সেই একই ধরনের নীতি রয়েছে৷ অর্থাৎ, ৩৪ বছর আর পাঁচ বছরের মধ্যে সরকারি চিকিৎসা পরিষেবায় সেভাবে নীতিগত কোনও পার্থক্য নেই৷

প্রশ্ন: কোন নীতির কথা বলছেন…?
উত্তর: সরকারি চিকিৎসা পরিষেবায় বেসরকারীকরণের নীতি৷ ২০ বছর আগে পিপিপি মডেলের মাধ্যমে বেসরকারীকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল৷ যে কারণে, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের পথ্য, হাসপাতালের নিরাপত্তা সহ অন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেসরকারীকরণ হয়েছে৷ অথচ, আগের আমলের এই সব বিষয় এখনও যেমন রয়ে গিয়েছে৷ তেমনই, গত পাঁচ বছরে আরও বেড়ে গিয়েছে বেসরকারীকরণের প্রক্রিয়া৷ যার মধ্যে অন্যতম ন্যায্যমূল্যের ওষুধের দোকান এবং রোগনির্ণয় কেন্দ্র৷ সাধারণ মানুষের অনেকেই মনে করছেন, ন্যায্যমূল্যের ওষুধের দোকান আর রোগনির্ণয় কেন্দ্রে অনেক কম দামে ওষুধ কেনা এবং রোগনির্ণয় হচ্ছে৷ আপাত ভাবে এই ধরনের বিভিন্ন পরিষেবাকে উন্নয়ন বলে মনে হতে পারে৷ কিন্তু, আসলে এ সব কোনও উন্নয়ন-ই নয়৷

প্রশ্ন: কেন?
উত্তর: কারণ, এটা প্রমাণিত যে, নিম্নমানের ওষুধের প্যাকেটে অনেক বেশি দাম ছাপিয়ে, সেই দামের উপর অনেক বেশি ছাড় দিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে ন্যায্যমূল্যের ওষুধের দোকানে৷

প্রশ্ন: ন্যায্যমূল্যের দোকানে বিক্রি হওয়া ওষুধের নমুনা পরীক্ষার কথাও বলা হয়েছিল…
উত্তর: কীভাবে হবে? আমাদের রাজ্যে কোনও পরীক্ষাগারই তো নেই৷ আর, অন্য পরীক্ষাগারে নমুনা পাঠানো হলে, সেখান থেকে রিপোর্ট আসতে আসতে চার-পাঁচ মাস, কোনও কোনও ক্ষেত্রে আবার এক থেকে দুই বছরও লেগে যায়৷ এই ধরনের পরিস্থিতিতে, যদি কোনও ব্যাচের ওষুধের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়, তা হলে ওই ব্যাচের ওষুধ বিক্রি হয়ে যাওয়ার আগে রিপোর্টও আসবে না৷ তা হলে, কীভাবে ন্যায্যমূল্যের দোকানে বিক্রি হওয়া ওষুধের গুণমান বজায় থাকবে? ওষুধের গুণমানের উপর নজরদারির জন্য পশ্চিমবঙ্গে ড্রাগ ইন্সপেক্টরের খামতিও রয়েছে৷

প্রশ্ন: হাসপাতাল থেকে ফ্রি ওষুধ দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে৷ ফ্রি ওষুধ দেওয়ার ব্যবস্থা আগেও ছিল৷ এ দিকে, হাসপাতাল থেকে যখন ফ্রি ওষুধই দেওয়া হচ্ছে, তখন আর ন্যায্যমূল্যের ওষুধের দোকান কেন?
উত্তর: ন্যায্যমূল্যের ওষুধের দোকান চালুর পরে হাসপাতালের ফ্রি ওষুধের কাউন্টার কার্যত বন্ধই করে দেওয়া হয়েছে৷ আর, হাসপাতাল থেকে ফের ফ্রি ওষুধ দেওয়া হবে বলে ঘোষণার পরেও হয় ফ্রি কাউন্টারে অধিকাংশ ওষুধ থাকছে না৷ না হয়, কাউন্টার নেই৷ অথবা, ২৪ ঘন্টার জন্য কাউন্টার খোলাই থাকছে না৷ অন্যদিকে, ন্যায্যমূল্যের ওষুধের দোকান থেকে নিম্নমানের ওষুধ কিনে ফ্রি-তেও দেওয়া হচ্ছে৷ ফলে যে সব ন্যায্যমূল্যের দোকান বন্ধ হতে বসেছিল, সেই সব দোকান ফের ব্যবসা করছে৷ হাসপাতালের অন্তর্বিভাগ এবং বহির্বিভাগের রোগীদের জন্য যখন ফ্রি-তে ওষুধ দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তখন ন্যায্যম্যূল্যের ওষুধের দোকান থাকবে কেন? আসলে, এ ভাবে ওষুধ ব্যবসায়ীদের মুনাফার পথ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে৷

প্রশ্ন: বলা হচ্ছে, ওষুধের সঙ্গে চিকিৎসাও ফ্রি৷ পেয়িং বেডের ক্ষেত্রে ফ্রি ছিল না চিকিৎসা৷ কিন্তু, সত্যিই কি সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা ফ্রি হয়েছে? কতটা?
উত্তর: সরকারি নির্দেশে একদিকে যেমন বলা হচ্ছে হাসপাতালের পরিষেবা ফ্রি৷ তেমনই, ওই নির্দেশেই আবার বলা হচ্ছে, পিপিপি মডেলের রোগনির্ণয় এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার কেন্দ্রগুলির পরিষেবা ফ্রি নয়৷ তা হলে, কীভাবে সরকারি চিকিৎসা পরিষেবা ফ্রি হল? কেননা, রোগনির্ণয়, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ওষুধের জন্যই চিকিৎসার মোট খরচের ৮০-৯০ শতাংশ ব্যয় হয়ে যায়৷

তা হলে, যে হাসপাতালে পেয়িং বেড ছিল, সেই বেডের জন্য ২০-৫০ টাকা খরচ না দেওয়ার মাধ্যমে কীভাবে সরকারি হাসপাতালে ফ্রি চিকিৎসায় উপকৃত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ? তার উপর, বেড না পেয়ে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা অথবা কোনও অস্ত্রোপচারের জন্য অনেক দেরিতে ডেট পেয়ে কীভাবে সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালের ফ্রি চিকিৎসায় উপকৃত হচ্ছেন? সরকারি হাসপাতালের ফ্রি চিকিৎসার ঘোষণার মাধ্যমে মিথ্যাচার করছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়৷ এই ভাবে সাধারণ মানুষের সঙ্গে অন্যায় করছে রাজ্য সরকার৷

প্রশ্ন: চালু হওয়া সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালগুলি কি আদৌ সুপার স্পেশালিটি…?
উত্তর: চালু হওয়া ওই সব সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে আপৎকালীন বিভাগ-ই তো নেই৷ কাজেই, সুপার স্পেশালিটি পরের প্রশ্ন, কিন্তু, কীভাবে আপৎকালীন বিভাগ ছাড়া কোনও চিকিৎসা কেন্দ্রকে হাসপাতাল বলা যায়? এই গুলি কোনও মতেই সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল হতে পারে না৷ তার উপর, বলা হচ্ছে, এই সব সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে বহির্বিভাগ চালু হয়েছে৷ কিন্তু, প্রতিটি বিভাগের বহির্বিভাগ যেমন চালু হয়নি, তেমনই, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও নেই৷ এই সব সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালকে খুব বেশি হলে পলিক্লিনিক বলা যেতে পারে৷ সাধারণ মানুষ যদি উপকৃত না হন, তা হলে শুধুমাত্র হাসপাতালের জন্য বিল্ডিং আর কাচের ঘর দাঁড় করিয়ে কীভাবে সরকারি চিকিৎসা পরিষেবার মানোন্নয়ন হয়েছে বলে দাবি করা যায়?

প্রশ্ন: সরকারি মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালগুলিতে শিক্ষক-চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, চিকিৎসক এবং নার্সদের খামতির বিষয়টি কেমন…?
উত্তর: এ রাজ্যের সরকারি মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালগুলি মিলিয়ে এখনও ৩০ শতাংশ করে চিকিৎসক অর্থাৎ, মেডিকেল অফিসার এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের খামতি রয়েছে৷ অন্যদিকে, শিক্ষক-চিকিৎসকের খামতি রয়েছে ৪০-৫০ শতাংশ৷ এ সব খামতি অবশ্য ২০ বছর আগের তৈরি পদ অনুযায়ী৷ কাজেই, বর্তমানের নিরিখে এই সব খামতি অন্তত তিন গুণ বেশি হবে৷ আর, ইন্ডিয়ান নার্সিং কাউন্সিলের নির্দেশ অনুযায়ী এ রাজ্যে এখন ৫০ শতাংশেরও বেশি সরকারি নার্সের খামতি রয়েছে৷

প্রশ্ন: মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এমন বলেছিলেন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)-এর মাধ্যমে চিকিৎসক নিয়োগের জন্য অনেক সময় লেগে যায়৷ তাই, বিশেষ করে চিকিৎসকদের দ্রুত নিয়োগের জন্য ওয়েস্ট বেঙ্গল হেলথ সার্ভিস রিক্রুটমেন্ট বোর্ড গঠনের কথা ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী৷ এই বোর্ড কতটা সফল?
উত্তর: পিএসসি-র থেকেও খারাপ অবস্থায় রয়েছে ওয়েস্ট বেঙ্গল হেলথ সার্ভিস রিক্রুটমেন্ট বোর্ড৷ নিয়োগের ক্ষেত্রে এই বোর্ড এখনও পর্যন্ত সেভাবে সাফল্য দেখাতে পারেনি৷ তার উপর, পিএসসির মাধ্যমে আগে যতটা নিয়মিত ভাবে চিকিৎসকদের নিয়োগের ব্যবস্থা হত, এই বোর্ডের মাধ্যমে সেই নিয়মিত প্রক্রিয়াও নেই৷

প্রশ্ন: মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালগুলিতেও সৌন্দর্যায়নের উপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে পাঁচ বছরের এই সরকার৷ এ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র যদি কলকাতার ইনস্টিটিউট অফ পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিকেল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (আইপিজিএমইআর) তথা এসএসকেএম হাসপাতালের কথাই ধরা হয়, তা হলে, সেখানে শুধুমাত্র সৌন্দর্যায়নের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে৷ স্থানীয় সংসদ সদস্য বাদেও অন্য সংসদ সদস্যও ৫০ লক্ষ টাকা করে সংসদ তহবিল থেকে দান করেছেন৷ অথচ, সারদাকাণ্ডে অভিযুক্ত প্রাক্তন মন্ত্রী মদন মিত্রর ‘চিকিৎসা’র জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে চিকিৎসা-যন্ত্র আনাতে হয়েছিল ওই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে৷ তা হলে, চিকিৎসা পরিষেবার মানোন্নয়নের জন্য সৌন্দর্যায়নের তুলনায় কি চিকিৎসা-যন্ত্র সহ পরিকাঠামোগত অন্যান্য খামতি পূরণের বিষয়টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ নয়?
উত্তর: পরিকাঠামোগত খামতি পূরণের বিষয়টি অবশ্যই অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়৷ যে কারণে, সব শেষে আসবে সৌন্দর্যায়নের বিষয়টি৷

প্রশ্ন: তা হলে, সরকারি চিকিৎসা পরিষেবায় ৩৪ বছরের বামফ্রন্টের সঙ্গে পাঁচ বছরের তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই…?
উত্তর: আগের আমলের শেষে ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে পরিকাঠামোগত খামতি ছিল৷ এই আমলের শেষেও ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে পরিকাঠামোগত খামতি রয়ে গিয়েছে৷ তবে পার্থক্য বলতে, এই পাঁচ বছরে পরিকল্পনাহীন ভাবে এসএনসিইউ, আইসিইউ অথবা আইসিসিইউ, সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের মতো নতুন নতুন পরিষেবা চালুর নাম করে আসলে ঝাঁ-চকচকে এবং কাচের ঘর দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে৷ পরিকাঠামোগত বিভিন্ন খামতির কারণে এই সব নতুন নতুন পরিষেবার কোনও কার্যকারিতাও নেই৷ কোনও উপকারিতাও নেই৷

নতুন এই সব পরিষেবার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আইওয়াশ করা হচ্ছে৷ এই সব বিষয় সাধারণ মানুষ এখনও বুঝতে পারছেন না৷ কিন্তু, যত দিন যাবে, গোটা বিষয়টি তত-ই স্পষ্ট হয়ে যাবে৷ তার উপর, এক সময় যখন এ সব আর সরকার চালাতে পারবে না, তখন দেখা যাবে বেসরকারি সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে৷ এ ভাবেও সরকারি চিকিৎসা পরিষেবায় বেসরকারীকরণের পথ আরও প্রশস্ত করে দেওয়া হচ্ছে৷ এর ফলে চিকিৎসার অধিকার হারাবেন সাধারণ মানুষ৷

সরকারি চিকিৎসা পরিষেবা ক্ষেত্রে কোনও সরকার-ই মানুষের কথা, উন্নয়নের কথা ভাবেনি৷ কোনও সরকারের আমলে জনমুখী স্বাস্থ্য বাজেট হয়নি৷ যে কারণে, পার্থক্য বলতে, বামফ্রন্ট আমলে যে হারে বেসরকারীকরণ হয়েছিল, তৃণমূল কংগ্রেসের আমলে সেই হার অনেক বেশি৷ বিভিন্ন পরিকল্পনার জেরে সরকারি চিকিৎসা পরিষেবা ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থার মুনাফা বৃদ্ধি হচ্ছে৷ অন্যদিকে, বেসরকারি নার্সিংহোম এবং হাসপাতালের শ্রীবৃদ্ধিও ঘটছে৷

_______________________________________________________________
আরও পড়ুন:

(০১) সরকারি মদতে নিষিদ্ধ ওষুধের ব্যবসা হাসপাতালে

(০২) ‘সারদার সত্যকে ধামাচাপা দিয়েছে মমতার সরকার’

(০৩) মমতা আইনের ঊর্ধ্বে কি না নিষ্পত্তি হবে সুপ্রিম কোর্টে

(০৪) এক ক্যুইজ মাস্টার আর বাংলার ‘সবুজ লাড্ডু’র কাহিনি

(০৫) ম্যালেরিয়া মুক্ত হচ্ছে ভুটান-চিন-নেপাল সহ ২১টি দেশ

(০৬) সারদা-নারদের সত্য এবং মদন বনাম মদন আর মিত্র

(০৭) সারদাকাণ্ডে এক সাংবাদিকের আত্মহত্যা এবং মিডিয়া

(০৮) সারদা ভিত্তি হলে বাংলার ভবিষ্যৎ তবে এখন নারদ!

(০৯) রাজ-‘কুৎসা’য় যায় যদি যাক প্রাণ হীরকের রাজা…!

(১০) বিপর্যয় মোকাবিলায় নিধিরাম মমতার ‘উন্নত’ দফতর

(১১) নিখোঁজ ছেলের সন্ধানে আইনের বদলে ভরসা ফেসবুক

(১২) ভালো কাজে মমতার পুরস্কারের বদলে দিতে হল ইস্তফা

(১৩) মুখ্যমন্ত্রীর ‘নজরে’ই চারমাস বন্ধ রে-পরিষেবা

(১৪) সেরা-মনোভাবেই অবহেলার শিকার পিজি-র রোগীরা

(১৫) অস্বস্তির ‘বলি’ পিজি-র অধিকর্তা চাইলেন ইস্তফা

(১৬) চিকিৎসায় ব্যর্থতা মানলেন তৃণমূলী বদ্যিরাই

_______________________________________________________________

Advertisement
-----