‘ফড়িং’ উড়বে এবার ‘ভালবাসার শহর’এ

শুভঙ্কর চক্রবর্তী: ‘ফড়িং’ উড়িয়েছেন ২০১৩ সালে, তারপর চিরন্জিৎকে নিয়ে ‘কাকাবাবু’ ছবির কথাও ভেবেছিলেন পরিচালক ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী তবে, সে ছবি আর করা হয়ে ওঠেনি৷ সে গল্প বহুদিনের, তবে এরমধ্যেই একটি গোটা শহর বানিয়ে ফেলেছেন ইন্দ্রনীলবাবু৷ এক ‘ভালবাসার শহর’৷সে ছবি নিয়েই চলল কথাবার্তা তবে তার সঙ্গে চলল এখনকার বাংলা ছবি নিয়ে অনেক গল্প৷

প্রথমবার টেলিফোন বেজেই গেল, ধরলেন না৷ ১০ মিনিট বাদে করতেই, ওপার থেকে শোনা গেল গলা৷জানালেন ‘‘একটু ব্যস্ত ছিলাম’’৷
তারপরই শুরু হল কথোপকথন৷

২০১৩র ফড়িংয়ের পর ২০১৭তে ‘ভালবাসার শহর’ ? এত সময় লেগে গেল যে?
ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী: না না অনেকই বলছেন ৩ বছর লেগে গেল? সবাইকেই বলছি আমি তো ছোটপর্দার জন্যও ছবি করেছি, ‘একটি বাঙালি ভূতের গল্প’৷আসলে আমি আমি যেভাবে আমার সিনেমাগুলোকে দেখি বা যেভাবে ছবিটা বানাতে চাই, তা কলকাতার বাজারে সুলভ নয়৷সাধারণভাবে পেশাদার প্রযোজক বলতে যা বোঝায় তা এই কলকাতায় পাওয়া দুর্লভ৷সেই কারণেই অনেকটা মিসম্যাচ হয়ে যায় আমার সাথে, সমস্যাও বাড়তে থাকে৷ তাই আমার ছবি, আমি নিজের মত করেই বানাই সময় নিয়ে৷ আমি অনেকদিন ধরেই ইন্টারনেট-ভিত্তিক সিনেমা করার জন্য প্রচেষ্টায় ছিলাম৷ এই ইন্টারনেটই হতে আগামীদিনে তথাকথিত ইন্ডিপেনডেন্ট ছবির ভবিষ্যত৷

- Advertisement -

‘ভালবাসার শহর’ নিয়ে যদি কিছু…
ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী: ছবি নিয়ে খুব বেশি বলব না৷তবে যেটা বলার দরকার, এই ছবি ইউটিউবে ভারতীয় এবং বাংলাদেশের দর্শকেরা বিনামুল্যেই দেখতে পাবেন, তবে যেসকল বাঙালি দর্শকেরা আছেন এই দেশগুলি বাদ দিয়ে, তাঁদেরকে দেখতে হবে ‘ভিনিও’তে, এবং দাম দিয়েই দেখতে হবে৷‘ভালবাসার শহর’ আধঘন্টার একটি ছবি৷তবে বিনোদনমূলক ছবি একেবারেই নয়৷এখনকার দিনের ছবিগুলো একটু চটজলদি, শিহরণ দেওয়া, একটু সেক্স থাকবে, এই ছবি একেবারেই সেরকম নয়৷একটা ডিপ ইম্প্যাক্ট ফেলবে কিন্তু এ ছবি খুশি করবে না৷যার কাছে এই তিরিশটি মিনিট আছে৷ ছবি দেখার জন্য সময় বার করতে পারবে, তাঁরাই এই সিনেমাটি দেখুক৷আমি তাই চাইব৷

সোহিনী আর ঋত্বিক কমন? কেন?
ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী: জয়া এহসান আমার সঙ্গে ‘একটি বাঙালি ভূতের গল্প’ ছবিটিতে অভিনয় করেছে৷আর সোহিনী, এই ছবিতে মূলত আমার সহকারী পরিচালক হয়েই কাজ করেছে৷ এই ছবিতেও ছিলই না৷ পরবর্তীকালে একটি ছোট্ট চরিত্রে কাজ করেছে সোহিনী৷এবং সেই রোল আমার কাছ থেকে একরকম চেয়েই নেয়৷আর কি বলুন তো? কমফর্ট লেভেলটা এক বড় ব্যাপার৷সব ক্ষেত্রেই এটি আছে৷ শুধু সিনেমাতে নয়৷যার সঙ্গে কাজ করতে আমার সহজ লাগবে তার সঙ্গেই তো কাজ করব৷

সোহিনী ‘ভালবাসার শহর’ এ একজন সহকারী পরিচালক না ‘ভালবাসার শহর’ অভিনেত্রী? কোন সোহিনীকে বেশি পছন্দ?
ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী: ও নিজের উদ্যোগেই এই ছবিতে কাজ করেছে৷আসলে সহকারী পরিচালকের কাজটি কম খাটনির নয়৷ প্রথমদিকে ওর কাজ নিয়ে একটু ভয়ই পেয়েছিলাম৷ ভাবছিলাম পারবে কি পারবে না৷ তবে দেখলাম ও বেশ ডেডিকেশন নিয়েই কাজটি করেছে৷ প্রায় এক দুমাস এই ছবির জন্য খেটেছে, আর তাও বিনাপারিশ্রমিকে৷ ও একটা কথা বলে রাখি কোনও অভিনেতা-অভিনেত্রীই এই ছবির জন্য একটি টাকাও পারিশ্রমিক হিসেবে নেননি৷

এখন তো এত শর্ট ফিল্ম তৈরি হচ্ছে৷ভাল ছবি হচ্ছে কি? আর এই এতো ছবির ভিড়ে কোথাও ভাল ছবি বা ভাল পরিচালকেরা হারিয়ে যাচ্ছে?
ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী: এটা সত্যিই যে ভাল ছবির সংখ্যা কম৷আর যতদিন না ফিল্মমেকার আর দর্শকের একটি ডিরেক্ট কানেকশন তৈরি হবে ততদিন ভাল ছবি হওয়ার সম্ভাবনাও কম৷আগে যেমন সবাই কবি হতে চাইত এখন ফিল্মমেকার হতে চায়৷

তালে ভাল বাংলা ছবির প্রযোজক নেই বলছেন?
ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী: শর্ট ফিল্মস তো দূরের কথা৷বাংলায় ভাল ছবির প্রযোজক নেই৷ যা এই প্রযোজকেরা করেন তাকে টাকা অপচয় ছাড়া আর কিছু বলা চলে না৷আসলে এই প্রযোজকেরা অন্য একটি ব্যবসায় অর্জিত আইন বহির্বূত উদ্বৃত্ত টাকা খরচ করছেন, এবং তা দিনের পর দিন ধরে হয়ে যাচ্ছে৷এই দুর্দিনের বাজারেও, বছরে বাংলা ছবিতে ইনভেস্ট হয় প্রায় ১০০ কোটি আর হিসেব করলে দেখা যাবে তার ৬-৭% ফেরতও আসে না! রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট দেখলে দেখা যাবে ছবির ১০%ও ফেরত আসে না৷বাংলা ইন্ডাস্ট্রিই সারা ভারতের এমনই এক ইন্ডাস্ট্রি যেখানে প্রযোজকেরা নিজের শিক্ষা ও রুচি অনুযায়ী গল্প ও ছবির পরিচালককে নির্বাচন করেন না৷

তালে বাংলা ছবির আরেকটি কারন পিছিয়ে থাকার…প্রোডিউসার
ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী: একদমই৷ধরুন, একটি হাসপাতাল আপনি বানাচ্ছেন, কিন্তু আপনি নিজেও জানেন যে ৬ মাস পড়ে আপনি এই হাসপাতালটি থেকে পালিয়ে যাবেন৷ আপনি কী কোনও কিছুই করবেন যেটা থেকে এই হাসপাতালের স্থায়ী কিছু হয়? এই হচ্ছে বাংলা ছবি৷বাংলা ছবিতে লাভ করতে চায় এমন প্রযোজক খুব কমই আছে৷কিন্তু সেখানেই বাংলা টেলিভিশনে কিন্তু পুরোটা উল্টো৷গল্পের কনটেন্টের দৈনদশা তাও প্রফেশনালিসম আছে৷আর সেই কারণেই লাভ হচ্ছে৷ বাংলা ছবিতে লং টার্ম কমিটমেন্ট বলে কিস্যু নেই৷

আচ্ছা ‘পোস্ত’ শিবু-নন্দিতার ছবি..৪ দিনে এক কোটি৷ তার বেলা?
ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী: এক্সেপশান তো থাকবেই আর এক্সেসপশান মানেই একটি বীধিও আছে ৷ শিবু সেই এক্সেপশান, কিন্তু ওভারঅল বীধিই ঠিক নেই৷শিবু-নন্দিতার ব্যাপারটি একদম আলাদা৷ওনারা ঠান্ডা মাথায় ভাবে ছবির কনটেন্ট নিয়ে৷এই কনটেন্ট কিন্তু মোটামুটি একই রেখে ছবি করছেন শিবু-নন্দিতা৷একের পর এক ছবি সাফল্যের মুখও দেখছে৷আজকে ওনারা যে জায়গায় আছে, সেখানে একদিনে পৌঁছানো যায় না, পৌঁছতেও প্রায় ১০-১৫ বছর লেগেছে৷ওনারা ‘লং-টার্ম প্লেয়ার্স’৷ আলাদা কোন অং-বং-ছং ব্যবসা করে ছবি বানাচ্ছেন না৷ টাকাটা ওড়াতে আসেননি, ছবি বানাতে এসেছে৷

এখন ওয়েব সিরিজ ট্রেন্ডিং৷ সে নিয়ে ভাবছেন না?
ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী: ওয়েব সিরিজ কলকাতায় নতুন হতে পারে, এটা অনেকদিন আগে থেকেই শুরু হয়ে গেছে৷ আর এটা মানতে আমার কোনও বাধা নেই যে ইন্টারনেটই সিনেমার ভবিষ্যত৷ আমি শুধু এটা বলতে চাই ‘কপি-পেস্ট’ এর ব্যাপারটা মানুষ বুঝে গেছে আগে যারা তামিল ছবি দেখতেও বাংলা ছবি দেখতো, তাঁরাও আর বাংলা ছবি দেখেনা৷
আরেকটি মজার ব্যাপারও চলছে ওয়েব সিরিজ নিয়ে৷বাংলা প্রযোজকেরা ভাবছেন ওয়েব সিরিজে তো সেন্সর-টেন্সর নেই৷তাই একটু-আধটু শিহরণ দেওয়া যাবে, একটু সেক্স, একটু খোলামেলা লোকজন৷

এনারা এটা বোঝেননা দর্শকরা কী এত বোকা? এসব দেখতে হলে পর্ন দেখবেন৷ওয়েব সিরিজ দেখতে যাবে কেন?
অভিযোগ তো কম নেই? সেটি বাদ দিয়ে তোমার ‘ভালবাসার শহর’এ ফিরি? রিলিজ তো পিছিয়েছে সিনেমার৷তো কবে হচ্ছে রিলিজ?
ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী: না না অভিযোগ নয়, আমার মনে হওয়াগুলো, বললাম মাত্র৷ কিছু টেকনিক্যাল কারণেই পিছিয়েছে রিলিজ৷জুনের আশেপাশেই কোন দিনে রিলিজ করবে ছবি৷

Advertisement ---
---
-----