শহরের বস্তির চোখে ফুটবল, বুকে স্বপ্ন ভাঙার ভয়

সুপর্ণা সিনহা রায়, কলকাতা: যে বাচ্চাকেই আপনি জিজ্ঞেস করবেন বড় হয়ে কি হবে? বই পড়তে ভালো লাগে? নয়তো বাবা মায়ের ভয়ে না হয় খানিকটা চাপেই বলে “হ্যাঁ বই পড়তে খুব ভাল লাগে৷ আমি পড়াশোনা করতে চাই৷” কিন্তু ছোট্ট জীবন কতটা বুঝতে শেখে তাকে বইয়ের পোকা হয়ে একদিন বড় হতে হবে৷ রোজগার করতে হবে৷ হতে পারে৷

কিন্তু এমন দৃশ্যের সঙ্গে এখানকার দৃশ্যটা ঠিক মেলেনা৷ রুবির ঝিল পারের বস্তি৷ এই বস্তিতে থাকা বাচ্চারা স্কুলে যাওয়ার থেকে খেলতে বেশি ভালবাসে৷ এমনিতেই স্কুলের খরচা চালানোর সাধ্য তাদের বাবা মায়ের নেই৷ কোনও রকমে পেট চলে৷ ছোটদেরও স্কুল, পড়াশোনা ঘিরে তেমন উৎসাহও নেই৷ যেখানে পান্তা বাড়ন্ত সেখানে বিরিয়ানির স্বাদের ক্ষুত ধরবে কে?

একসময় এই এলাকা ছিল অপরাধপ্রবণ৷ এলাকায় চুরি ছিনতাই ছিল রোজকার ঘটনা৷ এখন পরিস্থিতিটা অনেকটা উন্নত হয়েছে৷ কি করে হল? আজ থেকে সাত আট বছর আগে এখানকার সাধারণ মানুষ লক্ষ্য করেন ছোট ছোট ছেলেমেয়ে গুলোর পড়াশুনায় ঝোঁক নেই৷ সারাদিন খেলে বেড়ায়৷ তাহলে তাদের খেলতে দিলে কেমন হয়? এলাকার কয়েকটি হাউজিং কমপ্লেক্স ও স্থানীয় বাসিন্দারা মিলে গড়ে ফেলেন একটা ফুটবল ক্যাম্প৷ সেখানেই তাদের খাবারও দেওয়া হতে থাকে৷ প্রথম প্রথম খেলা আর খাবারের টানে বেশ কিছু শিশু কিশোর এসে জড়ো হয়৷ তাদের নিয়েই তৈরি হয় কোচিং সেন্টার৷

- Advertisement -

এখন সেই সংখ্যাটা ৭০ এ গিয়ে ঠেকেছে৷ সপ্তাহে তিনদিন কলকাতার নামী ফুটবল ক্লাবের প্রশিক্ষক চিন্ময় সরকার আসেন প্রশিক্ষণ দিতে৷ পারিশ্রমিক নেন নাম মাত্র৷ ঘাম ঝড়িয়ে ট্রেনিং শেষ করার পর দেওয়া হয় কোনও দিন ডিম কোনও দিন পাউরুটি কলা কিমবা ছোলা গুড়৷ কসরত করে গা ঘামানোর পর শরীরের মাসল গ্রোথের জন্য দরকার হয় প্রোটিনের কিন্তু যে সব বাড়িতে রোজ খাওয়াই জোটে না তারা প্রোটিন বেছে খাবে কী করে? তাই তার ঘাটতি পূরণ করার চেষ্টা করে এই ক্যাম্পের সঙ্গে যুক্ত থাকা অ্যাশোসিয়েশন৷ আনন্দপুর স্বামী বিবেকানন্দ সেবা সমিতি ও নবনালন্দা অ্যালুমনি অ্যাসোসিয়েশন৷

আট বছর আগে খেলা শুরু করে আজ যারা ১৬ কি ১৭এ পা দিল তাদের অনেকেই বেশ ভালো খেলে৷ টিম ঘরে তুলেছে প্রচুর ট্রফি৷ যা নিয়ে খুদে খেলোয়াড়দের উদ্বেগ উৎকণ্ঠার শেষ নেই৷ এদেরই একজন আই লিগে খেলছে৷ ঋত্বিক দাস খেলছে রিয়্যাল কাশ্মীর টিমের হয়ে৷

এক ক্লাস সিক্সের ছাত্র মোহনবাগান জুনিয়র দলের হয়ে খেলছে৷ বেশ কয়েকজন কলকাতা পুলিশের পরীক্ষাও দিল৷ ফলের আশায় রয়েছে৷ সবথেকে বড় কথা এই ছোটরাই আজ নিজেরা নিয়মানুবর্তী হয়ে বাবা মাকে শেখাচ্ছে৷ যে ছোট চোখ একসময় রাতে নেশাগ্রস্থ বাবাকে দেখত মাকে ধরে মারছে৷ সেই ঘরের ছেলেই শুধরে দিতে পারছে বাবাকে৷ সন্তানদের হাত ধরে নতুন শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে রুবির কাছের আনন্দপুর ঝিল পারের বস্তি৷ এই কয়েক বছরে এলাকায় অপরাধ কমে গিয়েছে অনেকটা৷ স্বামী বিবেকানন্দ সেবা সমিতির সভাপতি নলিনি রঞ্জন সিনহা জানালেন “বস্তির ছেলেদের এখানে ট্রেনিং দেওয়া হয়৷ ছেলেরা খুব ভাল খেলছে৷ মুখ্যমন্ত্রী নিজে খেলাধূলো পছন্দ করেন৷ আমাদের ছেলেদের জন্য যদি একটু দেখেন তাহলে খুব ভাল হয়৷ এই মাঠ নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে৷ দেড়শো কোটির প্রজেক্ট হচ্ছে এখানে৷ দিদির কাছে অনুরোধ বাচ্চা গুলোর প্রশিক্ষণের জন্য একটু জায়গা যদি ছেড়ে দেওয়া হয়৷”

খুদে খেলোয়াড়দের জার্সি কেনার সংস্থান নেই৷ ফুটবল কিনতে পারেনা৷ নেই খেলার জুতো৷ সেসবই দেওয়া হয় অ্যাসোসিয়েশন থেকে৷ তবু কোনও জুতো খারাপ হয়ে গেলেও তার ফিতে যদি জীবিত থাকে সেই ফিতেই অন্য জুতোয় বেঁধে মাঠে নেমে পড়ে এরা৷ কারণ এরা বুঝে গিয়েছে স্কিলটা জরুরি৷ টেকনিকটাই ওপরে নিয়ে যাবে৷ তাই গ্রীষ্ম হোক ভরা বর্ষা হোক হাড় কাঁপানো শীত হোক৷ ফুটবলের লোভ সামলাতে পারেনা এরা৷ ক্লাস সিক্সের ছেলে অরিজিৎ মণ্ডল জুনিয়র মোহনবাগান দলে খেলছে৷ জানাল “খেলা পড়াশুনা দুটোই ভাল লাগে কিন্তু খেলতে একটু বেশি ভাল লাগে৷ বড় হয়ে আরও ভাল খেলতে চাই৷” মাঠ চলে গেলে কিকরে প্র্যাক্টিস করবে এই প্রশ্ন করতেই মৌন হয়ে যায় সে৷ কথা খুঁজে পায়নি৷

খুদেদের কোচ চিন্ময় সরকার জানান “এরা খুব ভাল খেলে৷ ওয়েট ট্রেনিং করানো হয়৷ মাঠে সপ্তাহে তিন দিন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়৷ ভবিষ্যতে এখান থেকে অনেক ভাল ভাল খেলোয়াড় উঠে আসতে পারে৷” রুবির ঝিল পাড়ের বস্তির এক খুদের বাবা জানালেন “আমাদের বস্তির ছেলেরা এখানে খেলতে পারছিল৷ এখন সব বন্ধ হয়ে যেতে বসেছে৷ ছেলেরা ফুটবল খেলে নাম করছে৷ আমাদের বস্তিও অনেকটা উন্নত হয়েছে৷ এখন কী হবে বুঝতে পারছিনা৷” ওই বস্তির বেশির ভাগ পরিবারেরই রিক্সা চালিয়ে সংসার চলে৷ কারও বা পরোটার দোকান৷ ছেলে মেয়ে নিয়ে আগে উদাসীন থাকলেও এখন অনেকটা পাল্টেছে চিত্রটা৷ বস্তির ছেলে সৌরভ মন্ডল খেলছে জোরাবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাবের হয়ে৷ গোপাল শ যাদবপুর অগ্রগামীর গোলরক্ষক৷ সৌমেন দাস ও দীপঙ্কর বেনিয়াটোলা অ্যাথলেটিক ক্লাব, প্রসূন দাস অরোরা অ্যাথলেটিক ক্লাবের হয়ে খেলছে৷

এই কয়েক বছর সব ঠিক ছিল৷ কিন্তু সম্প্রতি সমস্যা দেখা দিয়েছে এদের খেলার মাঠটা নিয়ে৷ বিরাট মাঠ৷ এতদিন খালি পড়ে ছিল৷ মাঠটি কোলকাতা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (কেএমডিএ)-র৷ সেই মাঠেই নতুন প্রজেক্ট আসতে চলেছে৷ মাঠটিতে নাইট মার্কেট তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে৷ পাশেই বিরাট ঝিল৷ ঝিলের গা ঘেঁষে মাঠ৷ এখানেই দেড়শো কোটি টাকার নাইট মার্কেটের প্রজেক্ট হবে৷ এর পরই তৈরি হয়েছে এক অনিশ্চয়তার অন্ধকার৷ ছেলেরা খেলতে চায়৷ এই বয়সেও তারা বুঝতে পারছে পড়াশুনা না করলেও ভাল খেলোয়াড় হতে পারলে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যত রয়েছে তাদের সামনে৷ কিন্তু মাঠই যদি না থাকে ট্রেনিং চলবে কোথায়? এখন বেশ কয়েকটি প্রশ্ন উঠছে এই নাইট মার্কেট নিয়ে৷ যা এই খুদেদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণের মাঠ কেড়ে নিয়েছে৷

প্রশ্ন উঠছে নাইট মার্কেট নিয়েই৷ কেএমডিএর এই দেড়শো কোটির প্রজেক্ট যেখানে হবে সেখানে মাঠের গা ঘেঁষে রয়েছে প্রায় ৫০ ফুট গভীরতার ঝিল৷ আর মাঠের পাশেই রয়েছে বিদ্যুতের হাইটেনশন লাইন৷ নিয়ম অনুযায়ী হাইটেনশন লাইনের ৭০০ ফুটের ভেতরে কোনও দোকান বাজার করা বিপজ্জনক৷ এই বিষয়েই কথা বলতে চেয়ে আমরা যোগাযোগ করেছিলাম ১০৮ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শ্যামল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে৷ যিনি মোহনবাগানের প্রবাদ প্রতিম ফুটবলার ছিলেন৷ অধিনায়কও ছিলেন মোহনবাগানের৷ ইস্টবেঙ্গলেও দু’বছর খেলেন৷ কার্যত ময়দানের দুই প্রধানেই খেলেছেন৷ ফোন করা হলে তিনি প্রথমে বলেন “ব্যস্ত আছি৷” পরে আবারও যোগাযোগ করলে একই কথা বলেন৷

এখন বস্তির ছোট ছোট ছেলেদের ভবিষ্যত বেশ খানিকটা প্রশ্ন চিহ্নের সম্মুখীন৷ এত বছরের প্রচেষ্টায় যাদের জীবন খানিকটা বাঁধনে আনা গিয়েছে৷ হয়েছে বেশ খানিকটা পরিশীলিত৷ সেই দড়ি ছিঁড়ে গেলে আবার তাদের দিন রাত্রি পড়বে বস্তির পাশের পচা খালে৷ কে নেবে তার দায়? অনিশ্চয়তার খরস্রোত ছিটকে নিয়ে ফেলতে পারে অপরাধের মহাসাগরে৷ তারা আবার নতুন করে পাড় খুঁজে পাবে তো!

Advertisement ---
---
-----