কাঁকড়ার খোল থেকে উৎপন্ন হবে বিদ্যুৎ, নজির গড়ছে যাদবপুর

দিপালী সেন, কলকাতা: বাঙালি যে সব খাবার রসিয়ে কষিয়ে খেতে পছন্দ করেন তার মধ্যে অন্যতম হল কাঁকড়া। স্বাদে খানিকটা চিংড়ি মাছের মতো কাঁকড়ার ঝাল, টক, দো’পেয়াজার মতো রেসিপি ছুটির দিনে পাতে পড়লে তো কেয়া বাত! কিন্তু, স্বাদে সুস্বাদু এই প্রাণিটির খোলকে অতীতে শুধুমাত্র খাদ্য শিল্পের একটি পরিবেশ বান্ধব আবর্জনা বলেই মনে করা হত৷ সেই ধারণাকে ভেঙে দিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের দল৷ সম্প্রতি তাঁদের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রতিদিন মাছের বাজার থেকে সংগৃহীত এই বায়োওয়েস্ট বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপন্ন করতে সক্ষম৷

রয়্যাল সোসাইটি অফ কেমিস্ট্রির Jounal of Materials Chemistry A-তে প্রকাশিত হয়েছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের এই গবেষণাপত্রটি৷ এই গবেষক দলে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক পার্থপ্রতিম রায়, অধ্যাপক সুখেন দাস, রিসার্ট স্কলার নুর আমিন হক সহ মোট আট জন৷ এই গবেষণাপত্র অনুযায়ী, কাঁকড়ার খোল থেকে সংগৃহীত করা হয় এক ধরনের উপাদান৷ যার নাম ‘Chitin Nanofiber’ (সিএনএফ)৷ কাঁকড়ার খোল থেকে একটি বিশেষ যান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রোটিন এবং মিনারেল বাদ দিয়ে এই সিএনএফ সংগ্রহ করা হয়৷ সিএনএফ-এর উপর নির্ভর করে তৈরি করা সম্ভব পিজোইলেকট্রিক ন্যানোজেনারেটর (পিইএনজি), যা হাঁটাচলা, কথা বলা, নাড়ির স্পন্দন, গাড়ির চলন এবং আঙুল চালনার মতো সাধারণ কাজের মধ্যে দিয়েই বৈদ্যুতিন শক্তি তৈরি করতে পারে৷

অধ্যাপক ও গবেষক পার্থ প্রতিম রায়

বর্তমান সময়ে যে পিইএনজি যন্ত্রগুলি রয়েছে তা পরিবেশ বান্ধব নয়৷ তৈরি করতেও খরচ বিশাল৷ তাই পেসমেকারের মত স্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত যন্ত্রে এই ধরনের পিইএনজি ব্যবহার স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর হতে পারে৷ কিন্তু, গবেষকদের দাবি, কাঁকড়ার খোল থেকে সংগৃহীত উপাদান সিএনএফ পরিবেশ বান্ধব, অ-বিষাক্ত, পরিবেশের সঙ্গে মিশে যায়। এটি পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, শক্তিশালী, নতুন করে ব্যবহারযোগ্য ও টেকসইও বটে৷ তাই এই উপাদান ব্যবহার করে তৈরি পিইএনজি যন্ত্র নিঃসন্দেহে পেসমেকার অথবা অন্যান্য ধরনের হেল্থ কেয়ার ইউনিটেও বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে৷ গবেষণার ফল অনুযায়ী, হৃদস্পন্দনের সামান্য চাপেও এই পিইএনজি কাজ করতে পারে৷

- Advertisement -

সিএনএফ থেকে বৈদ্যুতিন শক্তি উৎপন্ন হওয়া সম্ভব৷ কী করে? যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক পার্থ প্রতিম রায় বলেন, ‘‘ধরা যাক, পায়ের গোড়ালির নিচে যন্ত্রটা লাগানো রয়েছে, আর আপনি চলাফেরা করছেন৷ হাঁটাচলার সময় যে চাপ সৃষ্টি হবে তা থেকেই বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে৷ আবার, সমুদ্রের ঢেউ বড় ধরনের চাপের সৃষ্টি করে৷ তাই ঢেউ আসছে এমন জায়গায় যদি যন্ত্রটা রাখা হয়, তাহলে ঢেউয়ের চাপে যন্ত্রটি থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে৷’’ তিনি আরও জানিয়েছেন, পলিমারের মতো উপাদান পরিবেশের অনেক ক্ষতি করে৷ কিন্তু, এটি কাঁকড়ার খোল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে৷ এই যন্ত্রের সব থেকে বড় সুবিধা হল কাঁকড়ার খোল পরিবেশ বান্ধব উপাদান৷ অর্থাৎ, কাঁকড়ার খোল পরিবেশের ক্ষতি করবে না, অন্যদিকে বিদ্যুৎ শক্তিও উৎপন্ন করতে পারবে৷

কিছুদিন আগেই কাঁকড়ার খোলের সঙ্গে গাছের কিছু উপাদান মিশিয়ে প্লাস্টিকের মতো একটি উপাদান তৈরি করেছেন জর্জিয়া টেকের বিজ্ঞানীরা৷ অধ্যাপক এবং গবেষক কারসন মেরিডিয়েথ জানান, এই নতুন উপাদানটি প্লাস্টিকের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে৷ তিনি বলেন, ‘‘তাজা খাদ্য, সংরক্ষিত খাদ্য, এমনকী মাংস, সবজি, ফলের মতো জিনিসকেও এই উপাদান দিয়ে মোড়া যেতে পারে৷’’ এটিও কাঁকড়ার খোল থেকে সংগৃহীত chitin উপাদান দিয়ে তৈরি করা হয়েছে৷ এই সংগৃহীত উপাদানের সঙ্গে গাছ থেকে পাওয়া একটি উপাদান সেলুলোজ দিয়ে মিশিয়ে প্লাস্টিকের মতো একটি উপাদান তৈরি করেছেন কারসন মেরিডিয়েথ৷

সাধারণত, বায়োওয়েস্ট আখ্যা দিয়ে প্রতিদিন বিশাল পরিমাণ কাঁকড়ার খোল ফেলে দেওয়া হয়৷ সেই আবর্জনাকেই ব্যবহার করে এই আবিষ্কার নিত্যদিনের জীবনে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা হলে পরিবেশ রক্ষায় অনেকটাই সাহায্য করবে বলে মত গবেষকদের৷ চলতে ফিরতে মোবাইল চার্জ হোক, কে না চান? উত্তরে বলা যেতেই পারে, তার জন্য পাওয়ার ব্যাংক নামক যন্ত্রটি তো রয়েছে৷ কিন্তু, পাওয়ার ব্যাংক তো পরিবেশ বান্ধব নয়৷ তাই পরিবেশের কথা চিন্তা করে চলাফেরার সময় অনায়াসে মোবাইল চার্জের বিকল্প উপায় তৈরি করছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আবিষ্কৃত এই যন্ত্রটি৷

কীভাবে?

ধরা যাক, ফোনের সঙ্গে একটি তার দিয়ে যুক্ত রয়েছে যন্ত্রটি৷ আর ফোনে হাতে নিয়ে হাঁটাচলা করতে করতে কারও সঙ্গে কথা বলছেন আপনি৷ চলনের সময় যে চাপ সৃষ্টি হবে তা থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ যা আপনার ফোনটিকে চার্জ করতে শুরু করে দেবে৷ এমনই বিভিন্ন পোর্টেবল যন্ত্রে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে সিএনএফ নির্ভর পিইএনজি যন্ত্রটিকে৷ আবার মানুষের দেহের কোনও যন্ত্রেও বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য এই যন্ত্রটিকে ব্যবহার করা যেতে পারে৷ যেখানে এই পিইএনজি যন্ত্রটি বায়োমেক্যানিক্যাল এনার্জি বন্দী করবে এবং সেই এনার্জিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করবে৷

Advertisement ---
-----