দেশে বিদেশে শিক্ষক দিবসের কিছু কথা

ড: সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের (৫.৯.১৮৮৮- ১৭.৪.১৯৭৫) ছিলেন ভারতের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি (১৩.৫.১৯৫২-১২.৫.১৯৬২) এবং দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি(১৩.৫১৯৬২-১৩.৫১৯৬৭)৷ তিনি রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর দর্শনের এই অধ্যাপকের ছাত্র ছাত্রী  ও বন্ধুরা তাঁর জন্মদিন পালনের অনুমতি চান৷  তিনিই প্রস্তাব দেন যে তাঁর জন্মদিন  পালনের চাইতে সেই দিনটিকে শিক্ষক দিবস হিসেবে উৎযাপিত হোক৷ এখানে তাঁর শিক্ষক সত্তাটি যে তাঁর কাছে  সবচেয়ে অগ্রগণ্য তা প্রকাশ পায়৷

teacher
(অতিথি লেখক)
অধ্যাপক সব্যসাচী মুখোপাধ্যায়

কিন্তু ড: সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের জন্মদিন ৫সেপ্টেম্বর এদেশে শিক্ষক দিবস রূপে পালিত হলেও, এটি আন্তর্জাতিক শিক্ষক দিবস নয়৷ ৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক শিক্ষক দিবস রূপে চিহ্নিত করা হয়েছ ,যার সূচনা হয়েছিল১৯৯৪ সালে৷ ১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবরে ইউনেসকো’র দেওয়া শিক্ষকদের পদ মর্যাদা সম্পর্কে  কিছু সুপারিশ গৃহীত হয়েছিল আন্তর্জাতিক এক আলোচনায়৷ যার মাধ্যমে শিক্ষকদের  দায়িত্ব ও অধিকারের রূপরেখা প্রতিভাত হয়েছিল৷ সেইদিনটিকে স্মরণ করে এবং শিক্ষকদের অবদান ও শিক্ষার গুরুত্বকে স্বীকৃতি দিতেই বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রচলন৷ ১০০টিরবেশি দেশ ও এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল (শিক্ষকদের সংগঠন) অধীনস্ত বিশ্বব্যাপী ৪০০টির বেশি সদস্য সংগঠন এই দিনটিকেই পালন করে থাকে৷
১৯৯৪ সালে বিশ্ব শিক্ষক দিবস ঘোষিত হয়েছে৷ তবে ভারতের মতো বহু দেশে স্থানীয় শিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্ব ও অবদানকে মাধায় রেখে অনেক আগে থাকতেই অন্য কোনও দিন শিক্ষক দিবস রূপে পালিত হত৷ সেক্ষেত্রে এদেশের মতো ওই সব স্থানেও পরবর্তী কালেও আগের মতোই  ওই বিশেষ  দিনেই শিক্ষক দিবস অপরিবর্তিত ভাবে পালিত হয়ে আসছে৷ ১৯১৫ সাল থেকে ডমিনিঙ্গো ফস্টিনো সারমিয়োন্টোর অবদানকে মাথায় রেখে তাঁর মৃত্যুদিন (১১.৯.১৮৮৮) অর্থাৎ ১১সেপ্টেম্বর আর্জেন্টিনায় শিক্ষক দিবস রূপে পালিত হয়ে আসছে ৷ আবার ১১টি দেশে ২৮ ফেব্রুয়ারি শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হয়৷ চিন, তাইওয়ানের মতো বেশ কিছু দেশে কনফুসিয়াসের জন্মদিন ২৮ সেপ্টেম্বর  শিক্ষক দিবস হিসেবে গণ্য করা হয়৷ তাছাড়া তাইওয়ানে শিক্ষক দিবস জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়৷ এদিকে আবার এল স্যালভেডরে ২২জুন শিক্ষক দিবসের দিনটি জাতীয় ছুটির স্বীকৃতি পেয়েছে৷ তবে রাশিয়া সহ কয়েকটি দেশে শিক্ষক দিবস পালন করা হত অক্টোবর মাসের প্রথম রবিবার৷ কিন্তু আন্তর্জাতিক শিক্ষক দিবসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এখন ওইসব দেশে ৫অক্টোবর পালন করা হচ্ছে৷
কথায় বলে ভারতবর্ষ গুরুদের দেশ৷ গুরু দক্ষিণার নাম করে কখনও কখনও গুরুরা এমন কিছু চেয়ে ফেলেন যা মেটাতে গিয়ে নি:স্ব হতে হয় শিষ্যকে৷ পুরানেই এমন উদাহরণ রয়েছে৷ কারণ দোণাচার্যের একলব্যের কাছে তাঁর বুড়ো আঙুল কেটে গুরু দক্ষিণা চাওয়ার কথা কারও অজানা নয়৷ এ যুগেও কোনও কোনও শিক্ষক নানা রকম দামী উপহার চেয়ে বসেন তাঁর ছাত্রদের কাছে৷ আর তা রুখতে বেশ কিছু স্কুল কলেজে শিক্ষক দিবসে বিজ্ঞপ্তিও জারি করা হয়, যাতে বলা হয় – কেউ যেন কোনও শিক্ষককে উপহার না দেয়৷ অর্থাৎ  শিক্ষক দিবসকে কেন্দ্র করে একটা নেতিবাচক দিকের আশংকাও থেকে যাচ্ছে ৷ এই দিনে ছাত্র অথবা তাদের অভিভাবকদের মধ্যে শিক্ষককে উৎকচ স্বরূপ উপহার দিয়ে অনৈতিক ভাবে খুশি করারও একটা প্রবণতা দেখা যায় বলেও অভিযোগ ওঠে ৷ উদ্দেশ্য নাকি ছাত্রটির পরীক্ষায় ভাল ফলের নিশ্চয়তা৷ এদেশ বলে নয় এমন দুর্নীতির অভিযোগ দুনিয়ার নানা প্রান্তেই ওঠে৷ তা রুখতে দক্ষিণ কোরিয়ায় শিক্ষক দিবসে (১৫মে) স্কুল বন্ধ রাখা হয়৷
তবে, ভারতে বহু শতাব্দী ধরে গুরু পূর্ণিমার দিনটি শিক্ষক দিবস রূপে পালিত হত ৷ এখনও তা পালন করা হয়ে থাকে দেশের বেশ কিছু জায়গায়৷ বিশেষ করে হিন্দি বলয়ে  আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে  এবং শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও নৃত্যের ক্ষেত্রে যেখানে আজও গুরু-শিষ্য পরম্পরা বিরাজ করছে৷  প্রতিবেশি নেপালেও শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হয়ে থাকে আষাঢ় মাসের এই পূর্ণিমার দিনেই৷ কথিত আছে,মহাভারত রচয়িতা বেদব্যাস এই গুরু পূর্ণিমা তিথিতেই জন্মেছিলেন৷  তাই ব্যাসদেবের জন্মতিথি মনে রেখে ওই দিনটি আবার ব্যাসপূর্ণিমা বলেও পরিচিত৷ একথাও প্রচলিত রয়েছে – বুদ্ধদেব বোধিলাভের পর সারনাথে প্রথম ধর্মপ্রচার করেছিলেন এই তিথিতেই৷ আবার জৈনদের বিশ্বাস অনুসারে মহাবীর এই পূণ্য দিবসে প্রথম দীক্ষা দিয়েছিলেন৷
কলকাতাবাসী হিসেবে একটা গর্বের বিষয় রয়েছে ৫সেপ্টেম্বরকে ঘিরে৷দেশে শিক্ষক দিবস যে মানুষটির জন্মদিনে পালিত হচ্ছে সেই ড: সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়ে গিয়েছেন প্রায় বছর দশেক৷আবার এই ৫ সেপ্টেম্বর দিনটিকে ২০১৩ সাল থেকে রাষ্ট্র সংঘ  ‘ইন্টারন্যাশনাল ডে অফ চ্যারটি’ হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে৷ এই দিনটিকে বেছে নেওয়ার কারণ কলকাতার মাদার টেরিজার মৃত্যুদিন (৫.৯.১৯৯৭)৷ তাঁর জীবন এবং কাজকে সামনে তুলে ধরে মানুষকে দান করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে এই দিনটিকে বেছে নেওয়া হয়েছে৷ যার মূল কথা হল- মানুষকে সাহায্য করার জন্য অর্থ বা সময় দান করা৷ সেক্ষেত্রে অংকটা বড় কথা নয়, দানের মধ্য আবেগ বা ভালোবাসা কতটা রয়েছে সেটাই বিচার্য৷

Advertisement
---