‘এই মুহূর্তে সবথেকে সাংঘাতিক অবস্থা মা উড়ালপুলের’

কলকাতা:  উল্টোডাঙা-পোস্তার স্মৃতি উস্কে মঙ্গলবার ভেঙে পড়েছে মাঝেরহাট ব্রিজের একটা অংশ৷ কিন্তু পাঁচ বছরে এই তিন-তিনটে উড়ালপুল ভেঙে পড়ার কারণ কি? কোথায় ফাঁক? বাকি উড়ালপুলগুলোরই বা কি ভবিষ্যৎ? মাঝেরহাট বিপর্যয়ের পরই তার বিশ্লেষণ করলেন ভূ-তত্ত্ববিদ সুজিব কর৷ অনুলিখনে দেবযানী সরকার

দুর্ঘটনাটা ঘটার পর থেকেই দেখছি একে অপরের উপর দোষ চাপিয়ে দায় ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করছে৷ আসলে দোষটা সবার৷ এই জায়গায় রেলেরও দোষ আছে, পিডব্লুডিরও দোষ রয়েছে৷ গতকাল খবর পাওয়ার পরই আমি নিজে ঘটনাস্থলে গিয়েছি৷ গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি সবাই খেয়াল করছে না সেটা হল কলকাতার মাটির তলার স্ট্রাকচারটার উপরের অংশ কোমল একটি পলিস্তর৷ এই পলিস্তরের নীচ দিয়ে ফাঁপা একটি স্তর রয়েছে যেটা নুড়ি-কাঁকর-বালি মিশ্রিত৷ এর মধ্যে দিয়ে প্রচুর পরিমাণে সারফাসেস ফ্লো হিসেবে অনেক জল বেরিয়ে যায়৷ সেই জল দু-দিকে বেরিয়ে যাচ্ছে৷

এক, গঙ্গার দিকে, দুই বঙ্গোপসাগরের দিকে৷ যার ফলে কলকাতায় এই সমস্যাটা ধীরে ধীরে বাড়ছে৷ এটা এখন দু-তিনটে ব্রিজের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ঠিকই৷ বিশেষ করে গঙ্গার তীরবর্তী জায়গা বেশি করে ফাঁপা হয়ে যাচ্ছে তাই সেখানে বেশি পরিমাণে প্রভাব ফেলছে৷ আর দূরে যারা রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে প্রভাবটা একটু পরে আসবে৷ কিন্তু আসবেই৷

- Advertisement -

মেট্রো রেলের যে কাজটা হচ্ছে সেটা তো একটা বড়সড় রকমের কনসট্রাকশন হচ্ছিল তার একটা ভাইব্রেশন রয়েছে৷ পাশ দিয়েই গেছে রেল লাইন৷ প্রত্যেকটা ট্রেন যাওয়ার সময় নূন্যতম একটা ভাইব্রেশন মাটিতে তৈরি হয়৷ দ্বিতীয় বিষয়টি হল এর পাশ দিয়েই একটা ক্যানেল রয়েছে একটা ক্যানেলটা সারফাসেস ফ্লো হিসেবে প্রচুর জলকে টেনে নেয় এই অঞ্চলের৷

ফলে এই জায়গার মাটির তলাটা একদম ফাঁপা হয়ে গেছে৷ এছাড়া ভারী লরি, ট্রাক যায় ব্রিজের উপর দিয়ে৷ আর এটা তো দীর্ঘদিনের একটা ব্রিজ৷ যে পরিমাণ রক্ষণাবেক্ষণ দরকার ছিল সেটা হয়নি৷ মাঝেরহাট ব্রিজটার নীচের দিকে গিয়ে দেখলে এখনও দেখা যাবে তারাতলা ব্রিজটা একটা সাপোর্ট দিয়ে দাঁড় করানো রয়েছে৷ সেটা খুবই ঢিলেঢালা একটা সাপোর্ট৷ তবে এটা একার কারোর দোষ নয়৷ মাটির স্ট্রাকচার এমনভাবে রয়েছে যে এখানে ব্রিজ করতে গেলে নিয়মিত মনিটরিং দরকার৷ তবে সেটা শুধু ব্রিজের উপরে নয় মাটির তলার অবস্থাটাও মনিটরিং করা দরকার৷ আসলে আমাদের মাটির তলা মনিটরিং-এর কোনও ব্যবস্থা নেই৷

এই এটা ব-দ্বীপ অঞ্চল৷ এই অঞ্চলের বৈশিষ্ট হল মাটির তলার স্তর ও উপরের স্তর সম্পূর্ণ আলাদা৷ কোমল উপরের স্তরের এই কনস্ট্রাকশনগুলো দেখেছি৷ বর্ষার আগে এবং বর্ষায় পরে নজরদারির প্রয়োজন হয়৷ প্রি-মনসুন পিরিয়ডে যদি শূন্যস্থান থাকে তাহলে জল প্রবাহের মাত্রাটা বেড়ে যায় তাহলে বর্ষায় মধ্যেই প্রভাবটা আসে৷ আর বর্ষার মধ্যে যদি জল প্রবাহের মাত্রা বাড়ে তাহলে বর্ষা পরবর্তী সময়ে প্রভাবটা আসবে৷ সাধারণত বর্ষা পরবর্তী সময়েই রাস্তায় ধস নামতে দেখা যায়৷

উল্লেখযোগ্য বিষয় হল এই স্তরটা মাটির তলাতে আছে প্রায় ৪০ মিটার গভীর পর্যন্ত৷ ৪০ মিটারের পরই রয়েছে এবড়োখেবড়ো নুড়ির স্তর৷ কলকাতায় যে বহুতল বা ব্রিজ রয়েছে তার অধিকাংশই ৪০ মিটারের উপরে৷ তাই নীচের অংশ যদি শূন্যস্থান হয়ে যায় তাহলে যে কোনও মুহূর্তেই এই ধরণের বিপর্যয় ঘটা অবাক ব্যাপার নয়৷ তাই এই দুটো সময়ে নজরদারি না হলে কলকাতার সমস্ত ব্রিজেই এই দুর্ঘটনা হবে৷

এই মুহূর্তে সবথেকে সাংঘাতিক অবস্থা মা উড়ালপুলের৷ পার্ক সার্কাস সেভেন পয়েন্ট দিয়ে গেছে এই ব্রিজটা৷ কলকাতার অন্যান্য যে কোনও জায়গার থেকে এই সেভেন পয়েন্টে সব থেকে ভাইব্রেশন হয়৷তাই ওই উড়ালপুলের মাটির শূন্যস্থান অনেক বেশি৷ প্রতিবছর শীতের আগে আগে ওখানে ধস নামে৷ অনেকদিন আগে থেকেই মাঝেরহাট ব্রিজ নিয়ে সতর্ক করা হচ্ছিল৷ এছাড়া, ঢাকুরিয়া, চেতলা, ব্রেসব্রিজ খুব বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে৷ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যাঁরা এই বিষয়গুলো বোঝেন তাদের একটা টিমকে দিয়ে নিয়মিত নজরদারি করাতে হবে৷ নিয়মিত সার্ভে করতে হবে৷ প্রয়োজনীয় ইনস্ট্রুমেন্ট তৈরি করতে হবে৷ যদি দু-তিনটে বোর হোল তৈরি করে রাখা যায় তাহলে তার ডেটা নিয়মিত চেক করা উচিত৷

ফাইল ছবি

বোর হোল চেক করার সময় কতটা পরিমাণ সেলিমেন্টস লাইট পড়ছে সেটা ধারণা করা যেতে পারে৷আর একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ডাম্পি লেভেল সার্ভে৷ হঠাৎ স্লো গ্রেডিয়েন্ট চেঞ্চ হচ্ছে কিনা সেটার কারণ খুঁজতে হবে৷ স্ট্রাকচারাল ডিফেক্ট এই ব্রিজের ক্ষেত্রে ছিল না৷ কারণ এটা একটা প্রান্ত থেকে ভেঙেছে৷

Advertisement ---
---
-----