সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: বিদ্যাসাগরের হাত থেকে গিরীশ মুখুজ্জ্যে স্কলারশিপ পেলেন। আর তারপর সেই টাকাতেই শুরু শক্তির আরাধনা। শুরু গিরীশ ভবনে দুর্গা পূজার। যা এই বছরে ১৯৫ বছরে পা দেবে। মহানগরের বেশীরভাগ বনেদীবাড়ির পুজো শুরু হয়েছিল ইংরেজদের আনুগত্যের বদলে পাওয়া অর্থ থেকে। জাঁকজমকও তেমন। কিন্তু ভবানীপুরের গিরিশ মুখোপাধ্যায় আনুগত্যে নয় , শিক্ষার জোড়ে শুরু হয়েছিল।

Advertisement

১৮২৩ সাল, ওই বছর তরুণ গিরীশ মুখোপাধ্যায় তৎকালীন ক্যালকাটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গোল্ড মেডেল পেলেন। জলপানি বা স্কলারশিপ হিসাবে পেলেন ৫০০ টাকা। কার হাত থেকে পেলেন জলপানি? স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের হাত থেকে। মুখুজ্জ্যে বাড়িতে আগে থেকেই পুজো পার্বণের রীতি ছিল। বাড়িতে জগদ্ধাত্রী পুজো হত। মাটির ঠাকুরদালান ছিল।

এবার স্কলারশিপের টাকায় পাকা হয় ঠাকুরদালান। শুরু হয় দুর্গাপূজা। নিজে ওকালতি করে যে অর্থ উপার্জন করতেন তা বেশিরভাগটাই মহিষাসুরমর্দিনীর আরাধনা ও জাঁকজমকে খরচ করতেন। পরিবারের প্রবীণ সদস্য রথীন্দ্র মুখোপাধ্যায় বলেন, “আমরা বারুইপুর থাকতাম। সেখান থেকে এখানে এসে পুজো শুরু হয়। এখন নবম প্রজন্ম চলছে।”

রথীনবাবু বলেন, “আমাদের পুজো বিশাল কোনও প্রতিপত্তি নিয়ে শুরু হয়নি। তাই গিরীশ মুখোপাধ্যায় দেবত্ত সম্পত্তি করেননি। উনি জানতেন পরের প্রজন্ম সমস্যায় পড়লে তখন পুজো চালাতে সমস্যা হবে। তাই এমন ব্যবস্থা।” প্রবীণতম সদস্য পুলক কুমার মুখোপাধ্যায় বলেন,”প্রথম হুগলী থেকে পুরোহিত এসে পুজো করেছিল। এখনও সেই পরিবারই আমাদের পুজো করেন।” একইসঙ্গে তিনি বলেন, “ঢাক থেকে শুরু করে ঠাকুর গড়ার কুমোর সবাই বংশপরম্পরায় আমাদের পুজোর সঙ্গে যুক্ত।”

তবে কুমোরের কাজ ঠাকুরের রঙ করা পরজন্ত।তারপরের ঠাকুরকে সাজানোর কাজটা পুরোটাই পরিবারের সদস্যরাই করেন। রথীন্দ্র মুখোপাধ্যায় বলেন “ছোটবেলায় পুজোর আসল আকর্ষণ ওটাই ছিল। বর্তমান প্রজন্মও একই ভাবে সেটা ধরে রেখেছে। অফিস থেকে ফিরে তারপর ঠাকুর সাজানো শুরু হয়।” আগে যার নামে সংলল্প হত তাকে ষষ্ঠী থেকে নবমী সারাদিন উপোস করে থাকতে হত। এখন ওই নিয়মটা শুধু পরিবর্তন করে দিয়েছি।

এখনও একই কাঠামোতেই তৈরি হয় ঠাকুর। ব্রাহ্মণ পরিবার তাই খিচুরি অন্যভোগ দেওয়া হয়। সঙ্গে লুচি, পাঁচ রকম ভাজা, পোলাও মিষ্টি থাকে। থাকে ফলও। তবে পুজোতে বলিদানের কোনও রীতি নেই। পুলক কুমার মুখোপাধ্যায় বলেন, “আমাদের বৈষ্ণব মতে পুজো হয় তাই বলিদানের কোনও ব্যবস্থা নেই।” পরিবারের সদস্যদের থেকে জানা যায় একসময় মশাল জ্বালিয়ে ঠাকুর বিসর্জনে নিয়ে যাওয়া হত। পুলিশের বারন আছে তাই বছর দশেক আগে সেই রীতিতে পরিবর্তন এনে আলোক সজ্জার মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের কাঁধে চড়ে প্রতিমা নিরঞ্জন হয়। বহু মানুষ পুজোর জন্য শাড়ি দেন। অতিরিক্ত শাড়ি পুজোর শেষে যায় গরীব মানুষের ঘরে।

----
--