খিদিরপুর গার্ডেনরিচ মেটিয়াবুরুজে আজও ঢুকতে পারে না কলকাতা পুলিশ

মানব গুহ, কলকাতা: খিদিরপুর-গার্ডেনরিচ-মেটিয়াবুরুজ কি কলকাতার বাইরে ? বাংলার বাইরে ? কেন সেখানে প্রবেশ করতে ভয় পায় কলকাতা পুলিশ ? কেন সেখানে অভিযানে যাওয়ার অনুমতিই পায় না লালবাজার ?

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে কি চটাতে চায় না কোন শাসক দলই ? এই নিয়েই কলকাতা হাইকোর্টে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে লালবাজার। হাইকোর্টের বিচারপতির সেই একই প্রশ্ন এবার সাধারন মানুষের মনেও। কেন ? কেন ? কেন ?

- Advertisement -

সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় জোর করে আটকে রাখা হয়েছে এক কিশোরীকে। অভিযুক্তদের নাম, ধাম এবং মোবাইল নম্বর জানা সত্ত্বেও তাকে উদ্ধার করতে ঘটনাস্থলে যাচ্ছে না পুলিশ। এমনই অভিযোগ উঠেছে কলকাতা পুলিশের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারী অপহৃত কিশোরীর বাবা কলকাতা পুরসভার কর্মী বিনোদ দাস।

ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের জুন মাসে। মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল অপহৃত কিশোরীর। জুন মাসের নয় তারিখে আচমকা নিখোঁজ হয়ে যায় মেয়েটি। মা মারা যাওয়ার পর থেকে গার্ডেনরিচের মেহর মঞ্জিল এলাকায় মাসির বাড়িতেই থাকতো ওই কিশোরী। সেখান থেকেই নিখোঁজ হয় মেয়েটি।

জুন মাসের দশ তারিখেই বিনোদবাবু জানতে পারেন যে মেটিয়াবুরুজ এলাকায় রয়েছে তাঁর মেয়ে। স্থানীয় এক যুবক মিন্টু এবং তার বাবা কোরবান আলি জোর করে আটকে রেখে দিয়েছে বিনোদবাবুর মেয়েকে। গার্ডেনরিচ থানায় এমনই অভিযোগ করেছেন কলকাতা পুরসভার সাফাই কর্মী বিনোদ দাস।

অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অপহরণের লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয় গার্ডেনরিচ থানায়। দীর্ঘদিন থানা কোন উদ্যোগ না নেওয়ায় বিনোদবাবু লালবাজারের শরণাপন্ন হন। কিন্তু সেখানেও কাজের কাজ কিছুই না হওয়ায় তিনি বিচারব্যবস্থার দ্বারস্থ হন। পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার মামলা করেন কলকাতা হাইকোর্টে।

খুব স্বাভাবিকভাবেই এই ধরনের অভিযোগ শুনে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে আদালত। বিনোদবাবুর আইনজীবী আদালতে জানিয়েছেন যে, নির্দিষ্ট করে ঠিকানা ও ফোন নম্বর দেওয়ার পরেও কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না পুলিশ। মেয়েটিকে সেখানে জোর করে আটকে রাখা হয়েছে একথা বারবার পুলিশকে জানানোর পরেও দীর্ঘ আট মাসে কোনও প্রতিকার মেলেনি। ওই আইনজীবী আরও জানিয়েছেন যে, মেটিয়াবুরুজ এলাকায় অভিযান চালানো যাবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে পুলিশ।

এই ধরনের মারাত্মক অভিযোগ শুনে নড়েচড়ে বসে কলকাতা হাইকোর্ট। সরকারি পক্ষের আইনজীবী বিষয়টি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলেও তাঁর যুক্তি ধোপে টেকেনি হাইকোর্টের বিচারপতি দেবাংশু বসাকের সামনে। অভিযুক্তদের হেফাজত থেকে অপহৃত ওই কিশোরীকে অবিলম্বে উদ্ধার করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। কলকাতা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার(ক্রাইম)-এর নেতৃত্বে বিশেষ দল গঠন করে অভিযান চালিয়ে বিনোদবাবুর মেয়েকে উদ্ধারের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি দেবাংশু বসাক।

সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্নটা এখানেই। কেন খিদিরপুর, গার্ডেনরিচ, মেটিয়াবুরুজ অঞ্চলে অভিযান চালাতে ভয় পায় কলকাতা পুলিশ ? সংখ্যালঘু অধ্যুষ্যিত এলাকায় পুলিশি অভিযান চালালে সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কে ধ্বস নামতে পারে এই ভয়ে শাসক দলই কি কখনও এই সব এলাকায় পুলিশি অভিযান চালাতে দেয় না ?

গার্ডেনরিচ থানার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ অফিসার জানিয়েছেন, এই সমস্ত এলাকায় অভিযান চালাতে গেলে লালবাজারের অনুমতি নিতে হয়। আর লালবাজারকে অনুমতি নিতে হয় রাজ্য প্রশাসনের। রাজ্য প্রশাসন থেকে সংখ্যালঘু এলাকায় কোনরকম অভিযান চালানোর অনুমতি দেওয়া হয় না বলেই জানিয়েছেন ওই পুলিশ অফিসার। শুধু তৃণমূল সরকারের আমলে নয়, বাম আমলেও এই সব এলাকায় দুস্কৃতীদের খোঁজে পুলিশ অভিযানে গিয়েছে, এমন নজির নেই৷

এর আগেও অনেকবার সংখ্যালঘু অধ্যুষ্যিত এইসব এলাকায় অভিযান চালাতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন পুলিশ অফিসার-কর্মীরা। ডক এলাকায় ১৯৮৪ সালে ১৮ ই মার্চ হোলির পরদিন ডিসি পোর্ট বিনোদ মেহেতা হত্যার ঘটনা এখনও মুখে মুখে ফেরে কলকাতাবাসীর। খিদিরপুর ফ্যান্সি মার্কেটে অভিযান চালাতে গিয়ে বহূবার আক্রান্ত হয়েছেন পুলিশ অফিসার ও কর্মীরা। বারবার আক্রান্ত হয়েছেন সেলস ও এক্সাইজ দফতরের কর্মী-অফিসাররা।

১৯৯৭ সালের ৬ ই আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন উদয় সিং খুনের ঘটনা নিয়েও খিদিরপুর মোটিয়াবুরুজে রক্তের হোলি খেলা দেখেছে কলকাতা। ২০১৭ র ৭ এপ্রিলও সামান্য ঘটনা নিয়ে গোষ্ঠী দ্বন্দ্বের লড়াই দেখেছে পোর্ট এলাকা। মেটিয়াবুরুজে ২০১৭ র ২৯ জানুয়ারী গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব নিয়ে উত্তেজনা দেখেছে গোটা রাজ্য। খিদিরপুর-মেটিয়াবুরুজ-গার্ডেনরিচ মানেই একটা বিছিন্ন দ্বীপ, যেখানকার সবকিছুই আলাদা।

২০১৬ সালের ৩০ শে এপ্রিল, পাকিস্তানের ডন পত্রিকার সাংবাদিক মালিহা আহমেদ সিদ্দিকিকে সাক্ষাতকার দিতে গিয়ে রাজ্যের মন্ত্রী ও পোর্ট এরিয়ার বিধায়ক ফিরহাদ হাকিম বা ববি হাকিম পোর্ট এলাকাকে ‘মিনি পাকিস্তান’ বলে দেন। বিরোধীদের প্রবল সমালোচনার মুখে পরে তিনি নিজের বয়ান পরে অস্বীকার করেন। যদিও ডন পত্রিকায় বড় হেডলাইন সহযোগে ববি হাকিমের ‘মিনি পাকিস্তান’ খবর প্রকাশিত হয়। সমালোচনা পালটা সমালোচনার রাজনীতির লড়াই চলতে থাকলেও তখনই সাধারন মানুষের কাছে আরও পরিস্কার হয়ে যায়, আসলে এখানকার অবস্থাটা কি।

সেইসব কারণেই আজও খিদিরপুর-মেটিয়াবুরুজ-গার্ডেনরিচ একেবারে আলাদা একটা এলাকা। পুলিশের মতেই, দুষ্কৃতীদের আঁতুরঘড়। নজরদারি নেই বললেই চলে। রাজ্য পুলিশ প্রশাসন বছরের পর বছর উদাসীন এখানকার কোন সমস্যা এলেই। কেন ? প্রশ্ন কিন্তু উঠছে ?

বাংলার মধ্যে আর একটা সমান্তরাল বাংলা। যেখানে আইনকানুন, ক্ষমতা সব আলাদা। এতদিন মানুষ জানত। প্রকাশ্যে বলার সাহস কারোর ছিল না। কলকাতা হাইকোর্টের রায়ে সেই ঘটনা এবার একেবারে প্রকাশ্যে নিয়ে এল। হাইকোর্টের বিচারপতি দেবাংশু বসাকের নির্দেশে চরম লজ্জায় রাজ্য প্রশাসন। ফের চরম অপমানের মুখে লালবাজার। এ লজ্জা কার ? পুলিশ না প্রশাসনের ? ভোটের লোভে, গদির টানে আর কতদিন চলবে এই প্রশাসনহীন অরাজকতা ? কতদিন ঠুঁটো জগন্নাথ করে রাখা হবে পুলিশকে ? প্রশ্ন কিন্তু উঠছে।

মতামত লেখকের নিজস্ব

Advertisement
----
-----