তনুজিৎ দাস, কলকাতা: আদালতের যুদ্ধে রাজ্য সরকার হেরে গিয়েছে৷ যদিও রাজ্য সরকারের দাবি, ‘বিসর্জন-মহরম যুদ্ধে’ তারাই জিতেছে৷ তা বলে যুদ্ধের রেশ কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি৷ উমার কৈলাস ফেরাকে কেন্দ্র করে রাজ্য সরকার বনাম আদালতের যুদ্ধের আঁচে পুড়ছে তিলোত্তমার অনেক পুজো উদ্যোক্তারা৷ তাঁদের হাল কার্যত শাঁকের কড়াতের মতো৷

বিসর্জন ইস্যুতে রীতিমতো দ্বিধাবিভক্ত কলকাতার বিভিন্ন পুজো কমিটি৷ প্রতিমা অতিরিক্ত একদিন রাখার অর্থ অতিরিক্ত খরচ বৃদ্ধি৷ অন্যদিকে আদালতের রায় মেনে প্রতিমা নিরঞ্জন করলে সরকারের কোপের মুখে পড়ার আশঙ্কা৷ বিশেষ করে এই দুয়ের মাঝে পড়ে কার্যত খাবি খাচ্ছেন একাদশীতে বিসর্জন দিতে যাওয়া পুজো উদ্যোক্তারা৷ তাঁদের মতে, ‘‘জলে থেকে কুমিরের সঙ্গে লড়াই করা কতটা যুক্তিসঙ্গত?’’ তাই অনেকেই চাইছেন হয় দশমীর নয়তো দ্বাদশী থেকে প্রতিমা নিরঞ্জন করতে৷ তাতে অতিরিক্ত খরচ হলেও রেহাই মিলবে মুখ্যমন্ত্রী তথা শাসকদলের কোপের মুখ থেকে৷

Advertisement

জেদ-অহংকার-দম্ভ না মুসলিম ভোটের লোভ, বারবার কেন হারছেন মমতা ?

বিসর্জন ইস্যুতে শুধু এবারই রাজ্যের মুখ পুড়ল, তা কিন্তু নয়৷ গতবারও বির্সজন-নির্দেশিকা জারি করেছিল রাজ্য৷ সেই মামলা গড়িয়েছিল আদালত পর্যন্ত৷ স্বাভাবিকভাবেই মুখ পুড়েছিল রাজ্যের৷ ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এবারও বিসর্জন ইস্যুতে সেই পচা শামুকেই পা কাটল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের৷ নবান্নে দাঁড়িয়ে বড়মুখ করে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, মহরম ও একাদশী একই দিনে পড়ায় বিসর্জন করা যাবে না৷ দশমীর দিনও সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল প্রথমে সন্ধ্যে ছ’টা, পরে তা বাড়িয়ে রাত দশটা পর্যন্ত৷ সমালোচনার ঝড় উঠেছিল রাজনৈতিক মহলে৷ যা গড়ায় আদালতের চৌকাঠ পর্যন্ত৷ শেষমেশ এবারেও মুখে পুড়েছে রাজ্যের৷ রাজ্যেকে কার্যত ভৎর্সনা করে হাইকোর্ট সাফ জানিয়ে দিয়েছে, দশমী থেকে প্রত্যেক দিন বিসর্জন দেওয়া যাবে৷

নীলকণ্ঠ পাখি উড়িয়ে প্রতিমা বিসর্জন হয় রায়চৌধুরিদের

কিন্তু আদালতের রায়ের অব্যহতি পরেই বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, জলে থেকে কেই বা কুমিরের সঙ্গে লড়াই করার সাহস দেখাবে? ইতিমধ্যে রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিব অত্রি ভট্টাচার্য ঘোষণা করেছেন, মহরমে বিসর্জনের অনুমতি দেওয়া হবে কি হবে না, তা ঠিক করবে রাজ্য৷ পুজো কমিটিগুলিকে বিসর্জনের বিস্তারিত তথ্য পেশ করতে হবে৷ কলকাতা পুলিশের রিপোর্ট অনুযায়ী, তিলোত্তমায় পুজোর সংখ্যা ২ হাজার ৬০০৷ ইতিমধ্যেই প্রায় ২হাজার পুজো কমিটি আবেদন পত্রে যা জানিয়েছে, তার মর্মার্থ একাদশী অর্থাৎ মহরমের দিন তাঁরা বিসর্জনে আগ্রহী নন৷ ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ভক্তিতে কিংবা ভয়ে যে কারনেই হোক না কেন, আদালতে মুখ পুড়লেও মুখ্যমন্ত্রীর পোড়া মুখ রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন অধিকাংশ পুজো উদ্যোক্তা৷

মমতার পথেই পুজোয় সাংবাদিকদের নতুন জামা ভারতীর!

মনে করা হচ্ছে, রাজ কোষাগারেরর কুনজরের হাত থেকে রেহাই পেতেই এই সিদ্ধান্ত৷ অধিকাংশ পুজো উদ্যোক্তাই চাইছেন না মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চটাতে৷ দমদম পার্ক ভারতচক্র থেকে ৬৬ পল্লী, শিবমন্দির থেকে উল্টোডাঙ্গা সংগ্রামী বেশিরভাগ পুজো কমিটির কথা থেকেই স্পষ্ট, ২ অক্টোবর থেকে ৪ অক্টোবরের মধ্যে বিসর্জন দিতেই বেশি ইচ্ছুক তাঁরা৷ কারণ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কার্নিভ্যালে অংশগ্রহণের প্রসঙ্গ উত্থাপন করছেন তাঁরা৷

সংগঠন বাড়াতে রাজ্য নেতৃত্বের ঘাড়ে টার্গেট বাঁধলেন অমিত শাহ

কেউ কেউ আবার ‘কে বা প্রাণ আগে করিবেক দানের’ মতো বোধনের আগেই বিসর্জন প্রসঙ্গে সরকারের হয়ে গলা ফাটাচ্ছেন৷ জগৎ মুখার্জী পার্কের সম্পাদক দ্বৈপায়ন দাস দরাজ গলায় জানালেন, ‘‘সরকার সবমসময় আমাদের পাশে থাকে৷ পুজোতে সরকারের কাছ থেকে সব রকমের সাহায্য পেয়ে থাকি৷ তাই সরকারের নির্দেশিকা না মানার তো কোনও কারন নেই৷’’ উমাকে অতিরিক্ত রাখার অর্থ ব্যয় বাহুলতা৷ তাতেও ‘কুছ পরোয়া নেহি’ অনেকেরই৷ দ্বৈপায়ন বাবুর কথায়, ‘অতিরিক্ত বাড়বে শুধু খাবার খরচ৷ পুজোর ক’দিন বিদ্যুৎ বিলের ২০ শতাংশ তো সরকার নিচ্ছে না৷’’

----
--