আত্মহত্যা-কৃষিঋণ মকুব আর কতদিন? এবার শিল্পায়ন হোক কৃষিক্ষেত্রের

শুভজিৎ চট্টোপাধ্যায়

মুম্বই: মহারাষ্ট্রে পঞ্চাশ হাজার কৃষকের এই আন্দোলন একটা ঐতিহাসিক ঘটনা হলেও এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বছরের পর বছর, আমাদের দেশের চাষিভাইরা খালিপেটে চুপ থাকতে শিখেছে; আর মহাজনের বা সরকারের ঋণের চাপে, তাদের ভাঙা ঘরের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে, কীটনাশকের বোতলটা হাতে নিয়ে, ক্ষেতে না ছড়িয়ে নিজের গলায় ঢেলে দিয়েছে। তাই এই আন্দোলনটা খুব প্রয়োজন ছিল।

আগামি কিছু মাসে এমন আন্দোলন অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক বা উত্তরপ্রদেশে এর কৃষকদেরও পথে নামাতে পারে। এনিয়ে রাজনৈতিক দড়ি টানটানি চলবে। কিন্তু আসল সমস্যার আদৌ কোন সমাধান হবে কি?

NCRB (National Crime Records Bureau) এর হিসেব অনুযায়ী গত কয়েক বছরে কৃষক আত্মহত্যার সংখ্যা প্রতি বছর বারো হাজারের বেশি। বলা বাহুল্য যেকোনো সরকারি পরিসংখ্যানের মতো, এই পরিসংখ্যানও ‘under-reported’ যেখানে আসল সংখ্যাটা এর অনেক বেশি।

- Advertisement -

আমাদের দেশে সম্পূর্ণ কৃষিব্যবস্থা – কৃষিদ্রব্য পরিবহন, হিমঘর এবং পাইকারি ও খুচরো বাজার – এই পুরো ব্যবস্থাটা এত ঘুণধরা আর ব্যক্তিগত ক্ষমতা কুক্ষিগত, যে বাজারের নামি পাইকারি চাল বিক্রেতার বাড়িতে চারটে বিদেশি গাড়ি, ব্যাঙ্কে বা তোষকের তলায় অনেক অনেক টাকা। আর যারা মাঠে নেমে কাদা মেখে বীজ ছড়ায়, লাঙল চালায়, তাদের ঘরে দুবেলা ভাতের হাড়ি চড়েনা। আমাদের দেশের প্রতি রাজ্যে প্রতি গ্রামে এই চিত্র আবহমান কাল থেকেই।

ভারত সরকার এই বছরের বাজেটে ঘোষণা করেছেন যে খারিফ শস্যের নূন্যতম দাম শস্য উৎপাদন খরচের অন্তত দেড়গুণ হতে হবে। যদি বাজার দর এর থেকে কম হয়, তাহলে সরকার নিজেই শস্য কিনে চাষিকে এই নূন্যতম দেড়গুণ দাম পেতে সাহায্য করবে। আমাদের দেশে লক্ষ লক্ষ অসংগঠিত চাষিদের কাছে এই প্রকল্প কতটা পৌছবে, সেটা নিয়ে একমাত্র সরকার ছাড়া কেউ খুব একটা আশাবাদী বলে মনে হয়না।

গত কয়েক বছরে কেন্দ্রীয় সরকার বা বিভিন্ন রাজ্য সরকারের নেওয়া বেশ কিছু প্রকল্প যেমন ‘কৃষাণ ক্রেডিট কার্ড’ বা ‘কর্প ইনসিওরেন্স’ এর কোন উল্লেখযোগ্য সাফল্যের ছবি দূরবীন দিয়েও চোখে পড়েনা। তার উপর গত বছর demonitization এর ভূত যে বীজ, সার আর ফসল কেনাবেচায় কৃষকদের উপর ভীষণ চাপের সৃষ্টি করেছিল, সেকথা সরকারও সরাসরি অস্বীকার করতে পারবেনা।

আমাদের দেশে বিভিন্ন রাজ্য সরকার, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে বারবার মুক্তহস্তে কৃষিঋণ মকুব করার কথা বলে। গতকাল, এই ঐতিহাসিক পদযাত্রার পর, মহারাষ্ট্রে কৃষকদের দাবিকে মান্যতা দিয়ে সরকার কৃষিঋণ মকুব করার বিষয়টা মেনেও নিয়েছে এবং এটাকে এই আন্দোলনের সাফল্য হিসেবেও দেখানোর একটা প্রচেষ্টা শুরু হয়ে গিয়েছে। কিন্ত আর সমস্ত ভর্তুকির মতো, কৃষিঋণমকুব কখনই এমন একটা জটিল সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারেনা।

তাহলে আমাদের দেশে চাষিভাইদের এই সমস্যার আদৌ কোন সমাধান আছে কি? এক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগ বা বিকেন্দ্রীকরণ কি কোন সমাধান হতে পারে?

আমাদের দেশে সমস্ত ক্ষেত্রে একটা ধারণা আছে যে, শিল্পায়ন থেকে কর্মসংস্থান সব সরকারের দায়িত্ব। বিশেষত বামপন্থীরা এই মতের প্রবল বিশ্বাসী এবং আমাদের দেশের শ্রমিক বা কৃষক সংগঠকগুলি এই ধারণার বাইরে একদম বেরতে পারেননা। কিন্তু এবার অন্যভাবে ভাবার সময় এসেছে। গত কয়েকবছরে service sector -এ যথেষ্ট বেসরকারি কর্মসংস্থান এই দাবিকে প্রামান্যতা দেয়।

কৃষিক্ষেত্রের শিল্পায়ন, কথাটা শুনতে হয়তো সোনার পাথরবাটির মতো। বিশেষত আমাদের দেশে, যেখানে স্বাধীনতার ৭০ বছর পরেও কৃষি আর শিল্প এই দুটোকে আমরা একসঙ্গে ভাবতে পারলাম না। দেশের সমস্ত সরকারি নীতি বা বেসরকারি উদ্যোগ কৃষি আর শিল্পকে একে অন্যের পরিপূরক না ভেবে; এরা একে অন্যের প্রতিস্থাপক এমন একটা ভাবনা সকলের মধ্যে গেঁথে দিয়েছে। তাই আমাদের সব আলোচনা সবসময় কৃষিজমি অধিগ্রহণ করে সেখানে কারখানা হবে কিনা এখানেই সীমিত থেকে যায়। কৃষিকে কিভাবে সংগঠিত শিল্প হিসাবে রূপান্তরিত করা যায়, সেটা কেউ কখন সেভাবে ভাবেনি।

কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকার কৃষিজাত দ্রব্য চাষিদের থেকে সরাসরি কিনে বাজারে বিক্রি করবে, এমন একটা নীতি মোটামুটি সব সরকার গ্রহন করলেও, কাজের কাজ কিছু হয়নি। এখনও আমাদের দেশের মোট কৃষিজাত দ্রব্য উৎপাদনের ৭০% এর বেশি চাষিরা সরাসরি বিক্রি করে পাইকারি ব্যবসায়ি বা ফঁড়েদের কাছে; অধিকাংশ সময় ন্যায্য দামের অনেক কম দামে।

তাই, কৃষিক্ষেত্রের বেসরকারিকরণ ভীষণভাবে জরুরি। সারা বিশ্বে বিভিন্ন উন্নত দেশে (আমেরিকা, চিন, অস্ট্রেলিয়া বা ইউরোপ-এর বিভিন্ন দেশে) শুধু যে কৃষকদের গড় আয় আমাদের দেশ থেকে অনেক বেশি তাঁর একটা প্রধান কারণ ‘contract farming’. বড় বা মাঝারি মানের কোম্পানি অনেকগুলি গ্রামে সব চাষিদের এক করে তাদের সাথে দশ, পনের, কুড়ি বছরের চুক্তি করে রেখেছে; যেখানে বীজ, সার, বা অন্যান্য প্রযুক্তির নিয়মিত সাহায্য পায় চাষিরা। ফসলের নির্দিষ্ট বার্ষিক দাম আগে থেকে ঠিক করা থাকে এবং কোম্পানি প্রতি বছর চাষিদের এই দাম দিতে বাধ্য। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ফসল নষ্ট হলেও, চাষিরা তাদের নির্দিষ্ট ইনসিওরেন্স থেকে সংসার চালানোর সাহায্য পান। এই ব্যবস্থায় সমস্যা নেই এমন নয়। কিন্তু উন্নত দেশে ‘কৃষি’ কে ‘শিল্প’-র চোখে দেখে সাফল্যের এতো পরিসংখ্যান আছে, যে একে অস্বীকার করা ভীষণ মূর্খামি। তাই আমাদের দেশের বড় corporate house গুলোর এব্যাপারে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। সরকারের উচিত এক্ষেত্রে মুক্তহস্তে বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা।

এ নিয়ে আমাদের দেশে সংরক্ষণবাদীরা গেলো গেলো রব তুলবেন। কিন্তু আমাদের মতো দেশে, প্রতি বছর যেখানে মোট খাদ্যসশ্য ও ফসল উৎপাদনের ৩০% এর বেশি নষ্ট হয়ে যায় সঠিক পরিবহণ ব্যবস্থা ও হিমঘরের অভাবে বা অধিকাংশ কৃষিজমিতে সঠিক জলনিকাশি ব্যবস্থার অভাবে ফসল উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে বৃষ্টিপাতের উপর নির্ভরশীল, সেখানে কৃষি পরিকাঠামতে বিপুল অঙ্কের বেসরকারি পুঁজি বিনিয়োগ ছাড়া উপায় নেই। অত্যাধুনিক হিমঘর ও পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা বা কৃত্রিম বৃষ্টিপাত, transgenic ফসল ইত্যাদি নিয়ে নিরন্তর গবেষণার প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ বেসরকারি সংস্থাগুলি নিজেদের ব্যবসায়িক সাফল্যের দিকে তাকিয়েই করবে। এর সুফলে, আমাদের চাষিভাইদের একটা বার্ষিক নির্দিষ্ট আয়ের পথ খুলে গেলে তাতে আপত্তি কিসের?

এক্ষেত্রে বিভিন্ন কোম্পানির ব্যবসায়িক মডেলে তফাৎ থাকতে পারে। কোথাও contract farming, কোথাও corporate sponsored co-operative model আবার কোথাও চাষিরা কৃষি-উৎপাদক বেসরকারি কোম্পানিতে সরাসরি স্থায়ী বেতনের কর্মচারী হিসেবে কাজ করতে পারেন। সব মডেলে সাফল্য আসবেনা। কিন্তু বেশ কিছু trial and error এখুনি শুরু করা দরকার। নয়তো কৃষিঋণ মকুব এর মতো regressive আর short-term সমাধান করে একটা জটিল আবহমান সমস্যাকে ধামাচাপা দিয়েই রাখতে হবে বছরের পর বছর। ভারত সরকার ২০২২ সালে কৃষকের গড় আয় দ্বিগুণ করার যে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, সেটা ওই কালোটাকা উদ্ধারের মতো ধূসর মরীচিকা হয়ে থেকে যাবে।

আর এই মডেলে সাফল্যের খোঁজে বিদেশের উদাহরন কি প্রয়োজন। হাজার হাজার অসংগঠিত গোয়ালাকে নিজেদের বৃত্তের মাঝে এনে, তাদের সঠিক দাম দিয়ে, পরিকাঠামো গড়ে তুলে, কিভাবে সাফল্য পেতে হয়, তা করে দেখিয়েছিলেন ভারগিস ক্যুরিএন। আর সেই সাফল্যের নাম ‘আমুল। আজ গুজরাতের প্রায় ছত্রিশ লক্ষ গোয়ালা আমুলের ছাতার তলায়। গত কয়েক বছরে, পেপসিকো-র মতো কিছু কোম্পানি বেশ কিছু রাজ্যে আলু, টম্যাটো এসবের ‘contract manufacturing’ শুরু করেছে। এতে চাষিরা কতটা সরাসরি উপকার পেয়েছে, সে ব্যাপারে কোনও অর্থনীতিবিদ আশা করি কাজ করছেন এবং সেই গবেষণাপত্রের দিকে আমাদের নজর থাকবে।

২০০৩ সালে তৎকালীন ভারত সরকার Model Agricultural Produce Marketing (Regulation) Act এর মাধ্যমে বিভিন্ন রাজ্যে Corporate বিনিয়োগে contract manufacturing কে উৎসাহিত করা শুরু করে। কিন্তু প্রায় পনের বছর পরও সেরকম সাফল্য আমাদের চোখে পড়েনি। বর্তমানে ভারত সরকারের Niti Ayog এই Act এর কিছু পরিবর্তন আনছে। আশা করবো এই নতুন নীতিগুলি কৃষিক্ষেত্রে বেসরকারি পুঁজি কে আরও উৎসাহিত করবে।

কিছু বছর আগে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন বাম সরকার ঘোষণা করেছিলেন, “কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ”। কিন্তু কৃষিভিত্তিক শিল্প কিভাবে দেশের ভবিষ্যৎ হতে পারে, সেটা এবার সবাই একটু গভীর ভাবে ভেবে দেখুক।

(উপরিউক্ত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত)

Advertisement
---