তিমিরকান্তি পতি, বাঁকুড়া: বয়স মাত্র এগারো৷ কিন্তু সকালে চোখ খুলতেই হাতে বইয়ের বদলে ওঠে এঁটো বাসন৷ সেগুলো ধুয়ে মুছে সাফ করতে করতে ঘড়ির কাঁটা গিয়ে ঠেকে রাত দশটায়৷ এভাবেই রোজ দিন কাটাচ্ছে রিয়া বাউড়ি৷ বাঁকুড়া স্টেশন সংলগ্ন রাস্তার পাশে তার বাবার খাবারের দোকান৷ সেখানেই বাবার হাতে হাতে সাহায্য করে বছর এগারোর রিয়া৷ আজ ‘শিশু দিবসে’র সকালেও এই ছবিটা পাল্টায়নি রিয়ার জীবনে।

এরকম অনেক রিয়ার খোঁজ মিলবে বাঁকুড়ার আনাচে কানাচে। যারা চেনেনা চাচা নেহেরুকে, জানে না শিশু দিবস কবে, কেন পালন করা হয় তারা কেবল এটুকুই জানে বাবার সঙ্গে হাতে হাত লাগিয়ে কাজ না করলে দু’বেলা দু’মুঠো খাবার জুটবে না। পুজোয় পোশাক হবে না। আরও ‘হবে না’ অনেক কিছুই। তাই সকালে বই খাতা নিয়ে পড়তে বসার বদলে ঘুম চোখেই ছুটে যেতে হয় বাবার দোকানে।

সকালের হালকা শীত গায়ে স্টেশনের সামনে রাস্তার পাশে রিয়ার বাবার দোকানে যখন একের পর এক খদ্দের মুড়ি, ঘুগনি বা ছোলা বাটোরা খেয়ে চরম তৃপ্তি পায়, রিয়া তখন পরনের শোয়েটারের হাত গুটিয়ে পরম যত্নে ধুয়ে যায় সেই সব এঁটো থালা-বাটি। রিয়াকে আজকের দিনের বিশেষত্ব কি জানে কিনা তা জিজ্ঞাসা করা হলে সে স্পষ্ট জবাব দেয় ‘না’৷ অন্য এক প্রশ্নের উত্তরে জানায়, সে স্থানীয় একটি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে। তবে দোকানের কাজে দিনের বেশির ভাগ সময়টা চলে যাওয়ায় আর তেমন স্কুলে যাওয়া হয় না। তবে বাড়ি ফিরে সন্ধ্যায় চেষ্টা করে প্রিয় বই গুলোকে নিয়ে পড়তে বসতে।

রিয়ার বাবা কৃষ্ণ বাউরী বলেন, ‘‘অভাবের সংসার। দোকানে বিক্রিও তেমন নেই। বেতন দিয়ে লোক রাখার সামর্থ্য না থাকার কারণে অনিচ্ছা সত্ত্বেও এক প্রকার মেয়েকে এই কাজে লাগাতে হয়।’’ একটি প্রাথমিক স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক অজিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘বাঁকুড়া শহরের স্টেশন মোড়ের রিয়া একজন শিশু শ্রমিকদের প্রতীক মাত্র। এই রকম অনেক রিয়ার খোঁজ পাবেন শহরের আনাচে কানাচে, গ্রামের অলিতে গলিতে। স্বাধীনতার এতগুলো বছর পরেও এই ছবি আমাদের কাছে ভীষণ লজ্জার। শুধু খাতায় কলমে নয়, শিশুর অধিকার রক্ষায় ও স্বাভাবিক জীবন যাপনে প্রশাসন, এন.জি.ও গুলির পাশাপাশি আমাদের সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।’’

পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা মনোরঞ্জন শিকারি বলেন, ‘‘এই ছবি শুধু লজ্জার নয়। এটিএম, পেটিএমের যুগে এই ছবি অন্ধকারের। এইভাবে ছোটো ছোটো ছেলে মেয়েদের দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের জন্য এখনও খাবারের দোকানে, মোটর গ্যারেজে কাজে কিম্বা রাস্তায় রাস্তায় পলিথিন কুড়িয়ে বেড়াতে হচ্ছে। শিশুরাই যেখানে দেশের ভবিষ্যৎ, সেখানে শিশুরাই যদি এই ধরণের কাজে শিশু বয়সেই জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়, তবে দেশের ভবিষ্যৎই তো অন্ধকার হয়ে যাবে৷’’

--
----
--