টেলকো-কে জাতীয়করণ করতে চেয়েছিলেন নেহরুর জামাই ফিরোজ গান্ধী

সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়: জীবনবিমা জাতীয়করণের বিলকে সমর্থন করার সময় ফিরোজ গান্ধী লোকসভায় বার্তা দিয়েছিলেন শুধু এই বিলকেই তিনি সমর্থন করছেন না, পাশাপাশি তিনি আওয়াজ তুলেছিলেন বেশ কিছু ক্ষেত্রকে রাষ্ট্রায়ত্ত করার৷ আর তখনই তিনি তুলে ধরেছিলেন টাটা গোষ্ঠীর কেলেঙ্কারির কথা৷ এই শিল্প গোষ্ঠীর টাটা ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড লোকোমোটিভ কোম্পানির (টেলকো) বেশ কিছু অনিয়ম তুলে ধরেন৷

সেই সময় এই সংস্থাটি জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে মুনাফা করছিল বলেও সংসদে সরব হয়েছিলেন৷ কারণ সরকার নিকৃষ্ট মানের রেলের ইঞ্জিন কিনছিল বেশি দাম দিয়ে৷ সেই সব তথ্য লোকসভায় ফাঁস করে সেদিন প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরুর জামাই ফিরোজ গান্ধী টেলকো জাতীয়করণের দাবি তুলেছিলেন৷

টাটা গোষ্ঠীর সঙ্গে ফিরোজ গান্ধীর সুসম্পর্কই ছিল৷ কিন্তু এক্ষেত্রে তিনি ব্যক্তিগত সম্পর্ককে প্রাধান্য দেননি জাতীয় স্বার্থের কথা ভেবে৷ সেই সময় রেলওয়ে বোর্ড এবং টাটা ইঞ্জিনিয়ারিং মধ্যেকার চুক্তির সমালোচনা করেছিলেন৷ ১৯৫৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর লোকসভায় ফিরোজ গান্ধী বলেছিলেন,‘‘ যা পরিস্থিতি তাতে সরকারের কাছে একমাত্র বিকল্প হল টাটা ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড লোকোমোটিভ কোম্পানিকে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় পরিণত করা৷

তা যদি আজ না করা হয় আমি নিশ্চিত তা আপনারা আগামিদিনে করবেন৷’’ পাশাপাশি ওই সময় তাঁর সুপারিশ ছিল আর যেন কখনও সরকার কোনও বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে ‘না-লাভ-না-ক্ষতি’ নীতিতে কখনও চুক্তি না করে৷

সাংসদ তথা লোকসভার পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি এবং স্ট্যান্ডিং ফিনান্স কমিটির সদস্য থাকার দরুন ফিরোজ গান্ধীর চোখে পড়েছিল, বেসরকারি সংস্থা টেলকো খুব সহজ শর্তে রেলকে বয়লার এবং লোকোমোটিভ সরবরাহের সুযোগ পেয়েছে অথচ সরকারি সংস্থা চিত্তরঞ্জন লোকোমোটিভ সংকটে দিন কাটাচ্ছে৷ এর ফলে তিনি তখন রেলের উপমন্ত্রী শাহনাওয়াজ খানের কাছে বেশ কিছু প্রশ্ন রেখেছিলেন৷

এর উত্তরে শাহনাওয়াজ খান জানিয়েছিলেন, টেলকো যেসব ধরনের লোকোমোটিভ সরবরাহ করে তাদের আমদানি করতে দাম পড়ে ৩,১৮,৩৩৪ টাকা থেকে ৪,১৫,৮৩৩ টাকা কিন্তু টেলকোর লোকোমোটিভের জন্য সরকার ৭ লক্ষ টাকা অনুমোদন করেছে ৷

তাছাড়া ওই ধরনের আমদানি করা লোকোমোটিভ চিত্তরঞ্জনে উৎপাদিত হলে তার জন্য দাম ধরা হচ্ছে ৬ লক্ষ টাকা৷ স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে কেন এমন দামের ফারাক করে দিয়ে টেলকোকে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে৷ বিষয়টা তখন লোকসভার অন্য সদস্যদের নজরে আসায় শুধুমাত্র মৌখিক জবাব যথেষ্ঠ নয় বলেই লোকসভার সদস্যরা মনে করেন৷ বিষয়টির আলোচনার জন্য আধ ঘন্টা সময় বরাদ্দ হয়৷ তবে পরে তা বাড়িয়ে দু’ঘন্টা করা হয়েছিল৷

স্বাধীনতার কয়েকদিনের মধ্যেই অর্থাৎ ২০ অগস্ট, ১৯৪৭ রেল বোর্ডের সঙ্গে টেলকোর চুক্তি হয় যা আবার তার থেকে দু’বছর আগে অর্থাৎ ১৯৪৫ থেকে কার্যকরী হওয়ার কথা বলা হয়৷ এরপর দেখা গেল টেলকো বয়লার এবং লোকোমোটিভ ঠিকমতো সরবরাহ করে উঠতে পারছে না৷ তাছাড়া আজমের লোকমোটিভ ওয়ার্কস যেখানে ১৮৯৬ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত ৪৬০টি লোকোমোটিভ উৎপাদন করেছে সেখানে উলটে বরাত দেওয়া বন্ধ হয়ে গেল টেলকোর উৎপাদন শুরুর আগেই৷

ফিরোজ তুলে ধরেছিলেন, আজমের লোকোমোটিভ থেকে হওয়া একেবারে দেশীয় লোকোমোটিভ যথেষ্টই উচ্চমানের ছিল৷ কারণ ১৯৩০ সালে লোকোমোটিভের জন্য প্রতি টন আমদানি খরচ ছিল যেখানে ১১৭০ টাকা, সেখানে আজমেরে উৎপাদন খরচ ছিল প্রতি টনে ১০০০ টাকা৷ এছাড়া কম সরবরাহের জন্য টেলকোকে ১২.৫১ লক্ষ টাকা জরিমানা ধার্য হলেও বোর্ড তা মকুব করে দিয়েছিল এবং টেলকোর প্রেফারেন্স শেয়ারে সরকার দু’কোটি টাকা বিনিয়োগও করেছিল৷

ওই সময় ফিরোজ বিস্ময় প্রকাশ করেন টারিফ কমিশনের আচরণ দেখে৷ কারণ তাঁর অভিমত, সেই সময় তো কমিশনের উচিত ছিল বিদেশে থেকে আমদানি করা জিনিসের চেয়ে দেশে উৎপাদিত পণ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া৷ সব মিলিয়ে ফিরোজের হিসাব অনুসারে তখন দেশের মানুষের পাঁচ কোটি টাকা গিয়েছিল টেলকোর তহবিলে৷ কিন্তু লগ্নি করা এই টাকার কোনও সুবিধা দেশ পাচ্ছিল না৷ আর তারই জন্য টাটা গোষ্ঠীর সংস্থাটিকে অধিগ্রহণের কথা সংসদে তুলেছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর স্বামী৷
তথ্য ঋণ
১) Feroze Gandhi : A Political Biography By Shashi Bhushan
২) Feroze Gandhi : A Crusader in Parliament By Tarun kumar Mukhopadhyay

----
-----