জরুরি অবস্থার সময় সঞ্জয় গান্ধীর ঘনিষ্ঠ অনুগামী চন্দ্রবাবু নাইডু

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুর সঙ্গে কথা হয়েছিল নরেন্দ্র মোদীর। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি৷ প্রধানমন্ত্রীর আর্জি এড়িয়ে কেন্দ্রে চন্দ্রবাবুর দলের দুই মন্ত্রী অশোক গজপতি রাজু এবং ওয়াই এস চৌধুরি ইস্তফা দিয়েছেন। তাঁরা আপাতত মন্ত্রিসভা ছাড়লেও তদের দল টিডিপি এনডিএ জোটে রয়েছে৷

কিন্তু সেই জোটে কতদিন চন্দ্রবাবুর দল থাকবে তা নিয়ে ইতিমধ্যেই জল্পনা শুরু হয়েছে৷ কারণ আগামী বছরে লোকসভার পাশাপাশি অন্ধ্রপ্রদেশ বিধানসভার ভোটও রয়েছে। যা দেখে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মনে হয়েছে, চন্দ্রবাবুর এনডিএ ছাড়াটাও সময়ের অপেক্ষামাত্র৷ সময় পরিস্থিতি অনুধাবন করে চন্দ্রবাবুর এটি একটা রাজনৈতিক চাল৷ যাতে ভোটের আগে মোদীকেই খলনায়ক আর নিজেকে শহিদ বানিয়ে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হাওয়াটা পুরোপুরি বিজেপির দিকে ঠেলে দিতে চাইছেন অন্ধ্রপ্রদেশের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ৷

চন্দ্রবাবুর রাজনৈতিক কেরিয়ারে দল অথবা জোটসঙ্গী বদল নতুন কিছু নয়৷ আর বিজেপির বদলে তিনি কংগ্রেসের হাত ধরলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই৷ কারণ বর্তমান তেলগু দেশম এই নেতার রাজনৈতিক কেরিয়ার শুরু হয়েছিল কংগ্রেস থেকেই৷ এমনকি জরুরি অবস্থার কালো দিনগুলির সময় তিনি ছিলেন খোদ সঞ্জয় গান্ধীর একান্ত অনুগামী৷ সত্তরের দশকে তিনি ছিলেন কংগ্রেসের জন প্রতিনিধি৷

- Advertisement -

অন্ধ্রপ্রদেশের চিত্তোর জেলার নারাভারি পালেতে ১৯৫০ সালের ২০ এপ্রিল জন্ম গ্রহণ করেন৷ অল্প বয়েস থেকে তিনি রাজনীতির দিকে ঝোঁকেন এবং সত্তর দশকের শুরুর দিকে তিরুপতির কাছে অবস্থিত চন্দ্রগিরিতে ছাত্রাবস্থায় যুব কংগ্রেসে যোগ দেন৷ তারই জেরে এমএ পাশ করে রিসার্চ শুরু করেও তিনি তা মাঝপথে বন্ধ করেন৷ ১৯৭৫ সালে দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী৷ সেই সময় শুধু কংগ্রেস দলের বলে নয় গোটা দেশেই খুবই ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সঞ্জয় গান্ধী৷ চন্দ্রবাবু সেই সময় হয়ে ছিলেন সঞ্জয়ের ঘনিষ্ঠ অনুগামী৷ ১৯৭৭সালে লোকসভায় হারের পর কেন্দ্রে ক্ষমতা হারায় কংগ্রেস৷ এর কিছুদিন পরে ১৯৭৮ সালে কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে চন্দ্রগিরি কেন্দ্র থেকে ভোটে দাঁড়ান৷ তারপরে সেই ভোটে জিতে মাত্র ২৮বছর বয়েসে চন্দ্রবাবু মন্ত্রী হন টি আঞ্জাইয়া সরকারের৷

তখন তিনি অন্ধ্র প্রদেশের কারিগরি শিক্ষা ও সিনেমাটোগ্রাফি মন্ত্রী হন এবং সেই সুবাদে পরিচয় তথা ঘনিষ্ঠতা হয় তেলগু চলচ্চিত্র জগতের সুপারস্টার এনটি রামারাওয়ের সঙ্গে৷ তারই সুবাদে ১৯৮০ সালে রামারাওয়ের মেয়ে ভুবনেশ্বরীর সঙ্গে চন্দ্রবাবুর বিয়ে হয়৷ এর দু’বছর বাদে রামারাও নতুন দল গঠন করেন তেলগু দেশম এবং ১৯৮৩ সালে বিপুল ভাবে ভোটে জিতে রাজ্যের ক্ষমতায় আসেন৷ সেই বারে অবশ্য চন্দ্রবাবু কংগ্রেসের প্রার্থী হয়ে দাড়িয়ে শ্বশুরের দল টিডিপি প্রার্থীর কাছে হারেন৷ কিছুদিন পরেই তিনি দল বদল করে তেলগু দেশম পার্টিতে যোগ দেন৷

তবে ১৯৮৪ সালে এন ভাস্কর রাও যখন রামারাওয়ের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান করেন তখন চন্দ্রবাবু তার রাজনৈতিক করিশমা দেখানোর সুযোগ পান৷ টিডিপি বিধায়কদের নিয়ে রাষ্ট্রপতি ভবনে মিছিল করে যান ৷ ফলস্বরূপ ৩১ দিন পরে ফের তাঁর শ্বশুর রামারাও অন্ধ্রপ্রদেশের গদি ফিরে পান৷ জামাইয়ের পারদর্শিতা দেখে তিনি তখন তাঁকে টিডিপি-র সাধারণ সম্পাদক করেন৷

১৯৮৯ সালে নাইডু টিডিপি-র প্রার্থী হয়ে কুপ্পান থেকে বিধায়ক হলেও সেই বারে তেলগু দেশম ক্ষমতা হারায়৷ ১৯৯৪ সালে রামারাও ফের অন্ধ্রে ক্ষমতায় এলে চন্দ্রবাবু নাইডু রাজ্যের অর্থমন্ত্রী হন৷ কিন্তু তারপর বছর ঘুরতে না ঘুরতে ১৯৯৫ সালের অগস্টে রামারাও লক্ষ্মীপার্বতীকে বিয়ে করে দলের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়ায় তার বিরোধিতা করে তিনিই তাঁর শ্বশুরের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন ৷ তারই জেরে ১৯৯৫ সালের ১ সেপ্টেম্বরে মুখ্যমন্ত্রী হন চন্দ্রবাবু নাইডু৷ ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি ক্ষমতায় ছিলেন৷

এদিকে ১৯৯৮ সালে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ ক্ষমতায় এলে তখন অটল বিহারী বাজপেয়ীকে সমর্থন করেন চন্দ্রবাবু এবং বিনিময়ে টিডিপি-র জিএমসি বালাযোগী হলেন লোকসভার অধ্যক্ষ৷ তবে ২০০৪ সালে লোকসভা এবং রাজ্য বিধানসভায় শোচনীয় পরাজয় হয় তেলগু দেশমের৷ যদিও তিনি নিজে জিতে মুখরক্ষা হয়েছিল৷ এরপর তিনি বিজেপি সান্নিধ্য ছাড়েন এবং নিজের ভাবমূর্তি পরিবর্তন করে তৃতীয় ফ্রন্টের বিষয়ে ফের পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু করেন৷ কারণ এর আগে ১৯৮৯-৯১ কিংবা ১৯৯৬-৯৮ সালে তিনি ও তার তেলগু দেশম তৃতীয় ফ্রন্টের সঙ্গে ছিলেন৷ কিন্তু ওই পথে হেঁটেও ২০০৯ সালের ভোটে কংগ্রেসের কাছে হারতে হয়৷অবশেষে বছর দশেক আলাদা থাকার পরে ফের ২০১৪ সালের ভোটের আগে বিজেপির কাছাকাছি এসেছিলেন চন্দ্রবাবু নাইডু ৷

Advertisement
----
-----