‘আজ বঁধু সারা বেলা, হবে শুধু হোলিখেলা, ভুবনে এসেছে আজ মধু ফাগুয়া .. এমনি বিজনে মোরা দুজনে, শুধু রঙ ভরা পিচকারি ক্ষণে ক্ষণে ছুঁড়ে মারি, রাঙাব তোমরও তনু ওগো বঁধুয়ারে…’ – বৃন্দাবনের কৃষ্ণ কি এ কথা বলেছিল রাধারানিকে? বাঙালি যুবক অবশ্য সে সবের তোয়াক্কা করেনি৷ দিকে দিকে রঙের ভেলকি লাগলে হেমন্ত মুখোপধ্যায়ের কণ্ঠ থেকে এ সুর তুলে নিয়ে বাতাসে ছড়িয়ে দিয়েছে একমুঠো আবির৷ বলেছে, ‘কোনও বাধা নাহি মানি, রাঙাব বসনখানি ভুবনে এসেছে আজ মধু ফাগুয়া’৷ রঙের উত্তরে সেদিন সখীসহ রাধারানি কী বলেছিলেন তাও আমাদের জানা নেই৷ শুধু আমাদের গানে গানে ধরা আছে সে উত্তর৷ সেই সুরের রঙ তুলে নিয়েই যুবতীরা উত্তর ছুঁড়ে দিয়ে কপট অভিমানে বলে উঠেছে, ‘ও শ্যাম যখন তখন খেলো না খেলা এমন, ধরলে আজ তোমায় ছাড়ব না৷’holi-4

সত্যি বলতে ছবির পর্দায় রঙ থাক বা না থাক এই, ছবিতে রঙ এতটুকু কম ছিল না৷ ললিত রঙ্গে রসতরঙ্গে গানের সঙ্গে হোলি খেলা ভারতীয় ছবির দীর্ঘদিনের ট্র্যাডিশন৷ ‘হোলি কে দিন দিল খিল যাতে হ্যায়, রঙ্গমে রঙ্গ মিল যাতে হ্যায়’- এ কথা কে আর না জানে৷ আর তাইতো রঙ্গ বরষালে ভিগে চুনারবালিকে ডেকে যতই প্রশ্ন করুক, ‘কিনে মারি পিচকারি তোরি ভিগি অঙ্গিয়া, ও রঙ্গ রসিয়া, ও রঙ্গরসিয়া’, ‘বলম পিচকারী’রা আজও ‘সিধিসাধি ছোড়ি’কে সরাবি করতে ঠিক ছুটে যায়৷ হাওয়ায় হাওয়ায় ভাঙ মিশিয়ে বলে ওঠে, ‘আজ না ছোড়েঙ্গে বাস হাম চোলি, খেলেঙ্গে হাম হোলি..চাহে ভিগে তেরি চুনারিয়া, চাহে ভিগে রে চোলি, খেলেঙ্গে হাম হোলি৷’

Advertisement

holi-3বসন্তের প্রকৃতিতেই আছে রঙের উচ্ছ্বাস৷ জীর্ণ পাতা ঝরার বেলা পেরিয়ে সে আনে প্রাণের নতুন খোঁজ৷ রাজার মতো এসে সন্ধ্যাবেলার মালতীদের দিকে তাকিয়ে সে বলে, ‘আমি পথভোলা এক পথিক এসেছি, আমায় চেনো কি?’ তাকে চেনা যায় না, কেননা মেজাজে সে রাজা, মর্জিতে পলাতকা, সন্ন্যাসী৷ প্রাচুর্যে সে সম্রাট হয়েও ভোগবিলাসী নয়, ‘ … কেবল পালিয়ে বেড়ায়, দৃষ্টি এড়ায়, ডাক দিয়ে যায় ইঙ্গিতে৷’ অশোকশাখায় সে দুলিয়ে দিয়ে যায় তার উত্তরীয়, পলাশবনে সে বুলিয়ে দিয়ে তার রঙের তুলি, মল্লিকার ভঙ্গিতে তার চরণ পড়ে তালে তালে, তবু সে ধরা দেয় না৷ বসন্তের প্রকৃতির মধ্যেই আছে এই বৈচিত্র৷ যে কোনও ঋতুর চেয়ে সে অনেক বেশি ভার্সেটাইল, রঙিন৷ সেই রঙের ছোঁয়া বসন্তের উৎসবেও৷ কবি-গীতিকার-সুরকার থেকে চলচ্চিত্র রচচয়িতা কারওরই চোখ এড়ায়নি বসন্তের এই আপন রঙ৷ আর তাই প্রাণের রঙ, প্রাণের উচ্ছ্বাসের উদযাপনে গোটা বসন্তের মধ্য থেকে প্রতিনিধি হয়ে  ছায়াছবিতে উঠে এসেছে হোলি বা দোল৷ হোলিকা রাক্ষসীর দহনের কারণেই ‘হোলি’র উৎপত্তি, কিংবা রাধা-গোবিন্দের দোলমঞ্চে আরূঢ় হওয়ার থেকে দোলের সৃষ্টি, সে তত্ত্ব তুলে রেখে, রঙের উৎসব থেকে রঙটুকু ছেনে নিয়ে পর্দায় হাজির করতে ভোলেননি হিন্দি-বাংলা সিনেমাওয়ালারা৷

বাংলা গানে ও ছায়াছবিতে যে দোলের এমন প্রভাব তার জন্য সবথেকে বেশি কৃতিত্ব প্রাপ্য বোধহয় মহাপ্রভুর৷ বাংলা বলয়ের বাইরের হোলি উৎসব যে বাঙালির ঘরের  দোল হয়ে উঠেছে তার প্রধান কারণ তিনিই৷ এক তো দোলপূর্ণিমার দিনেই তাঁর ধরাধামে আগমন, অন্যদিকে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকে যেভাবে তিনি বৈপ্লবিক কায়দায় ধর্মভেদহীনতার বৃহত্তর পরিসরে পৌঁছে দিয়েছিলেন, তাতে বাংলার মাটিতে হোলির ঐতিহাসিক মাত্রাটাই বদলে গেল৷ বাংলা ছায়াছবিও তাই ঘরের সংস্কৃতি করে দোলকে পালন করেছে৷ আজও তো বসন্তে সৌরভের শিখা জাগলে ভেসে আসে গান- ‘আজ হোলি খেলব শ্যাম তোমার সনে, একেলা পেয়েছি তোময় মধুবনে৷’ ১৯৭০ সালের ‘মঞ্জরী অপেরা’ ছবিতে এ গান গেয়েছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়৷ ছবি পরিচালনায় ছিল অগ্রদূত৷ এ গানেও অনুষঙ্গ অবশ্য সেই রাধা-কৃষ্ণ৷ ‘শুন ওহে বনমালি, ভাঙবো তোমার চতুরালি .. একলা পেয়েছি হেথা পালিয়ে যাবে কোথা’- বৃন্দাবনের অনুকরণে এই যে উক্তি, তাইই একেবারে ঘরোয়া দোলের ছবিতে এসে হয়ে দাঁড়াল, ‘ও শ্যাম যখন তখন, খেলো না খেলা এমন, ধরলে আজ তোমায় ছাড়ব না’৷ দীনেন গুপ্তর পরিচালনায় ১৯৭৫ সালে এসেছিল ‘বসন্ত বিলাপ’৷holi-1 সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায় মিলে গেয়েছিলেন এ গান, আর পর্দায় অপর্ণা সেন, সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়রা রঙে রঙে ভেলকি দেখিয়েছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অনপকুমারদের৷ এই যে ছেলে-মেয়েরা দু’দলে ভাগ হয়ে দোল বা হোলি খেলার ছবি পরিচালকরা ফুটিয়ে তুলেছেন, বা গানের কথাতে যে ইঙ্গিত, তাও সেই রাধা-কৃষ্ণের অনুসঙ্গে৷ কথিত আছে, মথুরা থেকে কৃষ্ণ তাঁর সঙ্গিদের নিয়ে হোলি খেলতে আসতেন রাধার গ্রাম বর্ষাণায়৷ তার নাম ছিল ‘বর্ষাণ কি হোরি’৷ উত্তরে রাধা তাঁর সখীদের নিয়ে রঙ খেলতে যেতেন নন্দগ্রামে৷ সেখানে হত, ‘নন্দগাঁও কি হোরি’৷ আবির-গুলালে ছেয়ে যেত আকাশ৷ কখনও সখীরা রঙ দিত কানু অঙ্গে, কখনও আবার রাখালদের রাজা রঙ দিতে আসত রাধাকে৷ তাই নিয়ে তৈরি হত কৃত্তিম কলহের আবহ৷ সেই বাতাবরণই ছড়িয়ে আছে সিনেমার পরিসরেও৷

বাংলা ছবিতে দোলকে দারুণভাবে সেলিব্রেট করেছেন তরুণ মজুমদার৷ তাঁর ‘বালিকা বধূ’তেই গানে গানে লেগেছিল রঙের ভেলকি৷ ১৯৮০ সালে মুক্তি পাওয়া তাঁর ‘দাদার কীর্তি’ ছবির ‘সাতসুরোকি বাঁধ পায়েলিয়া’ বাঙালির দোলের গানের সিগনেচার টিউন হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ মান্না দে’র গাওয়া ‘রঙ শুধু দিয়েই গেলে’ দোলের আর এক জনপ্রিয় গান৷ দীনেন গুপ্ত পরিচালিত ‘তিলোত্তমা’ ছবিতে ছিল এ গান৷  মহানায়ক উত্তমকুমারকেও ‘বন্দি’ ছবিতে দোলের দৃশ্যে দেখা গিয়েছিল৷ নেপথ্যে কিশোরকুমার আশা ভোঁসলে গেয়েছিলেন ‘মনে না রঙ লাগলে তবে হোলি কেমন হোলি..’ ৷তবে বাঙালির দোল পালনের সবথেকে উপযুক্ত ও সর্বজানগ্রাহ্য গান বোধহয় ‘খেলব হোলি রঙ দেব না, তাই কখনও হয়..’৷ ১৯৮৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘একান্ত আপন’ ছবিতে ছিল এ গান৷ দোলের দৃশ্যে দেখা গিয়েছিল অপর্ণা সেন, ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায় ও শকুন্তলা বড়ুয়াকে৷ ছবির দুই বন্ধু চরিত্রের জন্য রাহুলদেব বর্মনের সুরে এ গান গেয়েছিলেন আশা ভোঁসলে ও কবিতা কৃষ্ণমূর্তি৷ এর পরও বাংলা ছবিতে ঘুরেফিরেই দোলের দৃশ্য এসেছে৷ ‘দেবাঞ্জলি’ ছবিতে রানি মুখোপাধ্যায়কে দেখা গিয়েছিল দোল খেলতে, ‘জনতার আদালত’, ‘লক্ষ্যভেদ’ ইত্যাদি ছবিতেও দোল এসেছে তবে দোলের গানে আগের মতো আমেজ আর খুঁজে পায়নি বাঙালি দর্শক৷ সাম্প্রতিক অতীতে ‘রঞ্জনা আমি আর আসব না’ ছবিতেও দোল এসেছিল বটে, তবে সোখানে গান ছিল ‘জাগরণে যায় বিভাবরী’৷ একেবারে হাল আমলের জাতীয় পুরস্কার পাওয়া ছবি ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ ছবিতে বাংলার দোলের সেই আমেজকে আবার পুরোমাত্রায় ফিরিয়ে দিয়েছেন পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য৷

 হিন্দি সিনেমাতে সেই সাদা কালো যুগ থেকেই হোলির হল্লা৷ ১৯৫৭ সালের সিনেমা ‘মাদার ইন্ডিয়া’ ছবিতে নৌসাদজির সুরে সামসদ বেগম গেয়েছিলেন, ‘হোলি আয়ি রে কানহাই’৷ ছয়ের দশকে ‘কোহিনূর’ ছবিতে দিলীপকুমার, মীনাকুমারীর দিকে রঙ ছুঁড়ে দিয়ে বলেছিলেন ‘তন রঙ্গ লো জি’৷ নৌসাদজির সুরেই এ গান গেয়েছিলেন মহম্মদ রফি ও লতা মঙ্গেশকর৷ সাদা-কালো পর্দাতেই জমেছিল কল্পনার রঙ৷  রাজেশ খান্না ‘কাটি পতঙ্গ’ ছবিতে হোলির সেলিব্রেশনে মেতেছিলেন, নেপথ্যে কিশোরকুমার গেয়েছিলেন, ‘আজ না ছোড়েঙ্গে বাস হাম চোলি, খেলেঙ্গে হাম হোলি৷’  ‘গাইড’ ছবির(১৯৬৫) বিখ্যাত গান ‘পিয়া তোসে নয়না লাগে রে’-তেও এসেছিল হোলির অনুসঙ্গ৷holi-2 এরপর সবথেকে উল্লেখ্য যে গান এলো ‘শোলে’ ছবিতে৷ ধর্মেন্দ্র-হেমামালিনী আপামর দেশবাসীকে শুনিয়ে দিলেন ‘হোলি কে দিন দিল খিল যাতে হ্যায়’৷ ১৯৭৫-এর পর থেকে এ গান ছাড়া হোলিপালন সারাই হয় না৷ আর ১৯৮১ তে অমিতাভ বচ্চন ‘সিলসিলা’ ছবিতে নিজে নেচে-গেয়ে ‘রং বরষে’-কে প্রায় হোলি সেলিব্রেশনের জাতীয় সঙ্গীত বানিয়ে দিলেন৷ বিগ বি অবশ্য আবারও হোলির গান গেয়েছিলেন ‘বাগবান’ ছবিতে- ‘হেলি খেলে রঘুবীরা’৷  ১৯৯৩-এর ‘ডর’ ছবিতে পাওয়া গিয়েছিল ‘অঙ্গসে অঙ্গ লাগানা’র মতো হোলির গান৷ বলিউডও বারবার হোলিকে চুটিয়ে সেলিব্রেট করেছে৷ ‘মোহব্বতেঁ’ থেকে ‘ওয়াক্ত’, শাহরুখ থেকে অক্ষয়কুমার, প্রিয়াঙ্কা চোপড়ারা এসে বাজিমাত করে দিয়ে গেছেন হোলির দৃশ্যে-গানে৷ আবার ‘দামিনী’ ছবিতে এই হোলির দিনেই নায়িকা মীনাক্ষি শেষাদ্রি দেখেন তাঁর বাড়ির পরিচারিকার উপর অত্যাচার করছে তাঁরই বাড়ির লোক৷ হোলির এও এক বাস্তবতা যা, সিনেমার চোখ এড়ায়নি৷ একেবারে এই প্রজন্মের  পরিচালকদের কাজেও হোলির ট্র্যাডিশন সমানে চলছে৷ অয়ন মুখোপাধ্যায়ের ছবি ‘ইয়ে যওয়ানি হ্যায় দিওয়ানি’র ‘বলম পিচকারী’ গানটিতো প্রায় জেন ওয়াইয়ের হোলি সেলিব্রেশনের রিংটোন৷

 holi-5দোল প্রাণের উৎসব, রঙের উৎসব৷ জীবনের যা কিছু বিবর্ণ তাকে রাঙিয়ে তোলার সময়৷ ঋতুবদলের সঙ্গে সে রঙ থাকব না৷ কিন্তু এই যে রঙিন বাস্তবতা দিয়ে, নিছক বাস্তবকে অতিক্রম করে যাওয়ার প্রয়াস এই তো দোলের প্রাপ্তি৷ সিনেমারও তো তাইই কাম্য৷ দর্শকের চেনা বাস্তব থেকে পরিচালক তাঁকে তুলে নিয়ে যান সিনেমার বাস্তবতায়৷ ঠিক যেভাবে ঋতুরাজ বসন্ত আমাদের দিয়ে যায় অশোকে-কিংশুকে অলক্ষ রঙ লাগার অকরাণের সুখ৷ আর তাই বোধহয় সিনেমার সঙ্গে দোলের এই অলীক গাঁটছড়া৷ অন্য কোনও উৎসব বোধহয় এক ব্যাপকভাবে পর্দার দুনিয়াকে ছুঁতে পারেনি৷ ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় লাগা দোল কখন যেন এসে লাগে রূপোলি পর্দাতেও৷ আর রঙের অছিলায় প্রকৃতি হোক কিংবা সিনেমা হয়তো জীবনকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে- ‘পিচকারিও মে রঙ্গ ভরা পেয়ার হ্যায়, ইস রঙ্গ মে জীবন রঙ্গ লো..তন রঙ্গ লো..মন রঙ্গ লো..খেলো খেলো উমঙ্গভর রঙ্গ পেয়ার কে লেলো৷’

সরোজ দরবার

----
--