রামনবমীতে ‘রামরাজ্য’ গড়তে বাংলায় কতটা এগোল বিজেপি?

মানব গুহ, কলকাতাঃ রামনবমী কতটা এগোতে সাহায্য করল রাজ্য বিজেপিকে? ঘুরে ফিরে প্রশ্ন এখন এটাই৷ সাধারণ মানুষের মৃত্যু আর একজন পুলিশ অফিসারের বোমার আঘাতে উড়ে যাওয়া ডান হাতের বদলে কতটা এগোল বিজেপি? এর বিনিময়ে কতটা বিজেপিকে আটকাতে পারল তৃণমূল কংগ্রেস৷ প্রশ্ন এখন রাজ্যবাসীর৷

রামনবমী৷ রামের নামে উৎসব৷ ২ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু আর এক পুলিশ অফিসারের উড়ে যাওয়া ডানহাত ছাড়াও রয়ে গেছে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের আতঙ্ক, রাজ্যবাসীর মনে ঢুকে যাওয়া ভয়৷ রামনবমী নিয়ে বাড়াবাড়িটা শুরু হয়েছে গতবছর থেকেই৷ এবছর সেই বাড়াবাড়িটা যেন চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে৷

সবটাই কিন্তু শুধুই রাজনৈতিক ফায়দার জন্য সেটা এখন পরিস্কার বুঝতে পেরেছেন সাধারণ মানুষ৷ কিন্তু দুই দলের কতটা লাভ হল? বিশেষতঃ বিরোধী বিজেপির কতটা লাভ হল এই রামনবমী থেকে? বিজেপি কি পারল বাংলাকে পোলারাইসড করতে? বাংলাকে তৃণমূল কংগ্রেস বনাম বিজেপি লড়াইয়ে তৈরি করতে পারল তারা? প্রশ্ন উঠছে৷

- Advertisement -

বাংলাকে কি ভোটের দিক দিয়েও মেরুকরণ করতে পারল বিজেপি? হিন্দু ভোট ব্যাঙ্কে কি থাবা বসাতে পারল তারা? ২০১৯ এর লোকসভা ভোটে এর ফলাফল দেখতে পাবো আমরা৷ তবে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসকে যে রাম নিয়ে লড়াইয়ে মাঠে নামাতে পেরেছে বিজেপি, এটা কিন্তু অস্বীকার করার কোন উপায় নেই৷

আর এখানেই লড়াইয়ে বেশ কিছুটা এগিয়ে বঙ্গ বিজেপি৷ তৃণমূল কংগ্রেসকে নিজেদের পাতা ফাঁদে পা দেওয়াতে পারাই রাজ্য বিজেপির বড় সাফল্য৷ রাজ্য জুড়ে জেলায় জেলায় রামনবমীর উৎসব ঘটা করে পালন করে একচুল এগোতে পারবে না তৃণমূল, এটা আজ পরিস্কার৷ বরং দুঃখজনক হলেও, তিলক কেটে ফিরহাদ হাকিমকে দেখে রাজ্য জুড়ে যে তৃণমূলের ভোট কমবে সেটাই কিন্তু বলছেন সাধারণ মানুষ৷

মুর্শিদাবাদ, রাণীগঞ্জ, আসানসোল এ রামনবমীকে কেন্দ্র করে দুই ধর্মের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জীবন কেড়েছে সাধারণ মানুষের৷ আহত হয়েছেন পুলিশ অফিসার থেকে আমজনতা৷ পুরোটা কিন্তু আপাততঃ প্রশাসনের বিরুদ্ধেই যাবে৷ অর্থাৎ শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্যর্থ রাজ্য প্রশাসন, এই বার্তাই কিন্তু যাবে সাধারণ মানুষের কাছে৷ বিজেপি কিন্তু এই প্রচারে বাজার মাত করতে চেষ্টা করছে।

আর হিন্দুদের মিছিলে অন্য ধর্মের মানুষের হামলার বার্তাও কিন্তু বিজেপির তরফ থেকে প্রচার করে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে মানুষের কাছে৷ আর এখানেই রামনবমীর সাফল্য বিজেপির৷ কৌশলে রামনবমীর ফায়দা তোলা থেকে বিজেপিকে আটকাতে ব্যর্থ তৃণমূল কংগ্রেস৷ বরং বোকামি করে বিজেপির পাতা ফাঁদে পা দিয়ে বিজেপিকে আরও প্রচারের আলোয় নিয়ে এসেছে তৃণমূল নিজেই৷

দিলীপ ঘোষ, মুকুল রায়ের পাশাপাশি তৃণমূলের রাজ্য ও জেলার স্তরের নেতারাও কপালে ফেট্টি বেঁধে রামনবমীর মিছিলে অংশগ্রহণ করেছেন৷ তাতে তৃণমূলের কতটা সুবিধা হয়েছে সেটা পরের প্রশ্ন৷ কিন্তু তাতে যে বিজেপির রাম নিয়ে হইচই আরও বাড়িয়ে দিয়েছে সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না৷ তৃণমূলকেও রামনবমীর প্রচারে এনে নিজেদের প্রচারই আরও বাড়িয়ে নিয়েছে বিজেপি৷ আর বোকার মত সেই পথে পা বাড়িয়ে প্রকারন্তরে গেরুয়া বাহিনীর আরও সুবিধা করে দিয়েছে মমতার দল৷

বাম এবং কংগ্রেসের তরফ থেকে রামনবমী নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি দুই দলকেই তুলোধনা করা হয়েছে৷ রামনবমীতে হিংসা ছড়িয়ে পড়ায় দুই দলকেই দায়ী করেছেন বাম-কংগ্রেস৷ কারণ তারাও বুঝতে পারছেন, রাজ্যে আপাততঃ এই দু দলের পাল্লাই দিনদিন ভারী হয়ে উঠছে৷ আর এখানেও সাফল্য বিজেপির৷ রামনবমীকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মেরুকরণে অনেকটাই সক্ষম তারা৷ শাসক তৃণমূলের বিরুদ্ধে পুরো বিরোধী ভোটটা নিজেদের দিকে আনতে চেষ্টার কসুর নেই তাদের৷

২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বাংলায় তৃণমূলের ভোট শেয়ার ছিল ৩৯.০৫ শতাংশ৷ বামেদের ছিল ২৯.৭১ শতাংশ, কংগ্রেসের ছিল ৯.৫৮ শতাংশ৷ বিজেপি ৫ বছর আগের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি ভোট বেড়ে প্রাপ্ত ভোট ১৬.৮০ শতাংশে দাঁড়ায়৷ ২০১৯ এর লোকসভা ভোটে এই ভোট শতাংশের অনেকটাই পরিবর্তন হবে বলেই মনে করছেন ভোট বিশেষজ্ঞরা৷ সিপিএম ও কংগ্রেসের ভোট আরও কমবে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা৷ আর এখানেই বিজেপি প্রধান বিরোধী দল হিসাবে নিজেকে দেখতে চায়।

বিরোধীদের পুরো ভোটটা বিজেপির দিকে পড়লে তবেই আগামী বছরের লোকসভা ভোটে তৃণমূল কংগ্রেসকে ঝটকা দিতে পারবে বিজেপি। আর রামনবমীকে কেন্দ্র করে ভোট ও রাজ্যবাসীকে মেরুকরণের মধ্যে নিয়ে যেতে পারলে সোনায় সোহাগা বিজেপির। সেক্ষেত্রে শাসক দলের প্রতিষ্ঠান বিরোধী ভোটের সুবিধা নিয়ে নিজেদের ভোট ব্যাঙ্ক আরও বাড়াতে পারবে গেরুয়া শিবির।

এমনিতেই বাদুরিয়া, বসিরহাট, মুর্শিদাবাদ, রাণীগঞ্জ বা আসানসোলে গোষ্ঠী সংঘর্ষ থামাতে তৃণমূল শাসিত রাজ্য প্রশাসন যথেষ্ট ভূমিকা নেয় নি বলেই প্রচারে তুলে এনেছে বিজেপি। যাতে অনেক ক্ষেত্রেই বা অনেক জায়গাতেই একমত হয়েছে আমজনতা। রাজ্য প্রশাসন হিন্দুদের জন্য সদর্থক ভূমিকা নিতে পারছে না বা নিচ্ছে না বলেই প্রচার শুরু করেছে বিজেপি। তৃণমূল কংগ্রেস কিন্তু এই প্রচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কিছুটা হলেও ব্যাকফুটে।

তারাও কিন্তু এই নিয়ে বিজেপির প্রচারের মোকাবিলা করতে পারছে না। কারণ তৃণমূলের মাথায় এখনও সংখ্যালঘু ভোট ব্যাঙ্কের চিন্তা। আর তাই, পুরোহিতদের দাবী উড়িয়ে দিয়ে ইমামভাতা চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত। আর এখানেই বিজেপি, হিন্দু ভোট ব্যাঙ্কে যথেষ্ট পরিমাণে ভাগ বসাতে পারছে বলেই মত রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের। সব মিলিয়ে রামকে কেন্দ্র করে রামনবমীর লড়াইয়ে পুরো ফায়দা নিজেদের ঘরে তুলতে পেরেছে বিজেপি। বুদ্ধির লড়াইয়ে ফাঁদে ফেলে শাসক দলকেও নিজেদের রাস্তায় আনতে পেরেছে গেরুয়া শিবির।

এখন এই ফায়দার ফসল আগামী লোকসভা নির্বাচনে পদ্মশিবির নিজেদের ঘরে তুলতে পারে কিনা সেটাই এখন দেখার। ২০১৯ এ লোকসভা নির্বাচনে যদি বিজেপির ভোট বাড়ে তাহলে সেক্ষেত্রে ‘রঘুপতি রাঘব রাজা’ রামের কৃতিত্ব অস্বীকার করার কোন রাস্তা থাকবে না বিজেপির তরফ থেকে। রামের মাহাত্ম মানতে হবে শাসক তৃণমূল কংগ্রেসকেও।

Advertisement ---
---
-----