সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়: স্বামীজির প্রতিষ্ঠিত বেলুড় মঠকে মহিলাদের নিয়ে আমোদ প্রমোদের স্থান বলে বিবেচিত করেছিল তৎকালীন পৌরসভা। অবাক মনে হলেও এটাই বাস্তব। ধার্য করা হয়েছিল বিনোদন কর। স্বামীজি শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে আইনের পরিপন্থী হয়েছিলেন। আজ যিনি ভারতের যুব সমাজের প্রতীক তাঁকে এবং তাঁর প্রতিষ্ঠানকে প্রতি পদে হেনস্থার শিকার হতে হয়েছিল। তৎকালীন বাঙালি সমাজ এবং তার নিচ মনোবৃত্তিকেই এর জন্য দায়ি করেছেন সমাজকর্মীরা।

পুরসভা মঠকে ছেলে ছোকরাদের আড্ডাখানা বলত। তাদের দেখাদেখি স্থানীয় মান ঠেক আর সাধারণ মানুষজনও একই চোখে দেখতে শুরু করে বেলুর মঠকে। ব্যাঙ্গ করে বেলুর মঠকে বলা হত ‘বিচিত্র আনন্দ’, ‘বিবি- কা আনন্দ’ (মহিলা নিয়ে আনন্দ ধাম)। অথচ মোহ মায়া ত্যাগ করে ঘর সংসার বেবাগি হওয়া বিবেকানন্দ মঠের ভিতরে কোনও মহিলাকেই সহজে প্রবেশ করতে দিতেন না মঠে। একবার তাঁর প্রবল জ্বরের খবর পেয়ে তাঁর মা বেলুরে এসে হাজির হলে তাঁকেও প্রবেশ করতে বাধা দেন। এরপরেও তাঁকে এমন কথা সহ্য করতে হয়েছিল।

১৮৮৩ সাল, তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে বেলুর পুরসভা। পুরসভার কাছেই বেলুর মঠ। স্বামীজি চা পান করতে পছন্দ করতেন। সেই সময় আবার চা পান করা মানে সমাজে এক মারাত্মক অপরাধ। কিন্তু স্বামীজি সবসময়য়েই এসবের বিপরীত পথে ভাবতেন। তিনি বেলুরে চা আনিয়ে পান করতেন। এই খবর পৌঁছে গিয়েছিল পুরসভায়। সেখানে অনেক কুবুদ্ধিসম্পন্ন বাঙালি ব্যক্তিরা ছিলেন। এইসব বাঙালিরা একজোটে ঠিক করেন মঠকে ট্যাক্স দিতে হবে ‘আমোদ প্রমোদের’ জন্য। আবার চা আনিয়ে খেলে সেখানে আরও বেশী কর ধার্য করা হয়।শেষে চুঁচুড়া কোর্টে মামলা করে এই অযাচিত বাড়তি ট্যাক্স দেওয়া থেকে মঠকে বের করে আনেন।

জানা যায়, ঠিক একই কারণে তাঁর কোনও মৃত্যুর কোনও সার্টিফিকেট নেই। এমনিতেই সেই সময়ে এসব নিয়ে এত মাথাব্যাথা ছিল না সাধারণ মানুষের। কিন্তু মঠকে এতটাই খারাপ চোখে দেখত তৎকালীন পুরসভা যে এত সার্টিফিকেটের কথা তাঁদের মাথাতেই আসেনি। কেউ বুঝতেও পারেননি সকাল থেকে যে মানুষটি একেবারেই স্বাভাবিক তাঁর কিভাবে এমন মৃত্যু হতে পারে। দুপুরে তিনি ইলিশ মাস ভাত খেয়েছিলেন।

সঙ্গী সাধকদের বলেছিলেন,”একাদশীর জন্য খেতে না পেরে পেটটা কেমন হয়ে গিয়েছিল। মন ভরে গেল।” বিকালেও অনেকখানি হেঁটে এসে প্রার্থনা সেরে চলে যান নিজের শয়নকক্ষে। রাত ৯টার কাছাকাছি এক সাধককে বলেন তাঁর গরম হচ্ছে জানালা খুলে দিতে। ৯.১০ পাশ ফিরলেন স্বামীজি, শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে উঠলেন। তারপর সব স্থির, সাধকরা ভেবেছিলেন স্বামীজি বোধ হয় সমাধিস্থ হয়েছেন। এক সাধক এসে তাঁর নাড়ি মেপে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসককে ডাকতে বলেন। ততক্ষনে যা হওয়ার হতে গিয়েছে। চিকিৎসক এসে স্বামীজিকে মৃত ঘোষণা করেন। কান্নার রোল ওঠে মঠ জুড়ে।

বিশাল এক ঘটনা স্বামীজির মৃত্যু। শিকাগো মহাসভায় তাঁর বক্তৃতায় মুগ্ধ বিশ্ব। ভারতের এক অত্যন্ত পরিচিত মুখ। তাঁর মৃত্যুর খবর মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু তৎকালীন বাংলার কোন কাগজেই এমন সংবাদ প্রকাশ হয়নি। বিবেকানন্দের মৃত্যূর পর কোনও ছবিও নেই। এক্ষেত্রে অবশ্য দুটি যুক্তি রয়েছে। একটি অবশ্যই তৎকালীন বাংলা ও বাঙালি সমাজের দিকে আঙুল তোলে। অপরটি হল , স্বামী ব্রহ্মানন্দ বলেছিলেন, “স্বামীজির সঙ্গে আমাদের অনেক সুন্দর সুন্দর ছবি রয়েছে। এই ছবি বড়ই বেদনাদায়ক। সবার জন্য খুবই কষ্টের হবে। তাই ছবি না তোলাই ভালো।”

তথ্যসূত্র : শঙ্করের লেখা বই the monk as man : the unknown life of swami vivekananda এবং Swami Vivekananda’s Passing Away: A New Finding

--
----
--