জলদাপাড়ায় হাতিদের অভিনব প্রশিক্ষণকেন্দ্র

আলিপুরদুয়ার: দক্ষিণ ভারতের পর এবার উত্তর-পূর্ব ভারতেও তৈরি হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ হাতি ও মাহুত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র৷ জলদাপাড়ার দক্ষিণ রেঞ্জের শালকুমার বিটে গড়ে উঠবে এই অভিনব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র৷ সবরকম পরিকাঠামোই থাকবে সেখানে৷ চলতি আর্থিক বছরে এই কেন্দ্র গড়ছে রাজ্য বনদফতর৷

ইতিমধ্যেই এই প্রকল্পের জন্য ৪০ হেক্টর জমি চিহ্নিত করা হয়ে গিয়েছে৷ যার মধ্যে কুড়ি হেক্টর জায়গায় থাকবে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো৷ বাকি জায়গায় রাখা হবে হাতিদের খাদ্যভাণ্ডার৷ রাখা থাকবে হাতিদের অতি প্রিয় খাবার ঢাড্ডা, পুরুন্ডি, চেপ্টি ও মালসা ঘাস৷ ইতিমধ্যেই এক কোটি চল্লিশ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করেছে অর্থ দফতর৷

জলদাপাড়া দক্ষিণ রেঞ্জের এই এলাকার পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে ছোট নদী সঞ্জয়৷ সেখান থেকেই হবে পর্যাপ্ত জলের যোগান৷ পুরো এলাকাটিকে ঘেরা হবে উঁচু বেড়া দিয়ে৷ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি চালাতে প্রতি মাসে খরচ ১৮ লক্ষ টাকা৷ বিশিষ্ট হস্তী বিশেষজ্ঞ পার্বতী বড়ুয়া ও অবসরপ্রাপ্ত মাহুত রঘু রায় আপাতত এই কেন্দ্রের হাতি ও মাহুতদের তালিম দেবেন৷ সঙ্গে থাকবেন এক জন বন্যপ্রাণ চিকিৎসকও৷  থাকবে সবরকম নিরাপত্তা ব্যবস্থাও৷ প্রশিক্ষণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত হাতি, মাহুত ও পাতাওয়ালাদের ওই আবাসিক শিবিরে থাকতে হবে৷ প্রাথমিক ভাবে ছ’টি দেশ থেকে দশটি হাতি ও কুড়ি জন মাহুত ও পাতাওয়ালাকে বেছে নিয়ে শুরু করা হবে প্রশিক্ষণ৷

- Advertisement -

উত্তরবঙ্গের জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান, গরুমারা জাতীয় উদ্যান ও বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্প মিলিয়ে মোট ৮৫টি কুনকি হাতি রয়েছে বনদফতরের হাতে৷ বেশ কিছু বেয়াড়া হাতিও রয়েছে তালিকায়৷ তাদের মেজাজ সবসময় সপ্তমে৷ বনসুরক্ষার কোনও কাজই তাদের জন্য করা যায় না৷ সঙ্গে ১৫টি বাচ্চা হাতিও রয়েছে৷ তারা এখনও জানে না কুনকির সহবত৷

প্রথমে ওই হাতিদের বেছে নিয়ে আদর্শ কুনকি হয়ে ওঠার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে৷ এরপর ধীরে ধীরে পরবর্তী পদক্ষেপ৷ কেন না কুনকি হাতির অভাব এখানে৷ অধিকাংশ বয়সের ভারে ন্যুব্জ৷ ইতিমধ্যেই কর্ণাটক থেকে আনতে হয়েছে আটটি কুনকি হাতি৷ খুব তাড়াতাড়ি আন্দামান থেকেও আনা হচ্ছে আরও সাতটি৷ রাজ্যের বন্যপ্রাণ শাখার প্রধান মুখ্যবনপাল রবিকান্ত সিনহা জানিয়েছেন “একদিকে কুনকি হাতির অভাব৷ অন্যদিকে অভিজ্ঞ মাহুত ও পাতাওয়ালার অভাবে হিমশিম অবস্থা আমাদের৷ জলদাপাড়ায় বর্তমানে একজনও স্থায়ী মাহুত ও পাতাওয়ালা নেই৷’’

তিনি স্বীকারও করেছেন, ‘‘অনভিজ্ঞ লোক নিয়ে কাজ করাতে গিয়ে মাঝেমধ্যেই দুর্ঘটনা ঘটছে৷ ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখেই আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ হাতি ও মাহুত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি৷ এই প্রশিক্ষণের পর্ব মিটলে ধাপে ধাপে মাহুত ও পাতাওয়ালাদের স্থায়ীকরণ হবে৷ চলতি আর্থিক বছরের মধ্যেই যাতে কাজ শেষ করা যায় সে বিষয়ে জরুরি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে৷’’
শুধু হাতি ও মাহুত প্রশিক্ষণই নয়, এখন থেকে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উদ্ধার হওয়া বাচ্চা হাতিদেরও ঠাঁই হবে ওই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে৷

উত্তরবঙ্গের বন্যপ্রাণ শাখার মুখ্যবনপাল উজ্জ্বল ঘোষ জানিয়েছেন, ‘‘বনসুরক্ষার কাজকে সঠিক দিশায় এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এই ধরনের একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকাঠামো তৈরি করাটা অত্যন্ত জরুরি ছিল৷ এর মাধ্যমে একদিকে দুর্ঘটনা যেমন এড়ানো যাবে, তেমনি পিলখানাগুলির উপর চাপও লাঘব হবে৷’’

অবসরপ্রাপ্ত বিখ্যাত মাহুত রঘু রায় জানিয়েছেন, ‘‘আমরা কাজ শুরুর সময় সম্পৎ সিং বিস্ট, প্রতিমা বড়ুয়ার বাবা প্রকৃতিশচন্দ্র বড়ুয়া ও প্রতিমা বড়ুয়ার কাছ থেকে যে প্রশিক্ষণ পেয়েছি এ প্রজন্মের মাহুত ও পাতাওয়ালারা সে সুযোগ পান না৷ তাই অনবরত দুর্ঘটনা ঘটছে৷ হাতিগুলিও বখাটে হয়ে যাচ্ছে৷’’ হস্তী বিশেষজ্ঞ পার্বতী বড়ুয়ার কথায়, ‘‘দেরিতে হলেও একেবারে সঠিক পদক্ষেপ৷ আমার সবটা দিয়ে সাহায্য করব৷’’

Advertisement ---
---
-----