নন্দীগ্রাম থেকে মুম্বই: অভিশাপের ১২ বছর

দেবময় ঘোষ, কলকাতা: কাস্তে-হাতুড়ি আঁকা লাল পতাকা হাতে হাজার হাজার চাষির মিছিল শহরের কালো রাস্তার রং বদলে দিয়েছে৷ মুম্বইতে কৃষক সভার মিছিল সারা দেশেই যেন বামপন্থী চেতনার জাগরণ ঘটিয়েছে৷ এক লহমায় আড়ালে চলে গিয়েছে ত্রিপুরায় লালদূর্গের পতন আর ভাঙা লেনিনের যন্ত্রণা৷

কিন্তু বুধবার, ১৪ মার্চ কমরেডদের কিছু পুরোনো অপ্রিয় স্মৃতি মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন৷ একজন সাচ্চা ভারতীয় কমিউনিস্ট ২০০৭-এর ১৪ মার্চ নন্দীগ্রামের দুঃসহ স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে রাখতে চাইবেন না৷ ভুল বোঝাবুঝি এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা যে দেশ-দুনিয়াকে নাড়িয়ে দিতে পারে, সে সময় পশ্চিমবঙ্গের বাম সরকার তা বুঝতে পারেনি৷ এক ধাক্কাতেই অনেকখানি পিছিয়ে পড়ে বামপন্থী কৃষক আন্দোলন৷

যে সরকার বলেছিল, ‘কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যত’, ভবিষ্যতকে সুরক্ষিত করতে তারা নিজেদের মজবুত ভিতকেই নাড়িয়ে দেয়৷ কৃষকদের চোখেই বিশ্বাসঘাতক হয়ে ওঠে বাম সরকার৷ আজ, ঠিক ১১ বছর পর মহারাষ্ট্রের রাস্তায় খালি পায়ে চাষিরা লাল পতাকা হাতে নিজেদের অধিকার অর্জনের লক্ষ্যে হেঁটে চললেন৷ বোধহয়, শাপমুক্তি হল!

- Advertisement -

নন্দীগ্রামের ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল ২০০৭-এর তিন জানুয়ারি৷ সারা দেশে রব উঠেছিল, বাংলার কমিউনিস্ট সরকারের ভোল বদল হয়েছে৷ সিপিএমের আসল চেহারা বেরিয়ে পড়েছে৷ পুঁজিবাদি গোষ্ঠী, বিদেশি বেসরকরি কোম্পানির স্বার্থ রক্ষা করতে নিজেদের ভিত্তি কৃষিতেই কাস্তের কোপ মেরেছে বাম সরকরা৷

এর পর ১৪ মার্চ নন্দীগ্রামে পুলিশের গুলিতে ১৪ জনের মৃত্যুর পর সারা দেশেই তোলপাড় শুরু হয়৷ বিজেপি এবং তার সহযোগী দলেরা পাঁচ দিন সংসদ অচল করে রেখেছিল৷ এর পর বিজেপি-তৃণমূল কংগ্রেস একযোগে রাজ্যে ৩৫৬ ধারা জারির দাবিতে সরব হয়েছিল৷ প্রাসঙ্গিক ভাবেই উঠেছিল মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের অপসারণের দাবি৷

নন্দীগ্রামের ঘটনা বিশ্লেষণ করার আগে ভেবে দেখা প্রয়োজন, সেখানে ঠিক কী হয়েছিল এবং কী করে ঘটল ওই ঘটনা৷ অবশ্যই, এই বিচার-বিশ্লেষণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কথা মাথায় রেখেই করতে হবে৷ প্রথমেই এটা পরিষ্কার হওয়া দরকরা যে, নন্দীগ্রামে পুলিশের ‘অ্যাকশন’ রাজ্য সরকারের তরফে ‘জমি-দখল’ করতে করা হয়নি৷

তাই জমি-হাঙড়ের যে কাল্পনিক তত্ত্ব কিছু সম্মানীয় বাঙালি যুক্তিবাদীরা খাঁড়া করে থাকেন, তা কাল্পনিক৷ এটা সত্যি ঘটনা যে, রাজ্য সরকার নন্দীগ্রামের কিছু এলাকায় ‘বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে’র (স্পেশাল ইকনোমিক জোন বা সেজ) আওতায় আনতে চেয়েছিল৷ উদ্দেশ্য ছিল, একটি ‘কেমিক্যাল হাব’ তৈরি করা হবে৷ শিল্প আসবে৷ আসবে কর্মসংস্থান৷ কিন্তু রাজ্য সরকারের ভূমি দফতরের তরফ থেকে জমি অধিগ্রহণের কোনও নোটিশই জারি করা হয়নি৷

তবে হ্যাঁ, রাজ্য সরকারি সংস্থা হিসেবে, হলদিয়া ডেভেলপমেন্ট অথরিটি একটি তথ্য নোটিশ আকারে প্রকাশ করেছিল৷ নন্দীগ্রামে কেমিক্যাল হাব হবে কি না এবং হলে কোন জায়গায় হতে পারে, তা নোটিশের মাধ্যমে জনতার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল৷ সিঙ্গুর-পরবর্তী পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সেই সময় বামপন্থীরা রীতিমতো কোণঠাসা৷ সিপিএমের স্থানীয় সাংসদ এম পি লক্ষণ শেঠ হলদিয়া ডেভেলপমেন্ট অথারিটির নোটিশ বিলি করতে থাকেন৷ আগুনে ঘি ঢেলেছিল সেই ঘটনা৷ নন্দীগ্রামের এক নম্বর ব্লকের বাসিন্দারা শুরু করেছিলেন রক্তক্ষয়ী আন্দোলন৷

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সরকারের ভুলের পালা শুরু হল এর ঠিক পরেই৷ জানুয়ারির তিন তারিখ থেকে মার্চের ১৪ তারিখ পর্যন্ত নন্দীগ্রামে যা ঘটেছিল, তার উপর ‘বুদ্ধবাবু’র সরকারের কোনও নিয়ন্ত্রণ ছিল না৷ পরিস্থিতি যখন হাতের বাইরে চলে গিয়েছে, তখন বাধ্য হয়েই এলাকা পুনরুদ্ধার করতে পুলিশ পাঠাতে হয় মুখ্যমন্ত্রীকে৷ সেই সময় হাওড়ায় বর্তমানের প্রতিবেদক হিসাবে কাজ করছিলাম৷ হাওড়া পুলিশের বড়কর্তা (যিনি এখন কলকাতা পুলিসের উচ্চপদে রয়েছেন) বললেন, ‘নন্দীগ্রামে যাচ্ছি৷’ কিন্তু, ওই রকম একটি ঘটনার সম্মুখীন হতে হবে, তা হয়তো তিনিও নিজেও বুঝতে পারেননি৷ পরে জেনেছিলাম, পুলিশের গুলি চালানোর নেপথ্যে ছিলেন ওই অফিসার৷

নন্দীগ্রামের জনতা গ্রাম পঞ্চায়েত অফিস ভাঙচূর করতে শুরু করলেন, সিপিএম কর্মীদের বাড়ি-ঘরদোরে আগুন লাগলেন৷ প্রায় ২,৫০০ সিপিএম কর্মী এলাকা থেকে পালালেন৷ রাস্তা কেটে দেওয়া হল৷ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন নন্দীগ্রামে আড়াই মাস ঘরে অস্ত্র হাতে ভূমি-রক্ষার নামে যারা তাণ্ডব চালাল, তারা কেউ সাধারণ গ্রামবাসী ছিল না৷ রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দাদের কাছে সব খবর থাকা সত্ত্বেও সরকার আলোড়িত হয়নি৷ ‘বুদ্ধবাবু’র সরকার ভেবেছিল ‘স্টেজে মেরে দেবে’৷

পরে যখন দেখা গেল, নন্দীগ্রাম থেকে সিপিএমকে “Clean” করার জন্য মাওবাদীরা ঘাঁটি গেড়ে বসেছে৷ তাদের উৎপাট করতে পুলিশকে চরম পদক্ষেপ নিতে হল৷ সেদিন পুলিশের সঙ্গী প্রায় ৪০০ সসস্ত্র সিপিএম ক্যাডারও লেগে যায় গুলি চালাতে৷ বাম জামানার ৩৪ বছরের ইতিহাসে এটি অন্যতম চরম প্রশাসনিক ভুল হয়ে থাকবে৷ সমস্যা প্লেগের আকার ধারন করার পর সরকার বাধ্য হয়েছিল ‘এরিয়া অপরেশন’ করতে৷ স্বাভাবিকভাবেই পরিস্থিতি চলে যায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে৷

ইতিমধ্যেই, বামফ্রন্টের ‘পে-রোলে’ থাকা কিছু মানুষ, যাঁরা নিজেদের বুদ্ধিজীবী বলে দাবি করতেন, তাঁরা হঠাৎই বাম বিরোধী হয়ে পড়েন৷ পুলিশের গুলি চালানোর জন্য বাম সরকার সমালোচিত এবং ধীকৃত হয়েছে৷ সেটাই তাদের প্রাপ্য ছিল৷ কিন্তু ওই বুদ্ধিজীবীরা কেন প্রশ্ন তুললেন না যে, কী ভাবে সাধারণ গ্রামবাসীর হাতে বন্দুক এল? মাওবাদী, জমিয়তরা কীভাবে নন্দীগ্রামে শক্ত জমি তৈরি করতে পারল? সিপিএমের যে ক্যাডাররা ভয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছিল, তারা আবার বন্দুক হাতে ১৪ মার্চ কীভাবে ফিরে এল? ক্যাডারদেরই বা অস্ত্র জোগাল কারা? যাঁরা পরিবর্তন চেয়েছিলেন, তাঁরা শুধু তৃণমূল কংগ্রেসকেই চেয়েছিলেন৷ প্রশ্নের উত্তর চাননি৷ নন্দীগ্রাম নামক বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের উত্তর আজও পায়নি সিপিএম৷

২০০৭-এর ফেব্রুয়ারির নয় তারিখে মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, নন্দীগ্রামে কোনও জমি নেওয়া হবে না৷ কিন্তু নন্দীগ্রামে তখন তুমুল সিপিএম-বিরোধী হাওয়া চলছে৷ প্রচার করা হচ্ছে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য জমি নেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ করে ফেলেছেন৷ ব্লকে পার্টির নেতা-কর্মীরা তত দিনে সব পালিয়ে গিয়েছেন৷ কে আর গ্রামবাসীদের সত্যি কথা বোঝাবে৷ জানুয়ারির দুই থেকে চার তারিখ পর্যন্ত কলকাতায় চলা কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক এবং ফেব্রুয়ারির ১৮ থেকে ১৯ পর্যন্ত চলা পলিটব্যুরোতে তত দিনে নন্দীগ্রামের প্রকল্প বাতিলের উপর শিলমোহর পড়ে গিয়েছে৷ তবে সিঙ্গুর নিয়ে পার্টি নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছিল৷ এই সব বার্তা অবশ্য নন্দীগ্রামের গ্রামে গ্রামে পৌঁছায়নি৷ ‘যে কোনও মুহুর্তে পুলিশ জমি নিতে আসতে পারে’, এই অপপ্রচার চলছিলই৷

পুলিশ এলে বটে৷ এলাকা দখল করতেই এলো৷ কিন্তু তা ভিন্ন কারণে৷ কেমিক্যাল হাবের জন্য জমি দখল করতে নয়৷ বরং যে মাওবাদীরা ঘাঁটি গেড়ে এলাকা দখল করেছিল, রাস্তা কেটে নন্দীগ্রামকে আলাদা করে রেখেছিল, তাদের হাত থেকে এলাকা উদ্ধার করতে পুলিশের আগমন হয়েছিল৷ রাজ্য প্রশাসন তা নন্দীগ্রামের জনতাকে বোঝাতে পারেনি৷ বরং মাওবাদীরা গ্রামবাসীদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে, পুলিশ চাষের জমি, বসতবাটি দখল করতেই এসেছে৷ ভূমি রক্ষা কমিটি জমি বাঁচাতে লড়াই করবে৷

নন্দীগ্রামে রাজ্য সরকার জমি নেবে না, এই বার্তা মানুষের কাছে যাতে না পৌঁছতে পারে, সেদিক থেকে সব প্রচেষ্টা চলতে থাকে৷ বুদ্ধিজীবীদের পাশাপাশি বিভিন্ন বিদেশি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, মিডিয়ার একটি অংশ জোর করে বাম বিরোধী সাধারণ জনমত তৈরি করতে থাকে৷ নন্দীগ্রামে সর্বদলের বৈঠকের টেবিলগুলিও ফাঁকা পড়ে থাকত৷ এর মধ্যেই কলকাতা হাইকোর্ট সরাসরি বিষয়টি নিয়ে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেয়৷

একটা সময় বামেদের শিল্পবিরোধী আখ্যা দেওয়া হত৷ ইমেজ ঠিক করতে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য একবার বলেছিলেন, ‘চাষির ছেলে কি চাষিই হবে?’ তাঁর কথাটা শহরের মানুষদের কাছে বেশ রোম্যান্টিক শুনিয়েছিল৷ কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর দেখানো স্বপ্ন কেনেননি গ্রামের চাষিরা৷ সিঙ্গুরের দগদগে ক্ষতে নন্দীগ্রাম আঘাত করেছিল৷ সে যতই না ভুল বোঝানো হোক মানুষকে৷ পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমের শেষের শুরু তখন থেকেই৷

Advertisement
---