সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: কেউ ৩৫ বছর, কেউবা ২৫ বছর। একই জায়গায় বসে কাজ করে চলেছেন তাঁরা। তবে, কলকাতা হাইকোর্টের টানা কর্মবিরতি হতাশা এখন বাড়িয়ে তুলেছে তাঁদের৷

তাঁরা, টাইপিস্ট৷ কম্পিউটারের যুগে এমনিতেই নিজেদেরকে তাঁরা ‘অচলে’র তালিকায় ফেলেছেন৷ এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা অচলবস্থা সেই যন্ত্রণাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে৷ তাঁরা বুঝতে পারছেন না, কবে মিলবে স্বস্তি৷

Advertisement

আরও পড়ুন: জেনে নিন শনিবারের বাজারদর

গত ১৯ ফেব্রুয়ারি, কলকাতা হাইকোর্টে কর্মবিরতির ডাক দেন আইনজীবীরা। দাবি, বিচারপতির সংখ্যা বৃদ্ধি। তথ্য অনুযায়ী, কলকাতা হাইকোর্টে অনুমোদিত বিচারপতির সংখ্যা ৭২। কিন্তু, বহাল রয়েছেন মাত্র ৩৩ জন বিচারপতি। আইনজীবীদের অভিযোগ, বিচারপতির সংখ্যা কম থাকার কারণেই মামলার ফয়সালা হতে প্রচুর সময় লেগে যায়। এর প্রতিবাদেই তাঁরা কর্মবিরতিতে নেমেছেন৷

একমাস পেরিয়ে যাওয়া টানা এই কর্মবিরতির জের গিয়ে পড়ছে হাইকোর্ট সংলগ্ন স্থানের টাইপিস্টদের উপর। তার জন্য, কেউ যেমন বাইরে থেকে কাজ নিয়ে এসে দিন চালাচ্ছেন, কারও দিন কাটছে খবরের কাগজ পড়ে৷ তেমনই কেউ আবার নিজের ছাউনির তলায় দিন কাটাচ্ছেন শুধুমাত্র অচলাবস্থা কাটার অপেক্ষায়৷ এ দিকে গত সোমবার অচলাবস্থার ‘মেঘ’ কাটার কথা ছিল। কিন্তু দিল্লিতে দফায় দফায় আলোচনার পরেও সমস্যা মেটেনি৷

আরও পড়ুন: অংকেও সিলেবাস বহির্ভূত প্রশ্ন, গ্রেস মার্কস দিতে চলেছে পর্ষদ

যে কারণে, আগামী দুই এপ্রিল অবধি কর্মবিরতি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আইনজীবীরা। সমস্যা আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে, সেই খবর পাওয়ার পর হতাশা আরও বেড়েছে টাইপিস্টদের৷ লক্ষ্মণ রায়৷ ১৯৯১ থেকে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত তিনি৷ তাঁর টাইপরাইটারের খটখটানি এক মাসের বেশি বন্ধ। স্বাভাবিক কারণেই, রোজগার নেই এখন৷ যে কারণে, ক্রমে হতাশা আরও গ্রাস করছে তাঁকে৷ তাঁর কথায়, “প্রতিদিন এসে বসছি। কিন্তু কাজ নেই। আয়ও নেই। এর আগেও এমন হয়েছে। কিন্তু, এ বারের সমস্যা একটু বেশি মনে হচ্ছে।’’

একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘কী করব বুঝে উঠতে পারছি না। আমাদের তো অন্য কোথাও যাওয়ারও উপায় নেই। এই একটা কাজই তো জানি।” তাঁর মতো অঙ্কুশ বাগও বলেন, “আমার বয়স ৫০। ২০টি বছর কেটেছে এই কাজ করে। এক মাস হয়ে গেল কাজ নেই৷ কী করে সংসার টানছি আমিই জানি।” কম্পিউটার আসার পর থেকে টাইপিস্টদের সমস্যা আরও বেড়েছে। সৌমেন বসু বলেন, “এমনিতেই কম্পিউটার আমাদের হাল খারাপ করে দিয়েছে। আগে দিনে ৮০০-র বেশি রোজগার হয়ে যেত, এখন সেটাই ২০০ থেকে ৫০০ এর মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে। তার উপর এই কর্মবিরতি৷’’

আরও পড়ুন: বহুতলে আগুন নেভাতে বিশেষ ‘ওয়াটার টাওয়ার’ কিনছে দমকল

কিন্তু, কম্পিউটার শিখে নেওয়ার চেষ্টা করা যেত না? সৌমেন বসু বলেন, “কম্পিউটার কিনে রাখব কোথায়? কাজ তো হবে এখানেই। এখানে একটা চেম্বার নিতে গেলে ২০ লাখ টাকা দরকার। কোথা থেকে পাব এত টাকা?” কিছুটা রাগ উগড়ে দিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের অবস্থা না ঘরকা, না ঘাটকার মতো।” এত বছর ধরে এই সব টাইপিস্ট কাজ করে চলেছেন৷ কিন্তু, তাঁদেরও তো দাবি থাকতে পারে।

টাইপিস্ট অনাদি নাথ বলেন, “আমাদের সংখ্যা কমতে কমতে এখন ৪০-এ এসে ঠেকেছে। আমাদের কথা কেউ শোনেন না। উলটে আমাদের উৎখাত করতে পারলেই বাঁচে কোর্ট।” একই সঙ্গে তিনি বলেন, “এখনও বহু বিচারপতি আছেন যাঁরা আমাদের কাজেই বিশ্বাস রাখেন। তাঁরা জানেন মামলার কাগজ তৈরি করতে দিলে নিশ্চিন্তে নির্ভুল কাজ সময়ের মধ্যে পাওয়া যাবে।”

আরও পড়ুন: পঞ্চায়েতি রাজ সম্মেলনেই প্রচারের প্রস্তুতি তৃণমূলের

----
--