খুন করার আগে গান লিখত এই বাংলাদেশি ‘ডন’

শশী ঘোষ: ‘আমি তো মরেই যাবো, চলে যাবো, রেখে যাবো সবই/ আছসনি কেউ সঙ্গের সাথী, সঙ্গিনী কেউ যাবি/আমি মরে যাব…’ এই লাইন কয়েকটা শুনেই আহা আহা করছেন নিশ্চয়! আর করবেন নাই বা কেন, কি দারুণ বাস্তব কথা তুলে ধরা হয়েছে এই লাইনগুলোর মধ্যে দিয়ে। আমরা তো মরেই যাবো কিন্তু তারপর! তারপর সব তো রেখে যেতেই হবে। যে গানটি লিখেছে তাঁকে নিশ্চয় ভাবছেন সাদাসিধে নিপাট ভদ্রলোক। তবে বলে রাখি আপনার ধারনা একদম ভুল।

বাংলাদেশের একটা সময়ে ত্রাস এরশাদ শিকদারের লেখা এই গান। যার বিরুদ্ধে ৬০টিরও বেশি খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাসের অভিযোগ রয়েছে। খুন করতে যাওয়ার আগে নিজেই গান লিখত আর নিজের লেখা গান গাইতে গাইতে মানুষ মারত। একটা সময় এমন ছিল যে এরশাদ শিকদারের নাম শুনলেও অনেকের প্যান্ট ভিজে যেত। বাংলাদেশি ‘গায়ক ডন’- যে কোনও সময় সিনেমার কুখ্যাত খলনায়কদের টেক্কা দিতে পারে৷

- Advertisement -

শুধুমাত্র এইটুকু নয়, খুন করেই দুধ দিয়ে স্নান করে পবিত্র হত ডন এরশাদ শিকদার। যাতে কোনও পাপ তাকে স্পর্শ করতে না পারে। পবিত্র হওয়ার পরই আয়োজন করা হত ‘জলসা’র। আর সেই জলসার মূল আকর্ষণ ছিল এরশাদ শিকদারের নিজ কণ্ঠে গাওয়া গান ‘আমি তো মরেই যাবো, চলে যাবো, রেখে যাবো সবই…’। কাকতালীয় ভাবে সেই গানটির প্রতিটি লাইনের সঙ্গেই তার জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোর মিল খুঁজে পাওয়া যায়। গ্রেফতারের পরপরই তার সম্পদ পরিবারের সদস্যরা যে যার মতো দখল করে নেয়।

২০০৪ সালের ১০ মে মধ্যরাতে খুলনা জেলা কারাগারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়৷ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে এরশাদ শিকদার তার স্ত্রীর উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘শত শত কোটি টাকার সম্পদ রেখে গেলাম। আমার নামে একটা গরু কোরবানি দিতে পারলা না? তাইলে তো আমি বাঁইচা যাইতাম। আমার এই দুঃসময়ে তোমরা কেউ পাশে রইলা না।’

 

এরশাদ শিকদারের নৃশংসতা এমনই ভয়াবহ ছিল যে, আস্তে-ধীরে কষ্ট দিয়ে খুন করত। তার বরফকলে যার ডাক পড়ত, তিনি আর কখনোই সেখান থেকে জীবিত বের হতে পারতেন না। এদের অধিকাংশের লাশও আর খুঁজে পাওয়া যেত না।

যাকে পথের কাঁটা মনে করেছে, তাকেই সে মেরে ফেলত। তার সহযোগী ও পরবর্তীতে মামলার রাজসাক্ষী নূরে আলমের মতে, এরশাদ শিকদার কমপক্ষে ৬০টিরও বেশী খুন করেছে। যার মধ্যে ২৪টির খুনের বর্ণনা আদালতে জবানবন্দি দেয়। কুখ্যাত খুনি এরশাদ শিকদার তার রাজত্বকালে রূপসার যুবলীগ কর্মী খালিদ; দৌলতপুরের অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবীর ফটিক; সোনাডাঙ্গার ইনসাফ, কামাল, খালেক; সেনহাটির টাক আজিজসহ আরও অনেককে হত্যা করে জমাট সিমেন্টের বস্তায় বেঁধে ভৈরব নদে ফেলে দিত। যাতে কেউ কোনও দিন নাম নিশানাও যাতে খুঁজে না পায়।

অপরাধীর অপরাধ চিরকাল চলতে পারে না। ১৯৯৯ সালের নভেম্বরে গ্রেফতার হয় এরশাদ শিকদার। গ্রেফতারের পর বেরিয়ে আসে তার নৃশংসতার অজানা সব কাহিনী। ভয়াবহতা এতটাই ছিল যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও জানার পর অবাক হয়ে গিয়েছিল। খুলনার কারাগারে নেওয়ার পর সেখানেও পেশাদার অপরাধীরা তার বিচার চেয়ে মিছিল করে। শোলে সিনেমার একটা ডায়লগ ছিল, শিশুদের ঘুম পাড়ানোর জন্য মায়েরা বলত এখুনি না ঘুমালে গব্বর চলে আসবে। খুলানেতে সত্যি এরশাদ শিকদারের নাম বলে এভাবে ভয় দেখানো হত বাচ্চাদের। দুনিয়ার অন্যতম খুনিদের তালিকায় এই বাংলাদেশি সিরিয়াল কিলার এরশাদ শিকদারের নাম উঠে আসে।

১৯৮৯ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত এরশাদের ২৪টি খুনের প্রত্যক্ষদর্শী ও সহযোগী ছিল নুরে আলম। সবগুলো খুনের ঘটনায় এরশাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয় সে। ফাঁসির আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করে এরশাদ। আপিল বিভাগের রায়ে তার ফাঁসির আদেশ বহাল রাখা হয়। মহা ক্ষমতাধর এরশাদ শিকদার ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয় প্রাণ বাঁচাতে। কিন্তু রাষ্ট্রপতির ক্ষমা জোটেনি তার কপালে। এ খবর শুনে ব্রাশের খাপ পেটে ঢুকিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে এরশাদ।আত্মহত্যার চেষ্টাও ব্যর্থ হয়।

২০০৪ সালের ১০ মে রাত ১২টা ১ মিনিটে রুমাল ফেলা হল। রুমাল মাটিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পায়ের নিচের পাটাতন সরিয়ে দেয়া হল তার। ফাঁসি হল এরশাদের। আধ ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখার পর মৃতদেহ নামিয়ে এনে পরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করল ডাক্তার। মৃত্যু আরও নিশ্চিত করতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কেটে দেয়া হল তার হাত ও পায়ের শিরা। অবসান হল পৃথিবীর বুকে মানুষের রক্ত নিয়ে উন্মাদ খেলায় মেতে থাকা এক দানবের জীবন।

Advertisement ---
---
-----