দেবময় ঘোষ, কলকাতা: ‘‘তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি…৷’’ গীতবিতান থেকে কবিগুরুকে উদ্ধৃত করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগামী দিনের ছাত্র নেতা-নেত্রীদের উদ্দেশ্যে যা বোঝাতে চেয়েছেন, তা তারা কতটা অনুধাবন করতে পারলেন, সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়েই গেল৷ তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবসের মঞ্চ থেকে মমতার ডাকেই গলা মিলিয়েছেন ছাত্রছাত্রীরা৷ চিৎকার করে তারা বলেছেন, ‘‘নবাগতদের কলেজে ভর্তি হতে সাহায্য করব, মাতৃভূমিকে সম্মান করব, জীবনে এগিয়ে চলব …৷’’

পড়ুন আরও- breakingNews: ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল বাংলা

Advertisement

ছাত্র রাজনীতি থেকে মাথা তুলেছিলেন মমতা৷ যে নেত্রীর রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে ছাত্র জীবনেই, তাঁর হাতে তৈরি পার্টির ছাত্র ইউনিটের মাথায় নেই সভাপতি বা সভানেত্রী! নতুন প্রজন্মকে ভরসা না করে তিনি দায়িত্ব দিলেন প্রাক্তন সভাপতিদের নিয়ে তৈরি এক কমিটিকে৷ মঙ্গলবার মেয়ো রোডের সভার সুর যেন সেই মুহূর্তে কিছুটা বেসুরো বেজেছে৷ যে নতুন প্রজন্মকে বিশ্বাস করেন না মমতা, হয়তো তাদের জন্যই তিনি উচ্চারণ করেছেন, তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি। তবে এদিনের মঞ্চ থেকে মমতার কন্ঠে যা ছিল অনুচ্চারিত, তা আরও ইঙ্গিতবাহী৷ তৃণমূল ছাত্র পরিষদের বর্তমান ইউনিটের জন্য তা বেশ যুক্তিযুক্তও৷ ‘‘…তোমার সেবার মহান দুঃখ সহিবারে দাও ভকতি।’’ মমতাও আজকের ছাত্র নেতাদের উদ্দেশ্যে সেই কথাই বলেছেন, ‘‘টাকার বিকল্প আছে৷ জীবনের বিকল্প নেই৷ রামকৃষ্ণ বলেছিলেন, টাকা মাটি মাটি টাকা৷’ টাকা দিয়ে চরিত্র নষ্ট করতে নেই৷ জীবনটা অনেক দিনের৷’’

পড়ুন আরও- মমতার দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে বাংলায় বাড়ছে আসাদুদ্দিনের AIMIM

স্মাতকস্তরে ভর্তি পক্রিয়া শুরু হওয়ার পর জেলায় জেলার টাকা তোলার খেলায় নেমেছিলেন ছাত্র নেতারা৷ ইতিহাসে ৪০ হাজার, ভূগোলে ৬০০০ হাজার, অঙ্ক, রসায়নে ৮০ হাজার দাম উঠেছে রাজ্যের কোণায় কোণায়৷ শহর কলকাতায় প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে টাকা হাতে নিয়ে ভর্তি শুরু হওয়ার পর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন৷ কান টানলেই মাথা আসে৷ তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সভানেত্রী হিসেবে শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের স্নেহধন্য ছিলেন জয়া দত্ত৷ ছাত্ররা হাত পেতে টাকা নিয়ে বিপদে ফেলেছিল জয়াকেও৷ মঙ্গলবার নিজের বক্তব্যে তাই জয়ার নাম একবারের জন্যও মুখে আনেননি মমতা৷ বরং মমতার মুখে উঠে এলো অশোক দেবের নাম৷ বললেন, সেই যখন ছাত্র পরিষদ করতাম অশোকদাই ছিলেন আমাদের নেতা৷ উঠে এলো বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়, তাপস রায়ের নাম৷ কমিটির এই সদস্যরাও পার্থ চট্টোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সুব্রত বক্সির সহায়তায় তৃণমূল ছাত্র পরিষদ চালাবেন৷ পরবর্তী সভাপতি নাম হয়তো সেপ্টেম্বরে জানা যেতে পারে৷

মমতার জীবনের রাজনৈতিক আদর্শ তৃণমূল ছাত্র পরিষদের আগামী প্রজন্ম কতটা আত্মস্থ করতে পেরেছেন, তা সময় বলবে৷ তবে নিজের বক্তব্যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি চুপ করে থাকতো, তবে আজও সিপিএমের বন্দুকের নলের তলায় বাঁচতে হত৷ তার দলের ছাত্র-ছাত্রীরা যে ঠিক পথে নেই, তা বোঝাতে মুখ্যমন্ত্রী দুই প্রবীণ শিক্ষাবিদের উদাহরণ দিয়েছেন৷ মঞ্চেই উপস্থিত ছিলেন নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী এবং সুগত মারজিৎ৷ মমতা বলেছেন, ‘‘আমার ডেডিকেটেড কর্মী চাই৷ যারা টাকার কাছে মাথা নত করবে না, যারা কুৎসার কাছে মাথা নত করবে না৷ উন্নততর চরিত্র গঠন করা প্রয়োজন৷ আজ ডেডিকেশনের খুব অভাব৷ তোমরা ডেডিকেটেড হও৷’’

নিজের বক্তব্যে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশংকর রায় এবং প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সী উল্লেখ করে বলেছেন, দু’জনেই তাঁর গুণমুদ্ধ ছিলেন৷ তাঁকে উৎসাহ দিয়েছেন৷ আজকের ছাত্রনেতাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘‘কাজ কর৷ কোরো না৷ নিজের কাজ কর৷ তোমার কাজই তোমাকে চেনাবে৷’’ তৃণমূল ছাত্র পরিষদের নেতা-নেত্রীরা কী নিজেদের চিনতে পারবে? নাকি মমতাকে এবার বলতে হবে, ‘‘…তোমার সেবার মহান দুঃখ সহিবারে দাও ভকতি।’’

----
--