সবুজ ঝড়েও অশান্ত বাংলা

কুমারেশ হালদার, কলকাতা: বাংলা ভোটের উঠসবে বিপুল জনসমর্থন পেয়ে দ্বিতীয়বারের জন্য নবান্ন দখল করেছে শাসক তৃণমূল৷ বাম-কংগ্রেস-বিজেপিকে উড়িয়ে তৃণমূল একাই ২১১৷ কিন্তু, বাংলার জনগণের ভরপুর আশীর্বাদ পেয়েও রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে আক্রমণ অব্যাহত বিরোধীদের উপর আক্রমণ৷ ভোট মিটতেই যে ভাবে বিরোধীদের উপর আক্রমণ নেমে এসেছিল, ঠিক একই ভাবে সমস্ত সন্ত্রাসকে টেক্কা দিয়ে ফের স্বমহিমায় বাংলায় ভোট পরবর্তী হিংসা৷ কোথাও বাড়ি ভাঙচুর-আগুন-ইট-বৃষ্টি, লণ্ডভণ্ড বিরোধীদলের পার্টি অফিস৷ উত্তর থেকে দক্ষিণ, গুলি-বোমা-হুমকি চলছেই৷

cpim1শনিবার, সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক ও প্রাক্তন বিরোধী দল নেতা সূর্যকান্ত মিশ্রের নিজের কেন্দ্র পূর্ব মেদিনীপুরের নারায়ণগড়ে সিপিএমের পার্টি অফিসে ভাঙচুর ও দখল নেওয়ার অভিযোগ উঠল স্থানীয় তৃণমূল সমর্থকদের বিরুদ্ধে৷ জানা গিয়েছে, সূর্যকান্ত মিশ্রের বাড়ি থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে খাজুরদা ও খাজুরদা বাজারে দুটি সিপিএম পার্টি অফিসে শুক্রবার রাতে হামলা করে একদল দুষ্কৃতী৷ চলে ভাঙচুর, আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয় খাজুরদা বাজারের পার্টি অফিসে৷ শুধু সূর্য-বাবুর একদা দুর্গ নারায়ণগড়ই নয়, ফলপ্রকাশের ৪৮ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই প্রকাশ্যে খোদ উত্তর কলকাতার শ্যামপুকুরে তৃণমূলের গোষ্ঠীকোন্দল৷ অভিযোগ, শুক্রবার রাতে নিজেদের দলেরই বিরোধী গোষ্ঠীর উপর হামলা চালায় সদ্য নির্বাচিত বিধায়ক শশী পাঁজার অনুগামীরা৷ রাতেই ঘটনাস্থলে যান বিধায়ক শশী পাঁজা৷ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হন তিনি৷ অভিযোগ বিরোধীদের৷ শ্যামপুকুরে পর টালিগঞ্জ৷ ফল প্রকাশ হতেই ১১১ নম্বর ওয়ার্ডের আক্রান্ত সিপিএম। অভিযোগ, গতকাল রাতে নারকেলবাগানে সিপিএমের লোকাল কমিটির সম্পাদক শ্যামল লাহিড়ির বাড়িতে মুখে কাপড় বেঁধে হামলা চালায় তৃণমূল-আশ্রিত দুষ্কৃতীরা। বাড়ি লক্ষ্য করে ইট ছোড়া হয়। ওই এলাকারই বাসিন্দা সিপিএম কর্মী যুধাজিৎ গোস্বামীকেও মারধর করা হয়। পাশাপাশি, ১১১ নম্বর ওয়ার্ডে সিপিএমের দলীয় কার্যালয়টিতেও ভাঙচুর চালানো হয় বলে অভিযোগ। সবকটি ক্ষেত্রেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে শাসকদল৷ টালিগঞ্জের পর কামারহাটি৷ মদন মিত্রের হারের পরই দেশপ্রিয়নগরে সিপিএমের আঞ্চলিক কমিটির অফিসে ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। তালা ভেঙে তৃণমূল-আশ্রিত দুষ্কৃতীরা সিপিএমের ওই কার্যালয়ের আসবাব ভাঙচুর করে বলে অভিযোগ। থানায় অভিযোগ দায়ের হলেও অধরা দুষ্কৃতীরা৷

cpimশহর কলকাতার পাশাপাশি, শাসক দলের রোষের মুখে পড়তে হয় বাঁকুড়ার বড়জোড়া কেন্দ্রের নব নির্বাচিত সিপিএম বিধায়ক সুজিত চক্রবর্তীকেও৷ বড়জোড়ার বেরিয়াতোরের চাঁদুরিয়া মোড়ে তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে ছোঁড়া হয় বোমা, একটুর জন্য প্রাণে বেঁচে যান তিনি৷ বর্ধমানের জামুড়িয়া সিপিএম কার্যালয়ে দখল নেয় তৃণমূল কংগ্রেস৷ আতঙ্কে এলাকাবাসী৷ হুগলীর আরামবাগে চণ্ডিবাড়িতে প্রাক্তন সাংসদ শক্তিমোহন মল্লিকের বাড়িতেও হামলা চালায় রাজ্যের শাসকদলের দূষ্কৃতীরা৷ আলো নিভিয়ে লুঠ করা হয় টাকা, গয়না৷ প্রতিক্ষেত্রেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে তৃণমূল কংগ্রেস৷ ভোটে হেরে এবার তৃণমূলের বিরুদ্ধে গণনা পরবর্তী সময়ে সন্ত্রাসের অভিযোগ তুলে হাওড়ায় পুলিশ কমিশনারকে শনিবার স্মারকলিপি দিল বামেরা। সঙ্গে ছিল কংগ্রেস। ভোট মিটতেই নদিয়ার কল্যাণী বিধানসভা কেন্দ্রের সগুণায় সিপিএম সমর্থকের বাড়ি ভাঙচুর, মারধরের অভিযোগ। অভিযোগের তির তৃণমূলের দিকে। অভিযোগ, গতকাল গভীর রাতে বেশ একদল দুষ্কৃতী সিপিএম সমর্থক অলক সরকারের বাড়িতে ভাঙচুর চালায়। পরিবারের সদস্যদের মারধরও করা হয় বলে অভিযোগ। থানায় অভিযোগ দায়ের হয়েছে। ঘটনায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে তৃণমূল।

- Advertisement -

blgদক্ষিণবঙ্গের পাশাপাশি, উত্তরবঙ্গেও অব্যাহত ভোট হিংসা৷ ভোটের ফল প্রকাশের পর রাজনৈতিক হিংসা অশান্ত মালদহে। মালদহের গাজোলে কংগ্রেসের ব্লক সভাপতিকে বেধড়ক মারধরের অভিযোগ ওঠে। সত্য নারায়ণ প্রসাদ নামে আহত ওই কংগ্রেস নেতা চিকিৎসাধীন মালদহ মেডিক্যাল কলেজে হাসপাতালে। অভিযোগের তির শাসক দলের দিকে৷ এদিনের এই ঘটনায় সত্য নারায়ণ বাবু জানান, বিধানসভা ভোটে গাজোল বিধানসভা কেন্দ্রে জোট প্রার্থী দীপালি বিশ্বাস তৃণমূলের সুশীল চন্দ্র রায়কে ২০ হাজার ৬০২ ভোটে পরাস্ত করে। অভিযোগ, তার পর থেকেই তৃণমূল নেতৃত্ব এলাকায় সন্ত্রাস সৃষ্টি করছিল। গতকাল রাতে সত্য নারায়ন বাবু বাড়ি ফিরছিলেন তখন হঠাৎ কিছু দুষ্কৃতী তাঁর ওপর চড়াও হয়। তাঁকে বেধড়ক মারধর করা হয়। ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় গাজোল থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী। তবে, এই ঘটনা তৃণমূলের যুক্ত থাকার কথা অস্বীকার করে বলেন, ‘‘এটা বামফন্ট ও কংগ্রেসের মধ্যে সংঘর্ষ।’’

সিপিএম ও তৃণমূলের সংঘর্ষে উত্তপ্ত দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুর থানা এলাকা। সংঘর্ষে জখম ১০ জন৷ তাঁদের মধ্যে দু’জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের মালদহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। জখমদের অধিকাংশই তৃণমূলের নেতাকর্মী বলে জানা গিয়েছে। তৃণমূলের অভিযোগ সিপিএমের লোকেরাই তাঁদের কর্মীদের উপর প্রথমে হামলা চালিয়েছিল। সিপিএম অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছে। গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কারণে তৃণমূলের নেতা কর্মীরা নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে জখম হয়েছেন বলেও পাল্টা অভিযোগ করেছে সিপিএম। গঙ্গারামপুর থানা এলাকার ৬-নং গঙ্গারামপুর পঞ্চায়েতের দুর্গাপুর গ্রামের এই ঘটনায় চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে, সিপিএমের জেলা সম্পাদক তথা প্রাক্তন মন্ত্রী নারায়ন বিশ্বাস বলেন, ‘‘সকলেই জানে গঙ্গারামপুরসহ সারা জেলাতে তৃণমূলের গোষ্ঠী সংঘর্ষের কথা। গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের জেরে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছিল। গোষ্ঠী কোন্দল আড়াল করতেই সংঘর্ষ ঘটিয়ে দায় চাপানোর চেষ্টা চালাচ্ছে তৃণমূলই৷’’ গঙ্গারাম্পুর থানার পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়েছে। তবে, এখন কেউ গ্রেফতার হয়নি।

সবুজ ঝড়ের ৭২ ঘণ্টা পরেও অশান্ত বাংলা

আরও পড়ুন–

কোনও সমীক্ষাতেই আগ্রহ দেখাচ্ছেন না নেতা-মন্ত্রীরা

চার প্রতিবেশীকে হারিয়ে রাজ্যে ‘নোটা’র প্রত্যাবর্তন

আইপিএল ফেলে বুকিদের বাজি বাংলা ভোটের উৎসবে

এবারের ভোটে সংখ্যালঘু উন্নয়ন ইস্যুতে চক্রব্যূহে মমতা

ক্ষমতার লড়াইয়ের আড়ালে থেকেই যাচ্ছে ভোট সন্ত্রাস আর হিংসা

ফল নিয়ে ভেজাল নয়, আগমার্কা রিপোর্ট চায় আলিমুদ্দিন

 

Advertisement ---
---
-----