অভিশপ্ত গাইশালের ‘মানব ভুলে’র রহস্য আজও অজানা

রানা দাস: জুলাই মাস ভারতীয় সেনার কাছে বিজয়ের মাস৷ কারণ, কাশ্মীর ভূখণ্ডে ঢুকে পড়া পাকিস্তান সেনাকে এই জুলাই মাসের ২৬ তারিখ চিরতরে খেদিয়ে দিতে পেরেছিল ভারতীয় সেনার বীর জওয়ানরা৷ ঠিক তার পরেই অগস্ট মাসটি ভারতীয় রেলের কাছে সব থেকে মর্মান্তিক একটা মাস৷ একটা মর্মান্তিক ঘটনা কাঁপিয়ে দিয়েছিল গোটা বিশ্বকে৷ আর এই মর্মান্তিক ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল কারগিল যুদ্ধও৷ কী সেই ঘটনা? যে মর্মান্তিক ঘটনা কলঙ্কিত করেছিল এই বাংলার মাটিকে৷ স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে বাংলার মাটি কেন সেদিন কেঁদে উঠেছিল৷

রানা দাস
এডিটর-ইন-চিফ
কলকাতা24×7

সেদিন কৃষ্ণপক্ষ৷ চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার৷ রাত তখন একটা তিরিশ মিনিট৷ উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে দ্রুতগতিতে ধেয়ে আসছে একটা যাত্রী ভর্তি এক্সপ্রেস ট্রেন৷ আবার দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে প্রায় একই গতিতে ধেয়ে আসছে আরও একটা ট্রেন৷ দু‘টো ট্রেনই ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার বেগে চলছে৷ ট্রেনের যাত্রীরা তখন গভীর ঘুমে আছন্ন৷

ট্রেন দু’টি কাছাকাছি আসতেই ড্রাইভাররা বুঝতে পারেন বড় ভুল হয়ে গিয়েছে৷ চোখে সামনেই তাদের মৃত্যুকে দেখতে পান৷ কারণ, তারা দেখতে পাচ্ছেন ট্রেন দু’টি চলছে একই লাইনে….৷ তখন আর তাঁদের কিছু করার ছিল না৷ বিপদ যা হওয়ার ততক্ষণে হয়ে গিয়েছে৷ তারপর…… কী হল? স্টেশন চত্ত্বরে প্রবল বিস্ফোরণ৷ কেঁপে উঠল আশপাশের এলাকা৷ ঘটনাস্থলে জ্বলছে আগুন৷ চারদিকে আর্তনাদ.. চিৎকার আর কান্নার রোল৷ স্টেশন চত্ত্বর রীতমতো লণ্ডভণ্ড৷

না এটা কোন বলিউড বা হলিউড সিনেমার চিত্রনাট্য নয়৷ এমন বাস্তব ঘটনাটি ঘটেছিল এই বাংলার মাটিতে৷ অনেকেই ভাবছেন তো, এটা কবে কোথায় হল৷ অনেকের চোখে হয়তো ভেসে উঠল সেই মর্মান্তিক ঘটনার পরবর্তী ছবিগুলো৷ হ্যাঁ.. ঠিকই ধরেছেন৷ এটাই ভারতের সব থেকে বড় রেল দুর্ঘটনা.. যা গাইশাল রেল দুর্ঘটনা বলেই সবাই জানেন৷ কিন্তু এই ঘটনার সঙ্গে কী করে কারগিল যুদ্ধের ঘটনা জড়িয়ে গেল, সেটাই ভাবছেন তো?

আজ থেকে ১৯ বছর আগে ১৯৯৯ সালের ২৬ জুলাই ভারতীয় সেনা আনুষ্ঠানিকভাবে কারগিল যুদ্ধ জয়ের কথা ঘোষণা করে৷ পাকিস্তান সেনাকে নাস্তানাবুদ করে কারগিল, দ্রাস, টাইগাল হিল এলাকাগুলিকে পাক সেনা মুক্ত করে ভারতের বীর সেনারা৷ তাতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার পাক অনুপ্রবেশকারী সেনাকে খতম করেছিল ভারতের বীর সেনারা৷ পাকিস্তানের সঙ্গে এই যুদ্ধে লড়াই করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সেনা জওয়ানদের কাশ্মীর ঘাঁটিতে নিয়ে জড়ো করা হয়েছিল৷ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সেনা ছাউনি থেকে প্রচুর জওয়ান কারগিল যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে অনেকেই শহিদ হয়েছিলেন৷ আবার অনেকে চাক্ষুস করেছিলেন যুদ্ধ জয়ের৷

২৬ জুলাই বিজয় দিবসের পরে হাসমুখ সেনা জওয়ানরা আবার নিজেদের সেনা ঘাঁটি ফিরছিলেন৷ তেমনি একটি অবধ-আসাম এক্সপ্রেসে নয়াদিল্লি থেকে ফিরছিল গুয়াহাটির দিকে৷ সেই ট্রেনের বেশির ভাগই ছিল ভারতীয় সেনা জওয়ানে ভরতি৷ দীর্ঘ তিনমাস যুদ্ধ শেষ করে তারা ফিরে যাচ্ছিলেন প্রিয়জনের কাছে৷ ওই ট্রেনের প্রথমদিকের কামরাগুলিতে প্রায় ঠাসা ছিল ভারতীয় সেনা জওয়ানে৷ অন্যদিকে, অসমের ডিব্রুগড় থেকে আসছিল ব্রহ্মপুত্র মেল৷ সেই ট্রেনেও ছিল প্রচুর ভারতীয় জওয়ান৷ আর এই দুই ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুর মহকুমার গাইশাল স্টেশনে৷ আর এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় সরকারি হিসেবে ২৯০ জন যাত্রীর মৃত্যু হয়৷ যদিও মৃতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে অনেক জল্পনা রয়েছে৷ কারণ, দুর্ঘটনায় দুমড়ে মুচডে গিয়েছিল বেশ কিছু জেনারেল কামরা৷ এই কামরায় যাত্রীদের কোন হিসেব থাকে না৷ আজও ওই দুর্ঘটনার প্রকৃত মৃতের সংখ্যা জানা যায়নি৷

তবে, ভারতের ইতিহাসে সব থেকে বড় এই রেল দুর্ঘটনা তৈরি করেছে বেশ কিছু প্রশ্ন৷ চিফ কমিশনার রেলওয়ে সেফটির তদন্তে ধরা পড়েছিল অবধ আসাম এক্সপ্রেস ট্রেনটি পাশেই বিহারের কিষণগঞ্জ স্টেশন থেকেই ভুল পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছিল শিলিগুড়ি দিকে৷ কিষণগঞ্জ, পাঞ্জিপাড়া এবং গাইশাল, এই তিনটি স্টেশনের কেবিনম্যানদের নজরে বিষয়টি এড়িয়ে যায়৷ আর তার জন্যই গাইশাল স্টেশনে ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার বেগে ছুটে আসা ব্রহ্মপুত্র মেলকে মুখোমুখি ধাক্কা মারে৷ এই ঘটনায় সিবিআই তদন্তও হয়৷ তারাও এই ঘটনাকে ‘মানব ভুল’ বলে দাবি করে৷

কিন্তু এই ঘটনার পিছনে রয়ে যায় অনেকগুলো প্রশ্ন৷ যার সঙ্গে বার বার উঠে আসে কারগিল যুদ্ধের কথা৷ কাশ্মীর দখল করতে এসে কারগিল যুদ্ধে ভারতীয় সেনার কাছে নাস্তানাবুদ হয় পাক সেনা৷ বাধ্য হয়েই পিছু হটতে হয় পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিককে৷ কারগিল যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হতেই ভারতীয় সেনার ওপর আঘাত হানতে নামানো হয় পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইকে৷ জুলাই মাস থেকে ভারতের নানা স্থানে চোরাগোপ্তা হানা শুরু করে ভারতে থাকা আইএসআই এজেন্টরা৷ গাইশাল দুর্ঘটনার পর যে পরিমাণ ভারতীয় সেনা জওয়ানের মৃত্যু হয়, তাতে প্রাথমিকভাবে এই ঘটনাকে নাশকতা বলেই মনে করছিল সেনা গোয়েন্দারা৷

কারণ আঘাতটা হয়েছে সরাসরি সেনার ওপর৷ কিন্তু তদন্তের রিপোর্টে কোথাও বলা ছিল না এটা নাশকতা৷ প্রশ্ন এখানে! এক সঙ্গে তিনটি স্টেশনের কেবিনম্যান, স্টেশন মাস্টার কী করে ভুল করে গেলেন? তাদের কী ভুল করতে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল? যে মানব ভুলের জন্য এতগুলো অসহায় প্রাণ চলে গেল, সেই ‘মানব ভুল’ কেন??? উত্তর আজও অজানা৷

----
-----