ক্লান্তিহীন কান্তি এখনও ছুটছেন …

একটা সময় ছিল, যখন রাজ্যের বামফ্রন্টের নেতারা উত্তর থেকে দক্ষিণ, কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ চষে বেড়াতেন৷ ব্যস্ততার মধ্যেই দিন-রাত কাটত৷ কিন্তু রাজ্যপাট হাতছাড়া হতেই তাদের প্রয়োজন ফুরিয়েছে৷ কেউবা নিজেকে আড়াল করে নিয়েছেন৷ কেউ করেছেন দলবদল৷ কিন্তু কিছু কমরেড এখন ঠিক কী করছেন? কী করে তাঁদের দিন কাটছে৷ সেই সব নিয়ে Kolkata24x7 এ বিশেষ ধারাবাহিক প্রতিবেদন #কেমন_আছেন_কমরেড?

দেবময় ঘোষ, কলকাতা:   বয়স ৭৫৷ ছুটছেন কান্তি ভূষণ গঙ্গোপাধ্যায়৷ জনগণের ‘কান্তি গাঙ্গুলী’৷ কেউ যদি বলেন, ‘‘আপনি বয়স্ক …পারবেন না’’ এমন কথা শুনলেই রেগে যান তিনি৷ বলেন,‘‘আমি এখনও যা কাজ করি, যুবক-যুবতিরা দেখে বিস্মিত হয়৷’’

কুলতলি যাওয়ার পথে পাওয়া গেল কান্তিবাবুকে৷ মথুরাপুরের প্রাক্তন বিধায়ক কখনই জনতার হৃদয় থেকে ‘প্রাক্তন’ হতে চান না৷ এক নিঃশ্বাসে বলেন, ‘‘সপ্তাহে তিন-চার দিন রায়দিঘীতেই থাকি৷ জয়নগর থেকে মথুরাপুর …পার্টি অফিসে ঘুরে ঘুরে যাই৷ আমার জীবনটাই তো পার্টি …৷’’

- Advertisement -

২০০১ বিধানসভা নির্বাচনে বাংলার ‘লাল-দূর্গে’ সবে আগাছার মতো মাথা তুলতে শুরু করেছে ঘাসফুল৷ মুখ্যমন্ত্রী হয়ে রাইটার্সে এলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য৷ সঙ্গে নিয়ে এলেন ‘উন্নততর’ বামফ্রন্ট৷ ওই নির্বাচনেই মথুরাপুর (ডিলিমিটেশনের পর আজ যা রায়দিঘী) বিধানসভা কেন্দ্রে কংগ্রেসের সত্য বাপুলিকে হারালেন কান্তি৷

রাজ্যের সুন্দরবন উন্নয়ন মন্ত্রী হিসেবে জলে-ঝঙ্গলের মানুষের ‘ঘরের লোক’ হয়ে ওঠা বর্ষীয়ান কমরেড প্রথম ধাক্কা খেয়েছিলেন ২০১১ তে৷ পরিবর্তনের ঝড়ে হারেন তৃণমূল প্রার্থী অভিনেত্রী দেবশ্রী রায়ের কাছে৷ সে সময় ভোটের ফলাফল দেখে যারা অবাক হয়েছিলেন, তাদের চোখে ভেসে উঠেছিল আইলা ঘূর্ণীঝড়ে বিধ্বস্ত সুন্দরবনের দৃশ্য৷ ধুতির কোঁচা হাঁটুর ওপর তুলে প্রকৃতিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে রাজ্যের এক মন্ত্রীর অদম্য সংগ্রামের দৃশ্য৷ ভোটের ফলাফল বলেছিল, সুন্দরবনের ‘ঘরের লোকে’র কথা ‘কেউ মনে রাখেনি…৷’

তবে শুধু পার্টির নেতা হয়েই থাকতে চাননা কান্তি৷ প্রতিবন্ধীদের মানসিক শক্তি জুগিয়ে এসেছেন৷ তাঁদের পাশে থাকেন সবসময়৷ এই প্রতিবেদককে বললেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রতিবন্ধী সম্মেলনীতে এসো একবার৷ ৬ অগস্ট হিরোসিমা দিবসে, মুকুন্দপুরে এক হাজার প্রতিবন্ধী মানুষ রক্তদান করবেন৷ প্রতিবন্ধীরা শুধু কী ভিক্ষাই চায়? তা নয়, তারা সমাজকে অনেক কিছু ফিরিয়ে দেয়৷ একটু থেমে আবার বললেন, ‘‘৬ তারিখ মুকুন্দপুরে এসো৷ রাহুল সিনহাকেও দেখবে৷ আবার মমতার ভাই বাবুনকেও দেখবে৷’’

কান্তিবাবুকে সবাই ভালোবাসেন৷ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় টিভি চ্যানেলে সাক্ষাৎকারে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, কান্তি গাঙ্গুলীর মতো নেতাদের আদর্শবান মানুষ বলেছিলেন৷ তবে ভোটের হিসেব যাই বলুক না কেন, রাজ্যের প্রাক্তন এই মন্ত্রীকে ‘ঘরের লোক’ হিসেবে শংসাপত্র দিয়ে রেখেছেন সুন্দরবনের সাধারণ জনতা৷

আর বামপন্থা? কান্তি গাঙ্গুলীর মতে, ‘‘রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে৷ …একটা কথা যেনে রেখো ভাই, বামপন্থার মৃত্যু হতে পারে না৷ এখন সাময়িক ভাটা পড়েছে৷ কখনও ভেবেছিলেন, নেপালে বামপন্থীরাই ক্ষমতায় আসবে? বামফ্রন্ট আবার ক্ষমতায় ফিরবে৷ মানুষই ফিরিয়ে আনবে৷ দেখো, ৯ তারিখ (৯ অগস্ট) ‘জেল ভরো’ নিয়ে কী উৎসাহিত তরুণ বামপন্থীরা৷’’

‘‘রাজ্যে অর্থনৈতিক সংকট চলছে, কৃষকেরা ফসলের দাম পায় না৷ এদিকে সবজির দামে আগুন৷ যুবক-যুবতির রোজগার নেই৷ এই তো কুলতলি যাচ্ছি ঘুরপথে৷ রাস্তার যা হাল৷ কোনও রক্ষণাবেক্ষনই নেই৷ তৃণমূল গণতন্ত্রকে খুন করেছে মানুষ শান্তি চায়৷ মেডিক্যাল কলেজে কী হল দেখেছো তো৷ তৃণমূল সমস্তস্তরে ভয়ভীতি তৈরি করেছে৷ মানুষ এবার মুক্তি চায়৷’’ বলে চললেন কান্তি৷

কিন্তু ক্ষমতা হারাবার পর রাজ্যে ক্ষয়িষ্ণু হয়েছে বামফ্রন্ট …৷ কান্তির স্বীকারোক্তি, ‘‘বামফ্রন্টের সাংগঠনিক দূর্বলতা রয়েছে৷ মতাদর্শগত মতপার্থক্য এই সাংগঠনিক দূর্বলতা তৈরি করেছে৷ বামপন্থীরাই এর জন্য দায়ি৷’’ এক নাগাড়ে ক্লান্তিহীন কান্তি৷ কোন এক কমরেড ঠিকই বলেছিলেন কান্তিবাবুর সম্পর্কে, ‘‘ক্লান্তিতে কান্তি নেই৷ আবার কান্তিতেও ক্লান্তি নেই৷ যেভাবে আপনি ভাববেন৷’’

Advertisement
---